অর্পিত সম্পত্তিতে নামজারির মহোৎসব: আদালতে সাফল্যের আত্মঘাতী দলিল

অনুসন্ধানী ধারাবাহিক: ৫ম পর্ব

​শেখ মেহেদী হাসান নাদিম

​”একদিকে বিস্তর অর্পিত জমি আত্মসাতের দুর্নিবার তৃষ্ণা, আর অন্যদিকে সেই দখলদারিত্বকে বৈধতার পোশাক পরাতে বারবার দেওয়ানি আদালতের আঙিনায় শরণাপন্ন হওয়া”—এই দুইয়ের এক অপূর্ব ও হাস্যকর সংমিশ্রণ নিয়ে রচিত হচ্ছে “খালেক মাস্টারের দেওয়ানি মহাকাব্য’। ইতিহাস সাক্ষী, যে জমিই গ্রাস করার চেষ্টা চালানো হয়েছে, প্রতিবারই দেওয়ানি আদালত ও বিচারিক অনুসন্ধান স্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছে—“আপনারা এই জমির মালিক নন”। তবুও জমি দখলের নেশায় আদালতের বারান্দায় নতুন নতুন চাল কাটার এই বারংবার চেষ্টা বিচারিক অঙ্গনে আজ এক মহাকাব্যিক রসালো উপাখ্যানে পরিণত হয়েছে!

​এই মহাকাব্যেরই রোমাঞ্চকর নতুন অধ্যায় রচিত হলো সম্প্রতি ময়মনসিংহের দেওয়ানি আপিল আদালতে। মামলার দীর্ঘ জটিল পথ পাড়ি দিয়ে থলে থেকে বিড়াল বের হওয়ার উপক্রম হতেই, দেওয়ানি কার্যবিধির ১৫১ ধারার ২৩ আদেশের ১ নম্বর নিয়ম অনুযায়ী মামলা প্রত্যাহারের আবেদন জমা দিল বাদীপক্ষ। দরখাস্তের ছত্রে ছত্রে পরম আত্মতৃপ্তি ফুটিয়ে তুলে তারা যখন স্বগর্বে লিখিতভাবে জানাল—“আমাদের উদ্দেশ্য সফল হইয়াছে”, তখন আইনপাড়ার বিজ্ঞ আইনজীবীরাও এক মুহূর্তের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। কারণ, আদালতের দাপ্তরিক নথিতে নিজেদের সুপরিকল্পিত জালিয়াতি ও অর্পিত সম্পত্তি আত্মসাতের এমন নগ্ন ‘আত্মঘাতী দলিল’ নিজ হাতে সই করে জমা দেওয়ার ঘটনা বিচারিক ইতিহাসে সত্যিই বিরল!

​ফৌজদারি বিচারে ফৌজি আসামির ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দি যেমন নিজের মুখেই অপরাধের হাঁড়ি ভেঙে দেয়, দেওয়ানি আপিলের এই লিখিত প্রত্যাহারনামাও রাষ্ট্রের কাছে ঠিক তেমনই এক অখণ্ডনীয় দালিলিক ফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—কোন মহাজাদুমন্ত্রের বলে বাদীরা আদালতের বিচারিক নথিতে নিজেদের অসৎ উদ্দেশ্যের এই হাঁড়িটি নিজ হাতে ভেঙে দিয়ে এলো?

​অনুসন্ধানের গভীরে গিয়ে আইনপাড়ার অন্দরমহলের সূক্ষ্ম বিচার-বিশ্লেষণে উন্মোচিত হলো এক মাস্টারস্ট্রোক কৌশলের ব্যাকস্টোরি! বাদীপক্ষের আইনি পরামর্শক হয়তো পার্থিব আদালতের অলিগলিতে রাষ্ট্রকে ফাঁকি দেওয়ার রাস্তা খুব ভালো করেই চিনতেন। কিন্তু একই সাথে, অর্পিত সম্পত্তি গ্রাস করার এমন এক প্রাতিষ্ঠানিক অন্যায়ের আইনি ও নৈতিক পাপের বোঝা এককভাবে নিজের কাঁধে না টেনে, পরম চতুরতার সাথে এই ‘মৌন সম্মতির আইনি ফাঁদটি’ দরখাস্তের খসড়ায় গুঁজে দিয়েছিলেন। জালিয়াতির মাধ্যমে অর্পিত সম্পত্তি হাতিয়ে নেওয়ার আনন্দে বিভোর বাদীরা যখন সানন্দে সেই খসড়ায় সই ঠুকে দিল, তখন তারা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি—যে কাগজকে তারা আদালত থেকে কেটে পড়ার ‘বিজয় সনদ’ ভেবে জমা দিচ্ছে, চতুর সেই খসড়ার বদৌলতে তারা নিজেদের অজান্তেই রাষ্ট্রীয় নথিতে নিজেদের অপরাধনামা আনুষ্ঠানিকভাবে দাখিল করে দিয়ে এসেছে!

​নামজারির মহোৎসব ও ৯৬ ঘণ্টার হিসাব

​কোন ‘উদ্দেশ্য সফল‘ হওয়ার মহান আনন্দে গদগদ হয়ে বাদীরা আদালতে এই আত্মঘাতী প্রত্যয়নপত্র দাখিল করেছিল? উত্তর লুকিয়ে রয়েছে স্থানীয় ভূমি অফিসের ক্যালেন্ডারের পাতায়। আদালতে “আমাদের উদ্দেশ্য সফল হইয়াছে” বাক্যটি লিখে দরখাস্ত দাখিল করার ঠিক ৪ দিনের মাথায় সহকারী কমিশনারের (ভূমি) অলৌকিক জাদুমন্ত্রে বেরিয়ে আসে ৬-৬টি তাজা নামজারি খতিয়ান!

​অর্থাৎ, আদালতে লিখিত ‘সাফল্যের আত্মস্বীকৃতি’ আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেওয়ার আগেই ভূমি অফিসের চত্বরে নামজারির যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রাখা হয়েছিল। চারদিকের আয়োজনের বন্দোবস্ত নিখুঁত দেখেই বাদীরা আদালতে গিয়ে মামলা প্রত্যাহারের চূড়ান্ত চালটি চালে এবং মাত্র ৯৬ ঘণ্টার ব্যবধানে বহুকাঙ্খিত ‘ফসল’ ঘরে তোলে।

​‘খালেক মাস্টারের দেওয়ানি মহাকাব্যের’ এই ভূখণ্ড-সার্কাসের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অধ্যায়টি রচিত হয়েছিল সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ডের বদলি বা পোস্টিংয়ের ঠিক আগমুহূর্তে। বিদায়বেলার সেই স্পর্শকাতর সময়টিকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে কাজে লাগায় চতুর বাদীপক্ষ। বিজ্ঞ এসিল্যান্ড কর্মকর্তা হিসেবে নিষ্ঠাবান হলেও, তাঁর বদলির ঠিক মুখে মুখে বাদীরা অত্যন্ত গোপনে ও সুচতুরভাবে আদালতের যাবতীয় নথি, আপিল ও আইনি জটিলতার মূল তথ্যগুলো তাঁর অগোচরে চেপে রাখে।

​দেওয়ানি আদালত ও মহামান্য হাইকোর্টের আইনি সত্যকে আড়াল করে বাদীরা এমন এক বিভ্রান্তিকর পরিবেশ তৈরি করে, যার সুযোগ নিয়ে বিদায় নেওয়ার আগমুহূর্তে সেই কর্মকর্তা না জেনে-বুঝে স্পর্শকাতর এই নামজারি ফাইলগুলোতে স্বাক্ষর করে যান। ফলে প্রশাসনিক স্বচ্ছতার অজুহাতে বিদায়ী কর্মকর্তার সততাকে ঢাল বানিয়ে অর্পিত সম্পত্তি ব্যক্তিমালিকানায় নেওয়ার চূড়ান্ত বাজিটি খেলে বাদীরা!

