দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়ে ভয় দেখানো যায়, সংশোধন করা যায় না

মোশাররফ হোসেন মুসা

​মানবসভ্যতার অগ্রগতি শুধু বিজ্ঞান, প্রযুক্তি কিংবা অর্থনৈতিক উন্নয়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; অপরাধের বিচার ও শাস্তি দেওয়ার পদ্ধতিও সভ্যতার অন্যতম মাপকাঠি। যে রাষ্ট্র অপরাধীকে সংশোধনের পরিবর্তে ভয় দেখিয়ে সমাজ নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, সে রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থায় মধ্যযুগীয় চিন্তার প্রভাব রয়ে গেছে বলে মন্তব্য করা যায়।

​সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড ও বিতর্ক

​সম্প্রতি সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশি নাগরিক নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিথি আক্তারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা দেশে-বিদেশে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। ২০২৬ সালের ১৪ অক্টোবর মক্কা অঞ্চলে তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। সৌদি কর্তৃপক্ষ মসজিদ প্রাঙ্গনে চুম্বন দেয়ার একটি অশোভন আচরণের কথা বললেও ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ্যে স্পষ্ট নয়। তাঁদেরকে আত্মপক্ষ সমর্থন, আইনজীবী নিয়োগ ও আপিলের সুযোগ দেয়া হয় নি। বাংলাদেশ সরকারও জানিয়েছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তাদের অবহিত করা হয়নি। ফলে বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও শাস্তির আনুপাতিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যদিও পরে সোসাল মিডিয়ায় এবিষয়ে ব্যাপক সমালোচনা দেখে গত ১৯ অক্টোবর বাংলাদেশের মক্কাস্থ কনসুলেট জেনারেল ছয় প্রশ্নের জবাব চেয়ে সৌদি আরবের কাছে চিঠি দিয়েছে।

​অপরাধ দমন ও ন্যায়সংগত দণ্ডের যৌক্তিকতা

​প্রশ্ন হলো, অপরাধ দমনের জন্য মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়া কতটা যৌক্তিক, বিশেষত যখন অভিযোগের প্রকৃতি ও বিচারপ্রক্রিয়ার বিস্তারিত তথ্য জনসমক্ষে স্পষ্ট নয়। অপরাধের গুরুত্ব বিচার করতে হবে প্রমাণ, আইন, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং ন্যায়সংগত দণ্ডের ভিত্তিতে—ধর্মীয় অনুভূতি কিংবা সামাজিক ক্ষোভের চাপে নয়।

​শাস্তির ইতিহাস ও বিবর্তন

​শাস্তির ইতিহাসে দেখা যায়- প্রাচীন সমাজে প্রতিশোধমূলক শাস্তি ছিল গোষ্ঠীগত নিয়ন্ত্রণ ও শাসকের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রধান ভিত্তি। হাম্মুরাবির আইনসংহিতা, কৌটিল্যের দণ্ডনীতি এবং গ্রিক দর্শনে শাস্তির নানা ধারণা পাওয়া যায়; তবে এসব ব্যবস্থায় সামাজিক মর্যাদাভেদে শাস্তির বৈষম্যও ছিল। মধ্যযুগে ধর্মীয় বিধান, রাজকীয় আইন ও স্থানীয় প্রথা বিচারকে প্রভাবিত করতো। ইসলামী আইনে কিসাস, দিয়াত, তাআজির কিংবা ইহুদি-খ্রীষ্টিয় আইনে ‘চোখের বদলে চোখ’-এর মতো শাস্তির প্রয়োগও ছিল শর্তসাপেক্ষ ও ভিন্নতাপূর্ণ।

​আলোকায়ন যুগ ও অপরাধ বিজ্ঞানের বিকাশ

​অষ্টাদশ শতকের আলোকায়ন যুগে বেকারিয়া, বেন্থাম ও কান্টের চিন্তায় শাস্তির আনুপাতিকতা, উপযোগিতা, ন্যায়সংগততা ও স্বেচ্ছাচার নিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রখ্যাত বৃটিশ আইনবিদ ইউলিয়াম ব্ল্যাকস্টোন বলেছেন- ‘একজন নিরপরাধ ব্যক্তির শাস্তি ভোগ করার চেয়ে দশজন অপরাধীর শাস্তি এড়িয়ে যাওয়া ভালো’। পরবর্তী সময়ে অপরাধবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের বিকাশে অপরাধীর সংশোধন ও পুনর্বাসনের ধারণা গুরুত্ব পায়। অপরাধের পেছনে দারিদ্র্য, বৈষম্য, পারিবারিক পরিবেশ ও মানসিক অবস্থার ভূমিকা বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষা, চিকিৎসা, প্রশিক্ষণ ও পুনঃএকীভূতকরণের ওপর জোর দেওয়া হয়।

​শাস্তির তত্ত্ব ও কার্যকর প্রতিরোধের উপায়

​শাস্তির প্রচলিত তত্ত্বগুলোর মধ্যে প্রতিশোধমূলক, দৃষ্টান্তমূলক, প্রতিরোধমূলক ও সংশোধনমূলক শাস্তির ধারণা উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও এসব শাস্তির সাথে সংশ্লিষ্ট আরও কয়েক প্রকার শাস্তি রয়েছে, সেগুলো হলো- সমাজ-সুরক্ষামূলক শাস্তি, পুনরুদ্ধারমূলক ন্যায়বিচার, ক্ষতিপূরণমূলক শাস্তি, নিন্দামূলক শাস্তি, শিক্ষামূলক শাস্তি ও মিশ্রশাস্তি। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির লক্ষ্য অন্যদের ভয় দেখিয়ে অপরাধ কমানো। কিন্তু কঠোর শাস্তিই যে অপরাধ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়, তার নিশ্চয়তা নেই। অপরাধ দমনে আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ, দ্রুত ও স্বচ্ছ বিচার, জবাবদিহি এবং ভুক্তভোগীর অধিকার রক্ষা সমান গুরুত্বপূর্ণ।

