বিগত দশ-পনেরো বছর ধরে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও আজকের বাস্তবতা
মোহাম্মদ উল্যা, নোয়াখালী জেলা প্রতিনিধি

দশ-পনেরো বছর ধরে পড়াশোনা করেও অনেকেই ঠিকঠাক একটি দরখাস্ত লিখতে পারেন না—এ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার বহুদিনের আলোচিত বাস্তবতা। ছোটবেলায় আমরা যে দরখাস্ত লেখা শিখেছি, তার গায়ে যেন ব্রিটিশ আমলের ধুলো লেগে ছিল। “স্যার, বিনীত নিবেদন এই যে…..” দিয়ে শুরু হওয়া ভারিক্কি বাক্য, ডানদিকে তারিখ, বামদিকে নাম লেখা, শেষে “আপনার বিশ্বস্ত/অতি নিবেদিত” ইত্যাদি সব মিলিয়ে তা ছিল একেবারে স্থির, প্রথাগত, চিরচেনা একটি ধরন।
কিন্তু সময় বদলেছে। যোগাযোগব্যবস্থা, দাপ্তরিক আচার, এমনকি ভাষার ব্যবহারও বদলেছে। আধুনিক আমেরিকান স্টাইলের আবেদনপত্র এখন সংক্ষিপ্ত, পরিষ্কার এবং উদ্দেশ্যমূলক।
এই পরিবর্তনের ছায়াই দেখা যায় ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের পঞ্চম শ্রেণির নতুন বাংলা বইয়ের নমুনা আবেদনপত্রে। বইটির পাতায় চোখ রাখলে সহজেই বোঝা যায়, অতীতের দরখাস্তের সঙ্গে এর মিল খুবই কম, বরং পার্থক্যই বেশি।
পরিবর্তনের মূল দিকগুলো
ভাষার সরলীকরণ: এখন একটি স্পষ্ট লক্ষ্য হলো ভাষার সরলীকরণ। ‘বিনীত নিবেদন’-এর পরিবর্তে ব্যবহার হয়েছে সহজ শব্দ—‘আমি আবেদন করছি’, ‘অনুগ্রহ করে বিষয়টি বিবেচনা করবেন’ ইত্যাদি। শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনে ব্যবহৃত আধুনিক, সরল ও সংলাপঘন ভাষার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করাই এর উদ্দেশ্য।
গঠনগত পরিবর্তন: পুরনো দরখাস্তে প্রেরকের ঠিকানা, তারিখ, প্রাপকের ঠিকানা সব মিলিয়ে এক দীর্ঘ আনুষ্ঠানিক কাঠামো ছিল; নতুন স্টাইলে এটি অনেক সংক্ষিপ্ত। প্রয়োজনীয় অংশ রাখা হয়েছে, অপ্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা বাদ। এতে শিশুদের জন্য লেখাটি শেখা সহজ, বাস্তব প্রয়োগও স্বচ্ছন্দ।
আমেরিকান স্টাইলের প্রভাব: নতুন আবেদনপত্রে আমেরিকান স্টাইলের প্রভাব স্পষ্ট। ব্রিটিশ শৈলীর “Sir/Madam” বা দীর্ঘ সৌজন্যমূলক উপক্রমণের জায়গায় আছে নির্দিষ্ট সম্বোধন। “Subject:” হিসেবে বিষয়টি শুরুতেই উল্লেখ করা হয়েছে, যা আগে পাঠ্যবইয়ে খুব কম দেখা যেত। শিশুদের সামনে একক, পরিষ্কার, মানসম্মত একটি ফরম্যাট উপস্থাপন করা হয়েছে।
উদ্দেশ্যকেন্দ্রিকতা: এখন উদ্দেশ্যকেন্দ্রিকতা অগ্রাধিকার পেয়েছে। আগে দরখাস্তে অতিরিক্ত ভূমিকাংশ থাকত, যা মূল বিষয়কে আড়াল করত। নতুন আবেদনপত্রে দুই-তিনটি সুস্পষ্ট বাক্যে অনুরোধ জানিয়ে শেষ করা হয়েছে। এতে লেখার যৌক্তিকতা বাড়ে, পাঠকের সময়ও বাঁচে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, নতুন প্রজন্মকে অতীতের ভারে নয়, বর্তমানের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রস্তুত করার লক্ষ্যেই এই নতুন আবেদনপত্রের ধরন। শিক্ষা শুধু তথ্য শেখানো নয়; সময়োপযোগী যোগাযোগ ও দক্ষতাও শেখানো জরুরি। পঞ্চম শ্রেণির বইয়ে আনা এই পরিবর্তন তাই শুধুই ফরম্যাট বদল নয়, এটি বদলে দেওয়া ভবিষ্যতের স্বাক্ষর।
