তোমাদের দিকে তাকিয়ে ছিলাম বুক ভরা আশা নিয়ে, সেই তোমরা আজ এ কোন পথে?
রহিম সাদিক

জুলাইয়ের সেই উত্তাল দিনগুলোর কথা মনে পড়ে?
যখন রাজপথে তোমাদের রক্ত ঝরছিল, তখন আমরা সাধারণ মানুষ চোখের জল আর বুকের দোয়া নিয়ে তোমাদের পাশে ছিলাম।
ভেবেছিলাম, এই ছেলেগুলোই আমাদের জঞ্জালমুক্ত এক নতুন ভোর এনে দেবে। তোমরাই ছিলে আমাদের শেষ ভরসা, আমাদের অন্ধকারের আলোকবর্তিকা।
কিন্তু আজ? আজ যখন ময়মনসিংহের দিকে তাকাই, বুকটা যন্ত্রণায় দুমড়ে-মুচড়ে যায়।
রক্তের দাগ কি তবে শুকিয়ে গেছে?
বিগত কয়েক মাসে তোমাদের অনেকের কর্মকাণ্ড দেখে মনে প্রশ্ন জাগে—তোমরা কি সেই জুলাইয়ের অগ্নিশপথ ভুলে গেছ? ভেবেছিলাম তোমরা হবে অন্যায়ের যমদূত, কিন্তু তোমাদের কেউ কেউ আজ নিজেরাই সেই অন্যায়ের অংশ হয়ে গেছ। ক্ষমতার চেয়ারে বসে, টাকার গন্ধে মাতাল হয়ে তোমরা যখন সিন্ডিকেট করো, তখন মনে হয়—এই কি সেই ছাত্রসমাজ!
শুনছি,
ব্রিজের মোড়ে আর বিভিন্ন পয়েন্টে নাকি তোমাদের নাম ভাঙিয়ে ‘দালালি সিন্ডিকেট’ তৈরি হয়েছে। টাকার বিনিময়ে কাজ করা হয়, ক্ষমতার দাপট দেখানো হয়। বিশ্বাস করো, এসব শুনলে আমাদের ঘৃণা নয়, বরং কান্না পায়। মনে হয়, তবে কি আমাদের ভাইদের / সন্তানদের রক্ত বৃথা গেল?
ছাত্র নামটা যে সততার প্রতীক, ত্যাগের প্রতীক—সেটা কেন টাকার কাছে বিক্রি করে দিচ্ছ? জুলাইয়ের মুক্তিযোদ্ধারা তো এগুলো করার কথা না!
তোমাদের হাতে তো কলম থাকার কথা
তোমরা তো রাজনীতিবীদ নও, তোমরা ছাত্র। তোমাদের পরিচয় মেধা, মনন আর শিক্ষায়। সেই তোমাদের মধ্যে যখন গ্রুপিং, দলাদলি আর ‘আমি বড়, তুমি ছোট’র লড়াই দেখি, তখন হতাশায় আকাশ ভেঙে পড়ে।
কমিটিতে পদ পাওয়ার জন্য, একটু ক্ষমতার জন্য এই যে কামড়াকামড়ি—এটা তোমাদের মানায় না। যারা সত্যিকার অর্থে কাজ করতে চায়, যারা নিজের পকেটের কথা না ভেবে মানুষের কথা ভাবে—তাদের কেন তোমরা দূরে ঠেলে দাও? কেন নিজের ভাইদের মধ্যে বিভেদ তৈরি করো?
ফিরে এসো মানুষের কাতারে: আমাদের আর্তি
আগামী ছয় মাসের জন্য তোমরা আবার নতুন করে সংগঠিত হচ্ছ। এই মুহূর্তে বড় ভাই হিসেবে, একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে তোমাদের কাছে হাত জোড় করে একটা অনুরোধ—প্লিজ, আর হতাশ করো না।
তোমরা এমন কিছু করো যেন মানুষ আবার বিশ্বাস করতে পারে। আমরা চাই না তোমরা নেতা হয়ে ঘুরে বেড়াও। আমরা চাই তোমরা ‘সেবক’ হও। ময়মনসিংহে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে একটা ‘নাগরিক সেল’ বা অভিযোগ বক্স খোলো। অনলাইনে একটা পেজ খোলো যেখানে অসহায় মানুষ তাদের কষ্টের কথা লিখতে পারবে।
যখন কোনো গরিব মানুষ হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা পাবে না, যখন থানায় গিয়ে কেউ ঘুষের অভাবে বিচার পাবে না—তখন তোমরা সেখানে গিয়ে দাঁড়াবে। তোমরা সেই অসহায় মায়ের চোখের জল মুছিয়ে দেবে, ডাক্তারের কলার চেপে ধরবে না বরং সিস্টেমকে বাধ্য করবে সেবা দিতে। তোমরা ফেসবুকে বড় বড় স্ট্যাটাস না দিয়ে, সেই অভিযোগগুলোর সুরাহা করে দেখাবে—”দেখুন, আমরা আজ ১০টা মানুষের সমস্যার সমাধান করেছি।”
শেষ সুযোগ
টাকা দিয়ে হয়তো সাময়িক সুখ কেনা যায়, কিন্তু মানুষের দোয়া কেনা যায় না। জুলাইয়ের বিপ্লব কোনো ছেলেখেলা ছিল না, এটা ছিল অস্তিত্বের লড়াই। সেই লড়াইয়ের আমানত তোমাদের হাতে। প্লিজ, এই আমানতের খেয়ানত করো না। সিন্ডিকেট আর দালালি ছেড়ে, ইগো আর বিভেদ ভুলে এক হও।
মানুষের দীর্ঘশ্বাস আর অভিশাপ কুড়িও না। আমরা এখনো তোমাদের বিশ্বাস করতে চাই, এখনো তোমাদের ভালোবাসতে চাই। তোমরা কি পারবে আমাদের সেই হারানো বিশ্বাস ফিরিয়ে দিতে? নাকি ইতিহাসের পাতায় তোমরাও ‘ব্যর্থ’ আর ‘সুবিধাবাদী’ হিসেবেই রয়ে যাবে?
সিদ্ধান্তটা তোমাদের।
