বিডার স্বপ্নে ডলারের বৃষ্টি! মহাখালীর পবিত্র বাতাসে ধূমপায়ীদের গণতওবার মূল্য রাষ্ট্র দিল কুড়ি হাজার কোটি টাকা?

BAT Bangladesh-এর লোগো

শেখ মেহেদী হাসান নাদিম

বাঙালি বড়ই সৌভাগ্যবান জাতি। এ দেশে সমস্যার গোড়ায় জল না ঢেলে আগায় কাঁচি চালিয়ে দেওয়ার মতো এমন অভিনব কায়দা দ্বিতীয়টি নেই। এই যেমন ধরুন, ঢাকার মহাখালী ডিওএইচএস সংলগ্ন এলাকায় ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশের (বিএটিবি) ১১৬ বছরের পুরনো কারখানাটি উচ্ছেদের ঐতিহাসিক ঘটনা। ১৯১০ সালে যখন কারখানাটির চাকা ঘোরানো শুরু হয়েছিল, তখন মহাখালীর ওই তল্লাটে শেয়াল-কুকুরের আনাগোনা ছাড়া কোনো ভিআইপি আবাসিক এলাকা কিংবা ঝাঁ-চকচকে শপিং মলের অস্তিত্ব ছিল না। আইনশাস্ত্রের ভাষায় যাকে বলে ‘কামিং টু দ্য নুইসেন্স’—অর্থাৎ কারখানাটি মানুষের ড্রয়িংরুমে ঢুকে পড়েনি, বরং মানুষই শত বছর ধরে কারখানার পাঁচিল ঘেঁষে নিজেদের বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, স্কুল আর শপিং মল বানিয়েছে।

এদিকে পরিবেশবাদীদের দীর্ঘদিনের আন্দোলনকে স্রেফ একটি মোক্ষম অজুহাত হিসেবে সামনে রেখে, পর্দার আড়ালে থাকা অদৃশ্য কুশীলবরা সৈয়দা রিজওয়ানা সিদ্দিকীর মতো একজন পরিবেশ উপদেষ্টাকে দিয়ে এই সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন অত্যন্ত সুনিপুণভাবে করিয়ে নিল। কিন্তু পর্দার পেছনের এই মহা-পরিচালকদের তো আর আমরা মুখ চিনে চিনি না! ফলে রাষ্ট্র কত হাজার কোটি টাকার লোকসান গুনে ফতুর হলো, তার হিসাব বা রাখছে কে? আসল কথা তো কেউ পাত্তাই দিল না! যে কোম্পানিটি বাণিজ্যিকভাবে হিসাব কষলে দেখা যেত—যদি মোট ৩৫ টাকা উপার্জন করত, তবে নিজেদের পকেটে রাখত মাত্র ১ টাকা আর বাকি ৩৪ টাকাই সঁপে দিত বাংলাদেশের রাজকোষে! এমন অভাবনীয় রাজস্ব-বান্ধব ট্যাক্স-রেশিও পৃথিবীর কোন দেশের ইতিহাসে আছে? সেই অনন্যসাধারণ রেশিও আজ পরিবেশবাদী আবেগের চোরাবালিতে কোথায় যে হারিয়ে গেল, তার কোনো হদিশ নেই। এই রন্ধ্র্রগত সত্যগুলো জানা থাকলে বিডার (BIDA) চোখে রাতের বেলা আর যা-ই হোক, ডলারের বৃষ্টির সেই সুখস্বপ্ন কি আর এক মুহূর্তের জন্যও টিকে থাকত?

কিন্তু এই মহাপ্রস্থানের পর সারা বাংলায় যে অলৌকিক ঘটনাটি ঘটে গেল, তা দেখে স্বর্গের দেবতারাও হয়তো চোখ কচলাচ্ছেন আর বিডার ঘুমহীন কর্তারা চোখ বন্ধ করলেই দেখছেন—আকাশে মেঘের বদলে ঝমঝম করে ডলারের বৃষ্টি পড়ছে!

মহামান্য নীতিনির্ধারক ও পরিবেশবাদীদের ভাবখানা এমন ছিল যে, মহাখালীর কারখানাটিতে তালা ঝুলিয়ে দিলেই পরদিন সকাল থেকে বাংলাদেশের কোটি কোটি ধূমপায়ী ফুসফুসের পবিত্রতা রক্ষায় একযোগে ‘গণ-তওবা’ করে ধূমপান চিরতরে ছেড়ে দেবেন! বাস্তবেও কি তাই ঘটল? কাগজে-কলমে বিএটি বাংলাদেশের বৈধ সিগারেট বিক্রির গ্রাফের দিকে তাকালে তো তাই মনে হয়! কারখানা উচ্ছেদ ও স্থানান্তরের ধাক্কায় এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির সিগারেট বিক্রি এক লাফে ১৪ শতাংশ কমে গেল এবং প্রথম প্রান্তিকে নিট মুনাফা ৪১৩ কোটি টাকা থেকে ২৩ শতাংশ কমে ৩১৮ কোটি টাকায় নেমে এল।

বাহ্! কী চমৎকার সাফল্য! তার মানে কি দেশের ১৪ শতাংশ ধূমপায়ী রাতারাতি পরম সুবোধ বালক হয়ে তুলসী পাতা চিবানো শুরু করেছেন?

আজ্ঞে না! চায়ের দোকানে, পাড়ার মোড়ে কিংবা প্রত্যন্ত গ্রামের হাটে গিয়ে দেখুন—ধোঁয়া আগের চেয়েও দ্বিগুণ তেজে উড়ছে। পার্থক্য শুধু এইটুকু যে, আগে যে ধূমপায়ীর প্রতিটি টানের সাথে সরকারি কোষাগারে ভ্যাট আর সম্পূরক শুল্কের টাকা জমা হতো, মহাখালী কারখানা উচ্ছেদের পর সেই ধূমপায়ীর ঠোঁটে এখন শোভা পাচ্ছে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর, ময়মনসিংহের ঘাগড়া কিংবা চট্টগ্রামের হালিশহরের গোপন কারখানায় বানানো ‘দুই নম্বর’ ও নকল সিগারেট! অর্থাৎ ধূমপান এক রতিও কমে যায়নি, কেবল বৈধ রাজস্বের পাইপলাইনটি কেটে নিখুঁত কায়দায় সংযোগ দেওয়া হয়েছে শূন্য রাজস্বের চোরাই সিন্ডিকেটের ট্যাংকে।

উচ্ছেদের মহাফল আসলে কার পকেট ভারী করল?

এখন মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন হলো—শত বছর ধরে চলা যে দেশের সর্বোচ্চ করদাতা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানটিকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে মহাখালী থেকে বের করে দেওয়া হলো, তাতে প্রকৃতপক্ষে লাভের গুড় কোন পিঁপড়ায় খেল? আসুন, লাভ-লোকসানের এই খতিয়ানটি একটু মিলিয়ে দেখি:

  • নকল সিগারেট মাফিয়াদের ঈদ উৎসব ও ডলারের স্বপ্ন: সবচেয়ে বড় পোয়াবারো হয়েছে আন্ডারগ্রাউন্ডের নকল সিগারেট সম্রাটদের। চট্টগ্রামের সাবেক কাউন্সিলর আবদুস সবুর লিটনের গোপন গুদামে যে ৩ কোটি ৩৭ লাখ ৫০ হাজার পিস অবৈধ সিগারেট স্ট্যাম্প আর চোরাই সিগারেট পেপার পাওয়া গেল, কিংবা কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে কাস্টমসের সিলগালা ভেঙে শাকিল আহমেদ ও লোকমান হোসেন লিওনরা যে ২০-২৫ লাখ শলাকা নকল সিগারেট বানাল—মহাখালী কারখানা স্থানান্তরের ফলে সৃষ্ট সরবরাহ ঘাটতি তাদের জন্য আলাদিনের চেরাগ হয়ে এসেছে। সরকারকে এক পয়সা কর না দিয়ে বেনসন, ডার্বি, স্টার আর পাইলটের নকল মোড়কে তারা এখন সারা দেশের বাজার শাসন করছে, আর তাদের চোখে ঘুম ভাঙছে সোজা ডলারের বৃষ্টির স্বপ্ন দেখে!
  • কোম্পানির ভেতরের ‘মীর জাফর’ ও ভ্যাট বাবুদের পকেট স্ফীতি: দ্বিতীয় সর্বোচ্চ লাভবান হয়েছে বিএটি বাংলাদেশের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা লক্ষ টাকা বেতনভোগী কিছু অসাধু স্টাফ এবং কাস্টমস-ভ্যাটের কতিপয় কর্মকর্তা। বৈধ কোম্পানির মূল কারখানা যখন স্থানান্তরের জটিলতায় ব্যস্ত, তখন কোম্পানির কিছু প্রতিনিধি কুষ্টিয়ায় ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে জব্দ হওয়া ২ কোটি টাকার নকল সিগারেট ও মেশিন রাতের আঁধারে থানার এজাহারে মাত্র ৩ লাখ টাকা দেখিয়ে মাফিয়াদের জামিনের ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন! ময়মনসিংহে গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য নস্যাৎ করে ভ্যাট কর্মকর্তারা সাজানো নাটক করছেন, আর বিএটি’র আঞ্চলিক বাবুরা সাংবাদিক দেখলে পার্কিং লটে দাঁড়িয়েই হাত জোড় করে বিদায় দিচ্ছেন!
  • মহাখালীর রিয়েল এস্টেট ও ইজারা রাজনীতির বিজয়: ১৯১০ সালে যে জঙ্গলঘেরা মহাখালীতে কারখানা করার জন্য বিএটি-কে ডেকে আনা হয়েছিল, ১১৬ বছর পর সেই জমির দাম এখন সোনার চেয়েও দামি। একটি চলমান শিল্প কারখানাকে এভাবে হটিয়ে দেওয়া যে কেবল ‘বাতাসে ভাসমান ধূলিকণা’ কমানোর নিষ্পাপ পরিবেশবাদী আবেগ থেকে ঘটেছে—তা বিশ্বাস করার মতো সারল্য অন্তত অর্থনীতির ছাত্রদের নেই।

লোকসানের বোঝা কি কেবল কোম্পানির, নাকি ফতুর হলো রাষ্ট্রও?

অনেকে হয়তো তৃপ্তির ঢেকুর তুলে ভাবছেন—যাক, ব্রিটিশ-আমেরিকান কোম্পানির পকেট থেকে ৭১৪ কোটি টাকা স্থানান্তর ব্যয় খসেছে, তাতে আমাদের কী! কিন্তু হিসাবের খাতা খুললে দেখা যায়, কোম্পানির চেয়েও দশগুণ বড় ধাক্কাটি খেয়েছে খোদ বাংলাদেশ রাষ্ট্র এবং এর কর কাঠামো।

  • প্রথমত, বিএটি বাংলাদেশ কোনো সাধারণ মুদি দোকান নয় যে আজ এখান থেকে উঠিয়ে কাল ওখানে বসিয়ে দিলেন আর সব ঠিকঠাক চলল। এ তো সেই প্রতিষ্ঠান—যারা ৩৫ টাকার উপার্জনে মাত্র ১ টাকা নিজেদের রেখে ৩৪ টাকাই তুলে দিত বাংলাদেশের হাতে! এই সোনালি রেশিওর একক বৃহত্তম জোগানদাতা যখন থমকে গেল, তখন সরকারের বছরে ৪৭,৫২৩ কোটি টাকার রাজস্ব আয়ের লাইফলাইনে সরাসরি টান পড়ল। যখনই কোম্পানিটিকে ৭১৪ কোটি টাকার অনাকাঙ্ক্ষিত স্থানান্তর ব্যয়ের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হলো, তখনই কোম্পানির মুনাফা ও করযোগ্য আয় কর্পূরের মতো উড়ে গেল, যার সরাসরি কোপ পড়ল সরকারি কোষাগারে।
  • দ্বিতীয়ত, বৈধ কোম্পানিকে যখন উচ্ছেদ ও স্থানান্তরের যাঁতাকলে ফেলে দুর্বল করা হলো, তখন সেই সুযোগে অবৈধ ও নকল সিগারেট সিন্ডিকেট বাজার দখল করে বছরে প্রায় ২০,০০০ কোটি টাকার রাজস্ব গিলে খাচ্ছে! একদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) তাদের লক্ষ্যমাত্রা থেকে ৪২,০০০ কোটি টাকা পিছিয়ে থেকে টাকার জন্য হাহাকার করছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কাছে ঋণের কিস্তির জন্য ধরনা দিচ্ছে; অন্যদিকে নিজেদের রাজস্বের সোনার ডিম পাড়া হাঁসটিকে জবাই করে চোরাই সিন্ডিকেটের হাতে কুড়ি হাজার কোটি টাকা তুলে দেওয়া হচ্ছে!

এই অর্থনৈতিক আত্মহত্যার দায়ভার নেবে কে?

আজ যদি লন্ডন কিংবা ওয়াশিংটনের কোনো বিনিয়োগকারী প্রশ্ন করেন—“হে বঙ্গদেশের নীতিনির্ধারকগণ! ৩৫ টাকার উপার্জনে ৩৪ টাকা ট্যাক্স দেওয়া যে কোম্পানিটি শত বছরেরও বেশি সময় ধরে সর্বোচ্চ করদাতার মুকুট পরে আছে, তাদের সাথেই যদি এমন উচ্ছেদ-লীলা চালানো হয় এবং তাদের ব্র্যান্ড নকলকারীদের যদি তোমাদের ভ্যাট কর্মকর্তা ও কোম্পানির অসাধু স্টাফরা মিলে জামিন পাইয়ে দেয়, তবে কোন দুঃখে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা তোমাদের দেশে কারখানা গড়তে আসবে?”—তখন বিডার কর্তাদের চোখের সামনের সেই কাল্পনিক ডলারের বৃষ্টি নিমেষেই শ্রাবণের ধারায় রূপ নিয়ে তাদের ভাসিয়ে নিয়ে যাবে!

মহাখালীর কারখানা উচ্ছেদ করে না কমেছে একজন ধূমপায়ী, না বন্ধ হয়েছে তামাকের ধোঁয়া। মাঝখান থেকে বৈধ কোম্পানির ৭১৪ কোটি টাকা গচ্চা গেছে, সরকারের কুড়ি হাজার কোটি টাকার রাজস্ব কালোবাজারিদের পেটে ঢুকেছে এবং দেশের ভেতরে থাকা কিছু অসাধু স্টাফ ও মাফিয়াদের সিন্ডিকেট আরও অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। পরিবেশ রক্ষার সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে যে আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে এই বিশাল ছিদ্র তৈরি করা হলো এবং বৈদেশিক বিনিয়োগের কফিনে পেরেক ঠোকা হলো—ইতিহাসের কাঠগড়ায় এর দায়ভার কি কেবলই ওই অদৃশ্য চালকদের ওপর বর্তাবে, নাকি সেই তথাকথিত পরিবেশবাদীদেরও নিতে হবে?

পরবর্তী পর্বে থাকছে: বিলাসবহুল করপোরেট বাবুদের ‘পার্কিং লট ডিপ্লোম্যাসি’ এবং সর্ষের ভেতরে থাকা দুই নম্বর স্টাফদের পোস্টমর্টেম!