
বাসাবাড়ির ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা (রুফটপ সোলার) স্থাপন করে নিজস্ব বিদ্যুতের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করে বাড়তি অর্থ আয়ের সুযোগ করে দিয়েছে সরকার। নেট মিটারিং ব্যবস্থার আওতায় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এই উদ্যোগ গ্রহণ করলে প্রতি ইউনিট অতিরিক্ত বিদ্যুতের বিপরীতে ১০ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত প্রণোদনা পাওয়া যাবে।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর ২০২৬) বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে এই তথ্য জানানো হয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে সরকার এই যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে।
প্রণোদনা ও অর্থ প্রাপ্তির নিয়ম
বিদ্যুৎ বিভাগের গত ১ সেপ্টেম্বরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, আগামী ২০২৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালু করে জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করলে পরবর্তী তিন বছর প্রতি ইউনিটে ১০ টাকা ৫০ পয়সা হারে এই প্রণোদনা পাওয়া যাবে। নির্ধারিত শর্ত সাপেক্ষে ২০৩০ সাল পর্যন্ত এই সুবিধা বলবৎ থাকবে।
উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুতের বিপরীতে প্রাপ্য এই অর্থ নগদ প্রদান করা হবে না; বরং প্রতি তিন মাস পরপর তা সরাসরি গ্রাহকের ব্যাংক হিসাবে জমা দেওয়া হবে।
উৎপাদন হিসাব ও ছাদের উপযোগিতা যাচাই
গ্রাহকরা যাতে সহজেই নিজেদের ছাদের সক্ষমতা ও সম্ভাব্য খরচ-লাভের হিসাব করতে পারেন, সেজন্য বিদ্যুৎ বিভাগ একটি বিশেষ ‘রুফটপ সোলার ক্যালকুলেটর’ চালু করেছে।
- উদাহরণস্বরূপ, ২ হাজার বর্গফুটের একটি আবাসিক ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ সিস্টেম স্থাপন করা হলে মাসে গড়ে ১ হাজার ৮৩৩ ইউনিট এবং বছরে প্রায় ২১ হাজার ৯৯৬ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা থাকে।
- ছাদভিত্তিক এই ব্যবস্থায় প্যানেলের পাশাপাশি ব্যাটারি যুক্ত করলে বিদ্যুৎ না থাকলেও ব্যাকআপ হিসেবে সংরক্ষিত বিদ্যুৎ ব্যবহার করা সম্ভব। তবে এর জন্য বিএসটিআই (BSTI) এবং স্রেডা (SREDA)-এর নির্ধারিত কারিগরি মানদণ্ড অনুযায়ী প্যানেল, ইনভার্টার ও মিটার ব্যবহার করতে হবে।
সহজতর প্রক্রিয়া ও ‘বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন অধ্যাদেশ-২০২৬’
সৌরবিদ্যুতের দ্রুত সম্প্রসারণ নিশ্চিত করতে সরকার গত ১৯ অক্টোবর ‘বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন অধ্যাদেশ-২০২৬’ জারি করেছে। এই অধ্যাদেশের আওতায় বাসাবাড়ির ছাদ ছাড়াও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, পার্কিং লট, জলাশয় ও চা বাগানে সর্বোচ্চ ৫ মেগাওয়াট সক্ষমতার সৌর প্রকল্প স্থাপন করা যাবে।
গ্রাহকদের কারিগরি ও নীতিগত সহায়তা দিতে ইতিমধ্যে ওয়ান-স্টপ সার্ভিস সেন্টার এবং প্রতিটি বিতরণ সংস্থার জেলা-উপজেলা কার্যালয়ে বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এছাড়া সৌরবিদ্যুৎ খাতের সরঞ্জাম আমদানিতে শুল্ক ১৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে মাত্র ১ শতাংশ করা হয়েছে।
সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে উৎসাহ
নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকেও অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেই তাঁর বাসভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করেছেন এবং নিজের চাহিদা মিটিয়ে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করছেন। সম্প্রতি জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী মাত্র তিন দিনে সৌরবিদ্যুৎ থেকে ১ হাজার ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করার পাশাপাশি ১ হাজার ২০০ ইউনিট জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করেছেন।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ জনপ্রিয় করতে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণার পাশাপাশি নেট মিটারিং সংযোগের বর্তমান দীর্ঘসূত্রতা ও জটিলতা দূর করে দ্রুত সেবা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের এই বহুমুখী উদ্যোগ সাধারণ গ্রাহকদের বিদ্যুৎ বিলে সাশ্রয় আনার পাশাপাশি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে আরও সুদৃঢ় করবে বলে আশা করা হচ্ছে।