বাংলাদেশ

বিচারিক আনুগত্যের নতুন রেকর্ড! অথচ সাংবাদিক বড় ভাই দেখলেন দোষ

f X

স্নেহাশীষ ঘোষ (মিশু)

​শিক্ষাঙ্গনের শ্রদ্ধেয় বড় ভাই, অনুসন্ধানী সাংবাদিক “শেখ মেহেদী হাসান নাদিম” ভাইয়ের প্রতি শুরুতেই গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। যাঁকে বড় ভাই হিসেবে শ্রদ্ধা করে এসেছি, সাংবাদিকতার জগতে তাঁর অভিজ্ঞতা, সাহস এবং সত্য অনুসন্ধানের নিষ্ঠার প্রতিও আমার সেই শ্রদ্ধা অটুট।

​নাদিম ভাই যেভাবে গভীর ও কঠোর আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে একটি বিষয়কে বিচারিক ওটিতে ঢুকিয়ে পোস্টমর্টেম করেন, বিভিন্ন বিচ্যুতি সামনে আনেন, তা নিঃসন্দেহে মনোযোগ দিয়ে পড়া এবং সংরক্ষণ করার মতো! তাঁর মতো অভিজ্ঞ একজন সাংবাদিক যখন কোনো বিষয়কে এত আনুবিক্ষনিক আইনি ও নথির আলোকে বিশ্লেষণ করেন, তখন আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল আমার মতো একজন সাধারণ মানুষেরও স্বাভাবিকভাবেই অনেক প্রশ্ন জাগে।

​তবে নাদিম ভাইয়ের প্রতি আমার শ্রদ্ধা অক্ষুণ্ণ রেখেই, তাঁর বিশ্লেষণটি আমি একটু প্রসিকিউশনের চশমা পড়ে বিষয়টি দেখার চেষ্টা করলাম।

​আমার প্রশ্নটি তাই কোনোভাবেই নাদিম ভাইকে অসম্মান করার প্রশ্ন নয়। বরং যাঁকে আমি শ্রদ্ধা করি, তাঁর কাছেই একজন ছোট ভাইয়ের সরল কৌতূহল হিসেবে প্রশ্নটি রাখছি।

​বিচারিক আনুগত্য নাকি হাইকোর্ট অবমাননা?

​বিজ্ঞ বিচারক মোহাম্মদ হারুন-অর-রশীদ কি সত্যিই হাইকোর্টকে অবমাননা করেছেন? নাকি তিনি উচ্চ আদালতের নির্দেশকে ‘থ্রি-টাইমস’ বেশি গতিতে মেনে নিয়ে বিচারিক আনুগত্যের এক নতুন নজির সৃষ্টি করেছেন?

​আমার মতো সাধারণ মানুষের পক্ষে আদালতের কঠিন ভাষা, ধারা-উপধারা কিংবা judicial hierarchy বোঝা কঠিন। আমি খুব সহজ একটি হিসাব বুঝি।

​মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ বললেন, চার মাসের মধ্যে তৃতীয় পক্ষকে সঙ্গে রেখে আপিলটি নিষ্পত্তি করতে হবে।

আর বিজ্ঞ বিচারক কী করলেন?

চার মাস অপেক্ষা করলেন না।

তিন মাসও না।

মাত্র এক মাসেই সব শেষ!

​তাহলে তো সাধারণ মানুষের চোখে প্রশ্ন জাগতেই পারে:

হাইকোর্ট বললেন চার মাস, আর বিজ্ঞ বিচারক যেন বললেন, “চার মাস কেন? এক মাসেই তো করা যায়!”

​অবিশ্বাস্য দ্রুততা ও সময়ের হিসাব

​এমন অবিশ্বাস্য দ্রুততা দেখে আমাদের সংক্ষুব্ধ হওয়ার বদলে আনন্দিত হওয়ার কথা কি নয়?

  • ​আদালতের মূল্যবান তিনটি মাস বেঁচে গেল।
  • ​রাষ্ট্রের সময় ও শ্রম বাঁচল।
  • ​বিচারকের সময় বাঁচল।
  • ​মামলাকারীরও সময় বাঁচল।

​কিন্তু এখানেই, নাদিম ভাই, আপনার অনুসন্ধান আমার মতো সাধারণ মানুষের সরল হিসাবটিকে আবার জটিল করে দেয়।

​আপনি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে দেখিয়েছেন, এই আদেশের ফলে হাইকোর্টের নির্দেশের উদ্দেশ্য কীভাবে প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।

​কিন্তু আমার বিনীত প্রশ্ন হলো, আপনার মতো অভিজ্ঞ ও আইন-নথি বিশ্লেষণে পারদর্শী সাংবাদিক যদি বিষয়টিকে এভাবে দেখেন, তাহলে বিজ্ঞ বিচারক কীভাবে এমন একটি আদেশ দিলেন?

