মোঃ মাসুদ মিয়া

বাংলাদেশে ডেঙ্গু এখন আর কোনো মৌসুমি বা রাজধানীকেন্দ্রিক রোগ নয়; এটি একটি বড় জাতীয় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে এডিস মশার অনিয়ন্ত্রিত বংশবৃদ্ধির কারণে প্রতি বছরই ডেঙ্গুর প্রকোপ মারাত্মক আকার ধারণ করছে। তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধ এখন শুধু স্বাস্থ্য বিভাগের একার দায়িত্ব নয়; এটি প্রশাসন, স্থানীয় সরকার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং সর্বোপরি প্রতিটি নাগরিকের সম্মিলিত দায়িত্ব।
এডিস মশার আচরণ ও ভাইরাসের ধরন
এডিসের প্রজনন ও আক্রমণের ধরন সাধারণ মশার চেয়ে ভিন্ন। এরা মূলত পরিচ্ছন্ন ও জমে থাকা পানিতে ডিম পাড়ে। ফুলের টব, এসি কিংবা ফ্রিজের ট্রে, ছাদ বা বারান্দায় পড়ে থাকা ডাবের খোসা, প্লাস্টিকের বোতল বা অব্যবহৃত টায়ারে ৩ থেকে ৫ দিনের বেশি পানি জমে থাকলেই তা এডিসের আদর্শ প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হয়। এরা প্রধানত সকাল ও সন্ধ্যার দিকে বেশি কামড়ায়।
আইইডিসিআর-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ডেঙ্গু ভাইরাসের ‘ডেনভি-৩’ এবং ‘ডেনভি-২’ ধরন দুটি বেশি সক্রিয়। এর মধ্যে ডেনভি-৩ সংক্রমণের হার ৯১ শতাংশের বেশি। ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও ময়মনসিংহের মতো প্রধান শহরগুলোতে এটি ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি দেখা দিয়েছে।
লক্ষণ, পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা
ডেঙ্গুর প্রধান লক্ষণ তীব্র জ্বর (১০১-১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট), চোখের পেছনে ব্যথা, মাংসপেশি ও গাঁটে প্রচণ্ড যন্ত্রণা (ব্রেক বোন ফিভার) এবং শরীরে ফুসকুড়ি বা র্যাশ ওঠা। তবে শিশু ও গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে অনবরত বমি, তীব্র পেট ব্যথা, নাক-মাড়ি দিয়ে রক্তক্ষরণ কিংবা হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়ার মতো বিপজ্জনক লক্ষণ দেখা দিলে অবিলম্বে হাসপাতালে ভর্তি করা জরুরি।
জ্বর দেখা দিলে প্রথম ১ থেকে ৫ দিনের মধ্যে এনএস-১ (NS1) অ্যান্টিজেন ও সিবিসি (CBC) পরীক্ষা করানো প্রয়োজন। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কেবল নির্ধারিত ডোজে প্যারাসিটামল ব্যবহার করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই অ্যাসপিরিন বা আইবুপ্রোফেন জাতীয় ব্যথানাশক খাওয়া যাবে না, কারণ এটি রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। পাশাপাশি রোগীকে ডাবের পানি, ওআরএস, স্যুপসহ প্রচুর তরল খাবার খাওয়াতে হবে।
‘ক্লিন সানডে’ ও ময়মনসিংহের প্রশংসনীয় মডেল
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসন ও সিটি করপোরেশনের “ক্লিন সানডে” বা “পরিচ্ছন্ন রবিবার” কর্মসূচিটি আজ দেশজুড়ে একটি অনুকরণীয় রোল মডেল। “যেখানে আমি, সেখানেই পরিচ্ছন্নতা”—এই বার্তা নিয়ে প্রতি রবিবার জেলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ আঙিনা পরিষ্কার করছেন।
এছাড়া উপজেলা প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ, স্কাউট, রেড ক্রিসেন্ট ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে সম্পৃক্ত করে নিয়মিত লার্ভিসাইড প্রয়োগ, সরকারি-বেসরকারি অফিস ও বাজারে পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সচেতনতা নিশ্চিত করার কাজ পরিচালিত হচ্ছে।
জাতীয় অভিযান ও নাগরিকের ভূমিকা
দেশব্যাপী ডেঙ্গুর সংক্রমণ রুখতে সরকার ১২ সেপ্টেম্বর থেকে ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত তিন মাসব্যাপী বিশেষ পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতামূলক অভিযান চালু করেছে। সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষা ও পৃথক ওয়ার্ডের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়াও ২৪ ঘণ্টা যেকোনো পরামর্শ পেতে স্বাস্থ্য বাতায়নের ৩৩৩ নম্বরটি সচল রয়েছে।
তবে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি নাগরিক সচেতনতাই ডেঙ্গু প্রতিরোধের মূল চাবিকাঠি। এডিসের প্রজননচক্র ভাঙতে হলে প্রতি তিন দিনে অন্তত একবার নিজ বাড়ির চারপাশ, ফুলের টব ও আঙিনা পরিষ্কার করতে হবে। দিনের বেলা ঘুমানোর সময়ও মশারি ব্যবহার করা এবং শিশুদের শরীর ঢাকা পোশাক পরানো নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, সিটি করপোরেশন/পৌরসভা এবং সাধারণ জনগণ—এই চার স্তম্ভের সমন্বিত প্রচেষ্টাই পারে একটি ডেঙ্গুমুক্ত, নিরাপদ ও সুস্থ বাংলাদেশ নিশ্চিত করতে।
