দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হলেন সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা

দুর্নীতি ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগে অভিযুক্ত পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দেশটির পুলিশ ইন্টারপোলের সহযোগিতায় তাঁকে গ্রেপ্তার করেছে বলে সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে।

আজ রোববার (১৪ জুন ২০২৬) বাংলাদেশের পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র ও এআইজি শাহাদাত হোসেন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও স্থানীয় গণমাধ্যমকে বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তারের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন।

চিঠির মাধ্যমে ঢাকাকে অবহিতকরণ

পুলিশের একটি উচ্চপদস্থ সূত্র জানায়, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা মামলার প্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের রেড নোটিশের সহযোগিতায় দুবাই পুলিশ এই অভিযান পরিচালনা করে। এ বিষয়ে গত ১২ জুন (শুক্রবার) একটি আনুষ্ঠানিক চিঠির মাধ্যমে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে বিস্তারিত অবহিত করেছে দুবাইয়ের সংশ্লিষ্ট দপ্তর।

তবে বেনজীর আহমেদকে ঠিক কোন সুনির্দিষ্ট মামলার ভিত্তিতে এই মুহূর্তে আটক দেখানো হয়েছে, তাঁর বিরুদ্ধে দুবাইয়ে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া কী হবে কিংবা তাঁকে কখন দেশে ফিরিয়ে আনা হবে—এসব বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

পলাতক জীবন ও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা

উল্লেখ্য, বেনজীর আহমেদ ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার এবং র‌্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) হিসেবেও প্রভাবশালী দায়িত্ব সামলেছেন। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র র‌্যাবের যে সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল, তার মধ্যে বেনজীর আহমেদের নামও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার কয়েক মাস আগে বেনজীর আহমেদের আকাশচুম্বী দুর্নীতির খতিয়ান প্রকাশ পায়। দুদক তাঁর বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করলেই তিনি গোপনে দেশ ত্যাগ করেন। এরপর তাঁর বিরুদ্ধে আদালতে একাধিক মামলা ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়। গত বছরের (২০cached২৫ সালের) ১০ ফেব্রুয়ারি আদালত বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির চূড়ান্ত আদেশ দিয়েছিলেন।

বেনজীর ও তাঁর পরিবারের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের খতিয়ান

এর আগে ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর জ্ঞাত আয়বহির্ভূত অবৈধ সম্পদ অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে বেনজীর আহমেদ, তাঁর স্ত্রী ও দুই মেয়ের বিরুদ্ধে পৃথক চারটি মামলা করে দুদক।

মামলায় উল্লেখিত আত্মসাতের বিবরণ:

  • বেনজীর আহমেদ: ৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং ২ কোটি contener৬২ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন।
  • জীশান মীর্জা (স্ত্রী): ৩১ কোটি ৬৯ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং ১৬ কোটি ১ লাখ টাকার তথ্য গোপন।
  • ফারহীন রিশতা বিনতে বেনজীর (বড় মেয়ে): ৮ কোটি ৭৫ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন।
  • তাহসীন রাইসা বিনতে বেনজীর (মেজ মেয়ে): ৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন।

আদালতের নির্দেশে ইতিমধ্যেই এই পরিবারের নামে থাকা বিপুল পরিমাণ সম্পদ ক্রোক (জব্দ) করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ঢাকার বাড্ডা ও আদাবরে ৮টি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট এবং নারায়ণগঞ্জ, বান্দরবান ও উত্তরায় ২৫ একর ২৭ কাঠা জমি। এছাড়া দুই দফায় গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুরে ৬২১ বিঘা জমি, ১৯টি কোম্পানির শেয়ার, গুলশানে ৪টি ফ্ল্যাট, ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র, ৩৩টি ব্যাংক হিসাব এবং ৩টি বিও (শেয়ার ব্যবসা) অ্যাকাউন্ট অবরুদ্ধ করার আদেশ দিয়েছিলেন আদালত।

পলাতক এই শীর্ষ কর্মকর্তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করতে আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *