কলমাকান্দায় বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালিত: প্রকৃতি ও জলবায়ু রক্ষায় স্থানীয়দের অঙ্গীকার
মো. ফখরুল আলম খসরু, কলমাকান্দা (নেত্রকোনা) প্রতিনিধি

নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার চন্দ্রডিঙ্গা বাঁধ রক্ষা কমিটি ও চন্দ্রডিঙ্গা যুব সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে এবং বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘বারসিক’-এর সহযোগিতায় বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২৬ পালিত হয়েছে। এ বছরের বিশ্ব পরিবেশ দিবসের মূল প্রতিপাদ্য—“প্রকৃতির থেকে অনুপ্রাণিত হও, জলবায়ুর জন্য ও আমাদের ভবিষ্যতের জন্য”—কে সামনে রেখে বৃহস্পতিবার (৪ জুন ২০২৬) চন্দ্রডিঙ্গা এলাকায় বর্ণাঢ্য র্যালি, আলোচনা সভা ও বৃক্ষরোপণসহ নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
অনুństানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট কবি, লেখক ও শিংকাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বকুল মাস্টার।
প্রকৃতির সান্নিধ্যে শপথ ও চারা বিতরণ
দিবসটি উপলক্ষে স্থানীয় আদিবাসী ও বাঙালি কৃষক-কৃষাণীসহ প্রায় ৬০ জন অংশগ্রহণকারী সরাসরি প্রকৃতির সান্নিধ্যে গিয়ে পরিবেশ সুরক্ষার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। তারা প্রতিপাদ্যের আলোকে প্রকৃতির কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা এবং আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, সবুজ ও বাসযোগ্য ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
এ সময় চন্দ্রডিঙ্গা এলাকার পাহাড়ি ছড়ার বাঁধ সুরক্ষায় পরিবেশবান্ধব বিশেষ বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়। কর্মসূচির অংশ হিসেবে অংশগ্রহণকারী স্থানীয় জনগণের মাঝে বিভিন্ন প্রজাতির ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা বিতরণ করা হয়।
পরিবেশ রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ
চন্দ্রডিঙ্গা বাঁধ রক্ষা কমিটির সভাপতি সুনীল ম্রং-এর সভাপতিত্বে এবং বারসিকের প্রোগ্রাম অফিসার মো. আলমগীর-এর সঞ্চালনার এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় পরিবেশ সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা, জলবায়ু ন্যায্যতা এবং স্থানীয় জনগণের করণীয় বিষয়ে বিস্তর আলোচনা করা হয়।
সভায় বক্তারা পরিবেশের সুরক্ষায় নিজেদের মতামত তুলে ধরেন:
গুঞ্জন রেমা (উপজেলা সমন্বয়কারী, বারসিক): “এ বছরের প্রতিপাদ্য আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, প্রকৃতিই টেকসই জীবনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং পরিবেশবান্ধব জীবনচর্চার মাধ্যমেই আমরা বৈশ্বিক জলবায়ু সংকট মোকাবিলা করতে পারি। প্রকৃতিকে রক্ষা করা মানেই আমাদের অস্তিত্বকে রক্ষা করা।”
বেনুকা ম্রং (স্থানীয় নারী নেত্রী): “প্রকৃতি আমাদের জীবন, সংস্কৃতি ও জীবিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় নারী-পুরুষ সকলের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রকৃতিকে ভালোবাসা ও সংরক্ষণের মধ্য দিয়েই আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর পৃথিবী রেখে যাওয়া সম্ভব।”
পরিমল রেমা (আদর্শ কৃষক): “প্রকৃতি ও কৃষি একে অপরের পরিপূরক। দেশীয় বীজ সংরক্ষণ, পরিবেশবান্ধব কৃষি চর্চা এবং ব্যাপক হারে বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে আমরা যেমন নিজেদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারি, তেমনি জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবও কমাতে পারি।”
প্রধান অতিথির বক্তব্য
প্রধান অতিথি বকুল মাস্টার তাঁর বক্তব্যে চন্দ্রডিঙ্গা যুব সংগঠন ও আজীবন পরিবেশ রক্ষা কমিটির এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন:
“প্রকৃতি আমাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষক। প্রকৃতির কাছ থেকে শিক্ষা নিয়েই আমাদের জীবন ও টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনা সাজাতে হবে। পরিবেশ ধ্বংস করে কখনো প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই বৃক্ষরোপণ, প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ এবং পরিবেশবান্ধব আচরণকে আমাদের একটি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে হবে।”
সভাপতির সমাপনী বক্তব্যে সুনীল ম্রং চন্দ্রডিঙ্গা এলাকার পরিবেশ, ছড়া ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় স্থানীয় জনগণের সম্মিলিত সামাজিক উদ্যোগ আগামীতেও অব্যাহত রাখার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