চতুর খসড়া ও ‘মৌন সম্মতির’ আইনি ফাঁদ

​ঘটনাক্রম ও দিনপঞ্জির (Timeline) ধারাবাহিকতা পর্যালোচনা করলে পুরো চক্রান্তের ক্যানভাসটি দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে যায়। আদালতে দেওয়ানি রিভিশন কিংবা স্থগিতাদেশের তথ্য গোপন রেখে গোপনে নামজারির ফাইল তৈরি করা, তারপর তড়িঘড়ি আদালতে গিয়ে “উদ্দেশ্য সফল হইয়াছে” লিখে আপিল প্রত্যাহার, আর তার ঠিক চার দিন পর ৬টি নামজারি খতিয়ান হাতে পাওয়া—এই নিখুঁত টাইমিং প্রমাণ করে জালিয়াতিটি কতটা সুপরিকল্পিত ছিল।

​তবে এই পুরো নাটকে সবচেয়ে মোক্ষম রাজনৈতিক ও আইনি চালটি চালেন সেই চতুর পরামর্শক নিজেই। ভূমি অফিসে তথ্য গোপন করে অর্পিত সম্পত্তি হাতানোর আইনি ধোঁয়াশা তৈরি করা গেলেও, অন্যায়ের যাবতীয় আইনি ও সামাজিক দায়ভার যেন শতভাগ বাদীদের কাঁধেই গিয়ে পড়ে—সেজন্যই ওই “আমাদের উদ্দেশ্য সফল হইয়াছে” বাক্যটি দরখাস্তের হৃদপিন্ডে বসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বাদীরা মনে করেছিল তারা জিতে গেছে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ৪ দিনের ব্যবধানে বের হওয়া ৬টি নামজারি এবং আদালতে জমা পড়া ওই দরখাস্তটিই আজ তাদের অপরাধের সবচেয়ে বড় দালিলিক প্রমাণ (Documented Evidence)।

মহামান্য হাইকোর্টের রুল ও নড়বড়ে নামজারির আইনি ভবিষ্যৎ

​তথ্য গোপন করে বিদায়ী এসিল্যান্ডের অজান্তে ৬টি খতিয়ানের অলৌকিক ম্যাজিক বের করা আর বাদীদের উল্লাস যতই চড়ামেদে উঠুক না কেন, আইনি কাঠামোর সামনে এই কাগজের খতিয়ানগুলোর স্থায়ীত্ব তাসের ঘরের চেয়েও নড়বড়ে।

​দেওয়ানি আদালতের বিতর্কিত প্রত্যাহার আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে মূল উত্তরসূরি স্নেহাশীষ ঘোষ মিশুর সিভিল রিভিশন (নং ৩২১৮/২০২৬) আবেদনের শুনানি শেষে মহামান্য হাইকোর্টের বিজ্ঞ বিচারক বিচারপতি মোঃ আলী রেজা নিম্ন আদালতের সেই প্রত্যাহার আদেশের ওপর ইতিমধ্যেই ৬ মাসের স্থগিতাদেশ (Stay Order) প্রদান করেছেন।

​স্টেট অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড টেন্যান্সি অ্যাক্ট (SAT Act, 1950)-এর ১৪৩ ও ১৫০ ধারা এবং দেওয়ানি আইনের সর্বজনগ্রাহ্য নীতি হলো—Mutation does not create or extinguish title (নামজারি কেবল সরকারের রাজস্ব আদায়ের প্রশাসনিক ব্যবস্থা, এটি মূল মালিকানা তৈরি করতে পারে না)। তা ছাড়া আদালতে তথ্য গোপন করে কিংবা জালিয়াতি ও অসৎ উদ্দেশ্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা যেকোনো প্রশাসনিক নামজারি আইনের বিচারে শুরু থেকেই শূন্য ও বাতিল (Void ab initio)।

​গোহাইলকান্দি উচ্চ বিদ্যালয়ের সীমানার ভেতরের জমি এবং কোটি কোটি টাকার ‘খ’ তফসিলভুক্ত অর্পিত সম্পত্তি গিলে খাওয়ার এই মহানাটকে বাদীরা ভেবেছিল চতুরতায় তারা জয়ী হয়েছে। কিন্তু আদালতের নথিতে নিজেদের অজান্তেই রেখে যাওয়া সেই ‘সাফল্যের আত্মস্বীকৃতি’ এবং হাইকোর্টের ঝুলে থাকা আইনি রুলের কারণে, অর্পিত সম্পত্তি আত্মসাতের সেই বিশাল জালিয়াতি আজ রাষ্ট্র ও জনগণের কাছে চূড়ান্তভাবে উন্মোচিত।

​(চলবে…)