জাহিদ রনক

একটি দেশের নাগরিকদের রাষ্ট্রীয় সকল সুযোগ-সুবিধা ও সেবা প্রদানের জন্য ‘ন্যাশনাল আইডি কার্ড’ বা এনআইডি-ই বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ও স্বীকৃত মাধ্যম। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে এই ডিজিটাল ডাটাবেজ অত্যন্ত সমৃদ্ধ। কিন্তু সমপ্রতি নাগরিকদের বিভিন্ন বিশেষ কার্ড দেওয়ার যে প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তা নিয়ে জনমনে বড় ধরনের প্রশ্ন ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ মানুষ মনে করছেন, বিদ্যমান এনআইডি কার্ড দিয়ে সব ধরনের সেবা দেওয়া সম্ভব হলে নতুন করে অন্য কোনো কার্ড করার প্রয়োজনীয়তা স্রেফ অর্থের অপচয় এবং সাধারণ মানুষকে নতুন বিড়ম্বনায় ফেলা।
এনআইডি থাকতেই কেন নতুন কার্ডের বোঝা?
একজন নাগরিকের পূর্ণাঙ্গ তথ্য সরকারে এনআইডি ডাটাবেজে সংরক্ষিত আছে। চাল, ডাল, গম বা অন্যান্য ভাতার সুবিধা এই কার্ডের মাধ্যমেই বণ্টন করা সম্ভব। নতুন করে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বা অন্য কোনো নামে কার্ড প্রবর্তন করার অর্থ হলো—আবার নতুন করে ফরম পূরণ, ছবি তোলা এবং দীর্ঘসূত্রিতা। যেখানে একটি স্মার্ট কার্ডেই সব সমাধান সম্ভব, সেখানে নতুন কার্ডের বোঝা চাপানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
দুর্নীতি ও জনভোগান্তির নতুন পথ
অভিযোগ উঠছে যে, নতুন কার্ড তৈরির নাম করে স্থানীয় পর্যায়ের একশ্রেণির রাজনৈতিক নেতাকর্মী সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ আদায় শুরু করেছে। সহজ-সরল গ্রামীণ মানুষকে ভয় দেখিয়ে বা সুবিধার লোভ দেখিয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। ক্ষমতার অপব্যবহার করে নির্দিষ্ট দলীয় লোকজনকে সুবিধা দেওয়া এবং সাধারণ মানুষকে বঞ্চিত করার আশঙ্কাও প্রবল। নতুন কার্ড সিস্টেম মানেই সেখানে অনিয়ম আর ঘুষের এক নতুন দুয়ার খুলে দেওয়া।
রাষ্ট্রের হাজার কোটি টাকার অপচয়
নতুন কোনো কার্ড প্রবর্তন করা মানেই সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়। জনগণের ট্যাক্সের এই বিপুল পরিমাণ অর্থ দিয়ে অহেতুক কার্ড না বানিয়ে, সেই টাকা যদি জনস্বার্থে খরচ করা হতো—তবে জাতি বেশি উপকৃত হতো। বর্তমানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম চড়া। আলুসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য সংরক্ষণের জন্য হিমাগার নির্মাণ বা কৃষি খাতে ভর্তুকি দিলে সাধারণ মানুষ সরাসরি সুফল পেত। ‘চেয়ারম্যানের গমের কার্ড’-এর নাম বদলে আধুনিক ভার্সন আনার চেয়ে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
রাজনৈতিক সদিচ্ছা বনাম বাস্তবতা
রাজনীতিবিদদের মনে রাখা প্রয়োজন, জনগণের সেবা দেওয়া মানে তাদের ভোগান্তি বাড়ানো নয়। একটি কার্ড করতে গিয়ে যদি একজন নাগরিককে দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয় এবং পকেট থেকে টাকা খসাতে হয়, তবে সেই সেবার কোনো মূল্য থাকে না। জনগণের দাবি—অহেতুক কার্ডের পেছনে টাকা নষ্ট না করে বিদ্যমান এনআইডি কার্ডের মাধ্যমেই যেন সকল সরকারি সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হয়।
সরকারের উচিত প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে এনআইডি কার্ডের বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করা। নতুন কার্ডের নামে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ফায়দা লোটার সুযোগ বন্ধ করে রাষ্ট্রের অর্থ ও জনগণের সময়—উভয়ই সাশ্রয় করা জরুরি। আলু সংরক্ষণের মতো মৌলিক ও জরুরি কাজে বরাদ্দ বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের জীবন সহজ করার দিকেই মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