​তিনি কি সত্যিই উচ্চ আদালতের নির্দেশ অমান্য করার মতো অবস্থান নিয়েছিলেন?

নাকি তাঁর রায়ের গভীরে এমন কোনো আইনি ফাঁক ফোকড় বা অদৃশ্য দরজা ছিল, যা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের চোখে ধরা পড়েনি?

​সেই ‘অদৃশ্য আইনি দরজা’ কোথায়?

​হাইকোর্ট তৃতীয় পক্ষকে মামলায় প্রয়োজনীয় পক্ষ হিসেবে রেখে বিচারের নির্দেশ দিয়েছিলেন। অথচ বিজ্ঞ বিচারক মামলা ও আপিল প্রত্যাহারের আবেদন মঞ্জুর করে এক আদেশেই পুরো বিষয়টির সমাপ্তি ঘটালেন।

​তাহলে, নাদিম ভাই, আমার শ্রদ্ধার জায়গা থেকেই আপনাকে ছোট ভাই হিসেবে একটি প্রশ্ন করি:

এই যে এক ঝটকায় পুরো মামলা ও আপিল প্রত্যাহারের সেই আইনি দরজাটি খুলে গেল, সেই দরজাটি আসলে কোথায়?

কোন ধারায়?

কোন উপধারায়?

বিচারিক আইনের কোন বিশেষ বিধানে?

​যদি সত্যিই উচ্চ আদালতের চার মাসের নির্দেশকে মাত্র এক মাসে তিন গুণ গতিতে বাস্তবায়ন করার এমন কোনো বৈধ পদ্ধতি থেকে থাকে, তাহলে তো সেটি বিচারিক দক্ষতার এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত!

​হয়তো মহামান্য হাইকোর্টের উচিত হবে এমন অসামান্য দ্রুততার জন্য একটি জাতীয় সেমিনার আয়োজনের ব্যবস্থা করা:

“কীভাবে চার মাসের বিচারিক নির্দেশ এক মাসে বাস্তবায়ন করা যায়”

​কিন্তু সেই সেমিনারের শেষে যদি আমার শ্রদ্ধেয় বড় ভাই নাদিম ভাইয়ের মতো কোনো সাহসী সাংবাদিক হাত তুলে প্রশ্ন করেন:

“মান্যবর, গতি তো বাড়ালেন, কিন্তু তৃতীয় পক্ষকে সঙ্গে রেখে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার যে নির্দেশ হাইকোর্ট দিয়েছিলেন, সেই উদ্দেশ্যটি পূরণ হলো কীভাবে?”

​তখন হয়তো আসল প্রশ্নটি সেখানেই এসে দাঁড়াবে।

​সত্য অনুসন্ধানের প্রত্যাশা

​তাই নাদিম ভাইয়ের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই আমার ছোট্ট প্রশ্নটি থাকল:

​বিজ্ঞ বিচারক যে ‘অদৃশ্য আইনি দরজাটি’ দিয়ে হাইকোর্টের নির্দেশ এড়িয়ে গিয়ে এই সমাপ্তিতে পৌঁছালেন, সেই দরজাটি আমাদের একটু দেখিয়ে দিন।

​কারণ সত্যিই যদি সেই দরজার কোনো আইনি ভিত্তি থাকে, তাহলে আমরা সাধারণ মানুষও তা জানতে চাই।

আর যদি আপনার অনুসন্ধান ও নথিপত্রের আলোকে প্রমাণিত হয় যে আইনে এমন কোনো দরজার অস্তিত্বই নেই, তাহলে হয়তো আপনার পরবর্তী পর্বে আমাদের হাসি- সরিয়ে রেখে আরও কঠিন এবং অপ্রিয় কিছু সত্যের মুখোমুখি হতে হবে।

​শ্রদ্ধেয় নাদিম ভাই, প্রশ্নটি তাই আপনার বিরুদ্ধের নয়, আপনার কাছেই।

একজন ছোট ভাইয়ের প্রশ্ন।

উত্তরের অপেক্ষায় রইলাম।