নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা

ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের আমলে সবচেয়ে বড় লুটপাট হয়েছে যেসব প্রকল্পে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো পদ্মা রেল সেতু সংযোগ প্রকল্প। এই প্রকল্পে মোট ব্যয় হয়েছে ৩৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা। প্রকল্পটিতে কতটা দুর্নীতি-লুটপাট হয়েছে তা সরকারের অডিট বিভাগের সর্বশেষ প্রতিবেদনেই কিছুটা বেরিয়ে এসেছে। মহাপরিচালক, অডিট অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে উপস্থাপিত তথ্যে বলা হয়েছে, অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে পদ্মা সেতু রেল প্রকল্পে ১৩,৩৬১ কোটি ৫২ লাখ টাকা সরকারের আর্থিক ক্ষতি করা হয়েছে। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, প্রকল্পে বরাদ্দের এক-তৃতীয়াংশ অর্থই আত্মসাৎ হয়ে গেছে। সরকারের আর কোনো প্রকল্পে এত ব্যাপকহারে অর্থ আত্মসাতের সুনির্দিষ্ট তথ্য জানা নেই। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আদতে পদ্মা সেতু নির্মাণের পর পদ্মা রেল সেতু নির্মাণের কোনোই প্রয়োজনীয়তা ছিল না। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, প্রকল্প ব্যয়ের পুরো ৩৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকাই জলে গেছে।
দুর্নীতি ধামাচাপার অভিযোগ
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের শুরুতে এমনটা বলা হয়েছিল যে, পদ্মা রেল সেতুর দুর্নীতি-লুটপাটের বিষয়ে বড় ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে। রেল বিভাগের মন্ত্রী-সচিবসহ কর্মকর্তারা ছাড়াও তৎকালীন ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তাঁর বোন শেখ রেহানা এই দুর্নীতি-লুটপাটে সরাসরি জড়িত। অবশেষে বড় ধরনের দুর্নীতির প্রমাণও মিলেছে সরকারের অডিট প্রতিবেদনে। কিন্তু তারপরও এ পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং এসব গুরুতর অনিয়মে সরাসরি জড়িত কর্মকর্তারা শাস্তির পরিবর্তে পেয়েছেন পুরস্কার এই অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই, সৎ দাবিদার উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান এবং সচিব মো. ফাহিমুল ইসলামের হাত দিয়েই। শুধু তাই নয়, এই পদ্মা রেল সেতু প্রকল্পে হাসিনা-রেহানারা ভয়াবহ দুর্নীতির খতিয়ান এখন ধামাচাপা দেওয়ারও চেষ্টা চলছে। এবং তাতে উপদেষ্টা ও সচিব উভয়েরই সায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করছে।
সূত্র জানায়, গণমাধ্যমে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমন কমিশন সম্প্রতি নড়েচড়ে উঠেছিল। কিন্তু রেল বিভাগ থেকে যোগাযোগ করে তা থামিয়ে দেওয়া হয়েছে। রেল বিভাগের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন রেল সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত। তিনি এ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক পদে ছিলেন। এই পদে থাকার সুবাদে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানার সঙ্গে তাঁর সরাসরি যোগাযোগ ছিল। ডিজি আফজাল হোসেন দুদককে বলেছেন, অডিট প্রতিবেদন সবই মীমাংসা হয়ে যাবে। কাজেই এ নিয়ে অগ্রসর হওয়ার আর প্রয়োজন নেই। তিনি এ বিষয়ে উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান এবং সচিব ফাহিমুল ইসলামের রেফারেন্সও ব্যবহার করেছেন। উপদেষ্টা ও সচিব উভয়েই নাকি দুদকের কোনো পদক্ষেপ চাচ্ছেন না। দুদক সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।
অডিট প্রতিবেদনের বিস্তারিত ও গুরুতর অনিয়ম
পদ্মা রেল সেতু প্রকল্পের শুরু থেকেই যে ভয়াবহ রকমের অনিয়ম-দুর্নীতি, সরকারি অর্থের অপব্যয় ও আত্মসাৎ হয়েছে তা সর্বশেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনেই উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোট ১৩ হাজার ৩ শত ৬১ কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে। তারমধ্যে ‘গুরুতর অনিয়ম’ অর্থাৎ যেগুলো মোটেই ‘মীমাংসা যোগ্য নয়’ এ রকমের অনিয়ম রয়েছে ৯ হাজার ৬ শত ৯৩ কোটি টাকা।
কিন্তু জানা গেছে, ‘মীমাংসা যোগ্য নয়’ এমন গুরুতর অনিয়মগুলোও এখন ধামাচাপা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে রেল বিভাগে। এবং এটা হচ্ছে খোদ মহাপরিচালক আফজাল হোসেনের তত্ত্বাবধানেই, যিনি এসব দুর্নীতি-অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। এতো অপকর্মের পরেও উপদেষ্টা ফাওজুল কবির এবং সচিব ফাহিমুল ইসলাম তাঁকে প্রকল্প পরিচালক থেকে সরাসরি ডিজি পদে পদোন্নতি দিয়েছেন। তাও অন্য একাধিক সিনিয়র কর্মকর্তাকে ডিঙিয়ে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, দুদক যথাযথভাবে তদন্ত করলে আফজাল হোসেন ফেঁসে যাবেন এবং তাতে উপদেষ্টা-সচিবও বেকায়দায় পড়বেন, যদিও তারা তখনকার ঘটনার সঙ্গে মোটেই জড়িত নন। এতো ব্যাপক অনিয়মে সরাসরি জড়িত কর্মকর্তাকে শাস্তির পরিবর্তে ‘পদোন্নতি পুরস্কার’ কেন দিলেন, এ দায় তারা এড়াতে পারবেন না। আর তাই উপদেষ্টা ফাওজুল কবির এবং সচিব ফাহিমুল ইসলাম উভয়েই চাচ্ছেন হাসিনা-রেহানার হাজার হাজার কোটি টাকার এই মেগা দুর্নীতির খতিয়ান ধামাচাপা দিতে।উপদেষ্টা ও সচিবের সম্মতিতে এ ব্যাপারে রেল বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তার সমন্বয়ে আনঅফিসিয়ালি একটি টিমও গঠন করা হয়েছে, যারা ডিজি আফজাল হোসেনের নেতৃত্বে কাজ করছেন।
জানা গেছে, ‘মীমাংসা যোগ্য নয়’ এমন গুরুতর অনিয়মগুলোর তথ্য সম্পর্কে অডিট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে:
“নিজস্ব যোগসাজশে ঠিকাদারকে অবৈধ সুবিধা দিতে মূল চুক্তির বাইরের একটি খাতে ৫৫৬ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় দেখিয়ে তা আত্মসাৎ করা হয়েছে।”
ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত রেল লাইন নির্মাণে মূল নকশার চেয়ে গড়ে ১.৭ মিটার কম উচ্চতায় (সংশোধিত নকশা অনুযায়ী) মাটি ভরাটসহ অন্যান্য আইটেমের পরিমাণ কমে যাওয়া সত্ত্বেও ঠিকাদারদের অতিরিক্ত বিল পরিশোধ করা হয়েেেছ। এ রকমের ভয়াবহ অনিয়মের মাধ্যমে ২,১৩০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত রেল লাইন নির্মাণে মূল স্পেসিফিকেশনের চেয়ে বালির স্তরের পরিমাণ গড়ে ২০০ এমএম কম প্রদান করা সত্ত্বেও ঠিকাদারকে অতিরিক্ত বিল প্রদান করা হয়েছে ২১৬ কোটি ৭৯ লাখ টাকা।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রস্তুতকৃত প্রগ্রেস রিপোর্টের তুলনায় কাজ বেশি দেখিয়ে বিল পরিশোধ করা হয়েছে ১০১১ কোটি টাকা।
পদ্মা রেল সেতু প্রকল্পের কাজকে ‘বিশেষায়িত’ কাজ দেখিয়ে প্রাক্কলনের ১৭.১৫% উচ্চমূল্যে (ইপিসি/টার্নকি) চুক্তি করা হয়েছে। যার মাধ্যমে আত্মসাৎ হয়েছে ৩,৬০৬ কোটি ৮৮ লাখ টাকা।
এভাবে নানা অনিয়মের মাধ্যমে সরকারের ১৩ হাজার ৩ শত ৬১ টাকা আর্থিক ক্ষতি ও আত্মসাৎ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, যাত্রী ও মালামাল পরিবহনের যেসব ভুয়া হিসাবকে সামনে রেখে এই বৃহৎ প্রকল্পটি তৈরি করা হয়েছে তা আদৌ কখনো বাস্তবায়িত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। অর্থাৎ সক্ষমতা অনুযায়ী কাঙ্ক্ষিত যাত্রী ও মালামাল পরিবহন কখনোই সম্ভব হবে না। অদূর ভবিষ্যতেও সেই পরিমাণ যাত্রী বা মালামাল পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। এমন পরিস্থিতি দেখেই গত বছরের সেপ্টেম্বরে উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান অত্যন্ত হতাশা ব্যক্ত করেছিলেন। কিন্তু তিনিই এখন দুর্নীতি ধামাচাপা দেওয়ার কাজগুলো করছেন।