​মৃত্যুদণ্ড নিয়ে বৈশ্বিক চিত্র ও বৈষম্য

​অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ১৪৫টি দেশ মৃত্যুদণ্ড বাদ দিয়েছে বা প্রয়োগ করে না এবং ৫৫টি দেশ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে। তুরস্ক ২০০২ সালে শান্তিকালীন সময়ে এবং ২০০৪ সালে আইন করে সব পরিস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড বিলোপ করে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রসহ কিছু রাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকলেও এর কার্যকারিতা, ভুল রায়ের ঝুঁকি, বৈষম্যমূলক প্রয়োগ এবং নৈতিকতা নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে এক সামরিক ঘাটিতে ১৩ জনকে হত্যার দায়ে সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর নিদাল হাসানকে ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছে আদালত – যা ৩ ডিসেম্বর’ ২৬ তারিখে কার্যকর করা এবং সরাসরি সম্প্রচার করার কথা রয়েছে। তবে সেদেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সরাসরি সম্প্রচার করার বিষয়টি নিয়ে দ্বিমত প্রকাশ করেছেন। উল্লেখ্য ইউরোপ সহ উন্নত গণতান্ত্রিক দেশে হাস-মুরগীসহ গবাদী পশু প্রকাশ্যে জবাই করা হয় না।

​বিচারিক স্বচ্ছতা ও ক্ষমতার প্রশ্ন

​নজরুল ও সিথি আক্তারের শিরোচ্ছেদের ঘটনাটি প্রশ্ন তুলেছে, তারা যদি শক্তিশালী দেশের নাগরিক হতেন, তাহলে এরকম নির্মম শাস্তি বাস্তবায়ন হতো কি না? দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়ে তারা কি সে দেশের নাগরিকদের সংশোধন করতে পেরেছে? সৌদি রাজপরিবারের শত শত সদস্যদের বিদেশে গিয়ে বেলাল্লাপনার অভিযোগ প্রায়ই পত্রিকায় দেখা যায়। ২০২৬ সালের ৯ মাসে বাংলাদেশের ৯৭৯ জন গৃহকর্মী সেদেশে গিয়ে নির্যাতিত ও নানাভাবে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়ে দেশে ফিরে এসেছেন। কোনো রাষ্ট্রের আইন থাকলেই তার প্রয়োগ ন্যায়সংগত হয়ে যায় না; ন্যায়বিচারের জন্য প্রয়োজন প্রকাশ্য ও যাচাইযোগ্য প্রক্রিয়া, স্বাধীন প্রতিরক্ষা, নিরপেক্ষ বিচার এবং শাস্তির আনুপাতিকতা। বিচারিক তথ্য অস্পষ্ট থাকলে মৃত্যুদণ্ডের মতো অপরিবর্তনীয় শাস্তি আরও বেশি নৈতিক সংকট তৈরি করে।

​সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও জনরোষের প্রভাব

​এই ঘটনায় একজন বিএনপি দলীয় এমপি তাঁদেরকে ‘পাপী’ আখ্যা দিয়ে মরদেহ দেশে না আনার বক্তব্য দিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন। পরে অবশ্য ক্ষমা চেয়ে বলেন- কয়েকজন আলেমের সঙ্গে কথা বলে তিনি জেনেছেন, শাস্তিটি ধর্মীয় বিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়নি। এই বিতর্কের শিক্ষা হলো—আদালতের রায় ও প্রমাণের আগে কাউকে সামাজিকভাবে দোষী সাব্যস্ত করা উচিত নয়। ধর্মীয় অনুভূতি, রাজনৈতিক বক্তব্য বা জনরোষ কোনোভাবেই ন্যায়সংগত বিচারপ্রক্রিয়ার বিকল্প হতে পারে না।

​আধুনিক রাষ্ট্রের পরিচয় ও জনগণের প্রত্যাশা

​একটি সভ্য রাষ্ট্রের লক্ষ্য শুধু অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া নয়; অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো, ভুক্তভোগীর অধিকার রক্ষা, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং সম্ভব হলে অপরাধীকে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া। মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রে ভুল রায় সংশোধনের সুযোগ নেই – এমন ব্যবস্থা রাষ্ট্রের হাতে মানুষের জীবন নেওয়ার ক্ষমতার অপব্যবহার বা বৈষম্যের ঝুঁকি তৈরি করে। তাই দৃষ্টান্ত স্থাপনের নামে নিষ্ঠুরতা নয়, স্বচ্ছ বিচার, আনুপাতিক শাস্তি, মানবিক মর্যাদা ও আইনের শাসনই হওয়া উচিত আধুনিক রাষ্ট্রের পরিচয়। সৌদি আরবের নির্মম ঘটনাটির বিরুদ্ধে লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রতিবাদ জানিয়ে প্রমাণ করেছেন – এদেশের মানুষ গণতান্ত্রিক শাসনই চান এবং তারা আদালতের ন্যায়বিচারের পক্ষপাতী।