অনুমোদনহীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান : লোপাট শিক্ষার গুণগত মান

মোহাম্মদ উল্যা, নোয়াখালী জেলা প্রতিনিধি

রাষ্ট্রের অন্যতম কর্তব্য হচ্ছে, সর্বক্ষেত্রে আইনের সার্বজনীন প্রয়োগ করা। আমি শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে বলছি। বাংলাদেশে প্রজ্ঞাপন নির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা চালু আছে। দেশে শিক্ষানীতি আছে; যাতে দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে আমলে আনা হয় না। যারা সরকারী বই পুস্তক পড়ায়, শুধুমাত্র তারাই শিক্ষানীতির আওতায় আছে। তাদের জন্য সরকারের বিধিমালা আমলে আনা হয়, তাদেরকেই সরকারের শিক্ষাবিভাগ দেখভাল করেন এবং প্রয়োজনীয় খবরদারি করেন। কিন্তু এর ফাঁকে বিদ্যালয়গামী শিশুদের একটা বিশাল অংশ বাদ পড়ে যায়।

অননুমোদিত প্রতিষ্ঠানের উত্থান ও সমস্যা

সরকারি সুবিধাপ্রাপ্ত বিদ্যালয়সমূহ অনুমোদন বা স্বীকৃতির জন্য একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব, বিদ্যালয়ের আয়তন, খেলার মাঠ, শিক্ষকদের যোগ্যতা ইত্যাদি শর্ত যুক্ত থাকে। কিন্তু যারা সরকারের স্বীকৃতি চায় না, তাদের সম্পর্কে সরকারের কোনো প্রকার বিধিমালা নেই। এর ফলে দেশের যত্রতত্র বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। বিশেষ করে শহরের একটা ভবন ভাড়া করে শিশুদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করা এখন বেশ লাভজনক একটা ব্যবসায়। আপনারা একটা ছোট শহরকে ঘুরে আসুন। দেখবেন, দুই বর্গকিলোমিটারের মধ্যে দশটি বিদ্যালয় পাবেন। এদের কোনো প্রকার পাঠদান স্বীকৃতি নেই। এরা কী কী পাঠ্যপুস্তক বা পাঠ্যক্রম অনুসরণ করে তার সঠিক দিক নির্দেশনা নেই। তবে অভিভাবকেরা দৃষ্টিনন্দন নামে আকৃষ্ট হন। আবার এগুলো প্রতিষ্ঠার পেছনেও প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসার স্থানীয় শিক্ষকেরা সক্রিয়ভাবে জড়িত।

বিগত সরকারের আমলে একটা বিষয় সর্বমহলে প্রচারিত ছিল যে, সরকার ধর্মের বিরুদ্ধে বই পুস্তক পাঠ্য করেছে। বারো মাসে তেরো পার্বনের মতো সরকারের অনুষ্ঠান পালন করতে হতো। যেখানে শেখ পরিবারকে পূজা দিতে হতো। সরকার প্রতিমা পূজার ট্রাডিশান চালু করেছিলো। ফলে সাধারণ ধর্মভীরু মানুষ শিশুদের ইমান সুরক্ষার জন্য এই একটা বিকল্পই পেয়েছিলো। পাশাপাশি তারা চমক মাখা বিজ্ঞাপনও পেয়েছিলো। সঙ্গী ছিলো সরকারের টাকা খাওয়া শিক্ষকগণ।

আমরা খোঁজ খবর নিয়ে দেখেছি, প্রায় প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একশ গজের মধ্যে এক বা একাধিক শিশুশিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। অথচ সরকারি শিশুশিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনে দুটো প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নির্দিষ্ট দূরত্ব মৌলিক শর্ত। যেহেতু এসব প্রতিষ্ঠান সরকারি রেজিস্ট্রেশন নেয় না, তারা জবাবদিহিতার আওতায়ও আসে না। তবে সরকারি কর্মকর্তাদের একটা অংশ কিছু সালামি পেয়ে এসকল প্রতিষ্ঠান আন-অফিসিয়ালি পরিদর্শন করে।

শিক্ষার গুণগত মান ও শিশুদের ক্ষতি

উল্লিখিত প্রতিষ্ঠান স্থাপনের জন্য একটা আবাসগৃহ হলেই চলে। তাদের কোনো মাঠ নেই, খেলাধূলার ব্যবস্থা নেই। তারা শুধুমাত্র পড়া গলধকরণ করায়। এদের শিক্ষকদের কোনো প্রকার প্রশিক্ষণ নেই। এতে শিশুরা মানসিক দিক দিয়ে ক্ষতির শিকার হচ্ছে।

এদের একটা দিক মানুষকে আকৃষ্ট করছে। এদের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে পাঠদান চলে একশিফটে। আবার কিছু প্রতিষ্ঠানে সকাল সাতটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত পাঠদান চলে। মাঝখানে দুপুরে লম্বা বিরতি থাকে। শিশুরা খেয়েদেয়ে আসরের আগে দ্বিতীয়বার পড়তে আসে। এদের মাসিক বেতন ৫০০ থেকে ৩০০০ টাকা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। এরা পাঠ্যক্রমে প্রচুর বই রাখে। তারা একই সাথে আরবি, বাংলা ও ইংলিশ মিডিয়াম চালুর ব্যবস্থা করেছে; যা শিশুদেরকে ভীষণ চাপে ফেলছে। অভিভাবকবৃন্দ একের মধ্যে তিন পেয়ে খুশি। কিন্তু তাদের অগোচরে শিশুদের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি হচ্ছে।

এরা শিক্ষাব্যবস্থাকে, শিশুদেরকে রোবটিক পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে। অথচ সরকার একেবারেই বেখবর। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সমূহ শিক্ষার্থীশূন্য হয়ে যাচ্ছে। প্রজন্মকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষার জন্য শিক্ষাক্ষেত্রে যথেচ্ছ কাণ্ডকারখানা চলতে দেওয়া যায় না।

জবাবদিহিতা ও প্রত্যাশা

সরকার পুরো জনগোষ্ঠীর কল্যাণের লক্ষ্যে কাজ করবে। এটিই প্রত্যাশা ও যুক্তির কথা। মানুষ কাবিনবিহীন বিয়ে হলে যেমন করে আইনের ঊর্ধ্বে থাকে, তেমনি এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। এগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় না আনলে দেশের শিশুদের বিশাল অংশ বরবাদ হয়ে যাবে।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *