তথ্য প্রযুক্তির অন্ধকার দিক: রোমান্টিক চ্যাটের ফাইল থেকে সম্পূর্ণ কাল্পনিক আইনি প্রতিবেদন তৈরি করলো গুগল জেমিনি
শেখ মেহেদী হাসান নাদিম

বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) প্রযুক্তির জয়জয়কার এবং মানবজীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। তবে এর সমান্তরালে এআই-এর একটি মারাত্মক ত্রুটি—যাকে প্রযুক্তি পরিভাষায় ‘হ্যালুসিনেশন’ বা ‘কাল্পনিক তথ্য উৎপাদন’ বলা হয়—তা আরও একবার প্রমাণ করলো যে, অন্ধভাবে এই প্রযুক্তির ওপর ভরসা করা কতটা বিপজ্জনক হতে পারে।
সম্প্রতি ঘটে যাওয়া এক চাঞ্চল্যকর ঘটনায় দেখা গেছে, গুগল জেমিনি (Gemini) নামক জনপ্রিয় এআই মডেলটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপটের একটি ফাইলকে কেন্দ্র করে অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য কিন্তু সম্পূর্ণ বানোয়াট ও কাল্পনিক একটি আইনি প্রতিবেদন তৈরি করে দিয়েছে। সত্যের সাথে যার দূরতম কোনো সম্পর্কও নেই।
ঘটনার বিবরণ: প্রেমপত্রের জিপ ফাইল বনাম আইনি ষড়যন্ত্রের গল্প
অনুসন্ধানে জানা যায়, একজন ব্যবহারকারী (যিনি পেশায় একজন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের লাইসেন্সপ্রাপ্ত সাংবাদিক) মেসেঞ্জার থেকে ডাউনলোড করা একটি জিপ ফাইল জেমিনি এআই-এর কাছে উপস্থাপন করেন। উক্ত জিপ ফাইলটিতে মূলত একজন নারী এবং একজন পুরুষের মধ্যকার পারস্পরিক প্রেমের অত্যন্ত ব্যক্তিগত কথোপকথন (Messenger Chat) সংরক্ষিত ছিল।
কিন্তু জেমিনি এআই ফাইলটির ভেতরের মূল ডেটা বা প্রেক্ষাপট সঠিকভাবে প্রসেস করতে ব্যর্থ হয়। অথচ নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার না করে, সিস্টেমটি ব্যবহারকারীর পূর্ববর্তী কিছু মেমরি বা অন্য তথ্যের সূত্র ধরে সম্পূর্ণ কাল্পনিকভাবে ‘শহীদুল ইসলাম উৎপল’ নামক এক ব্যক্তির মিথ্যা মামলা ও আইনি লড়াইয়ের প্রেক্ষাপট তৈরি করে ফেলে। এআইটি অত্যন্ত সুনিপুণ ভাষা ও পেশাদার কাঠামোর একটি ‘বিশেষ আইনি প্রতিবেদন’ (LaTeX ফরম্যাটে) তৈরি করে দেয়, যেখানে উক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে হওয়া মিথ্যা মামলার সাক্ষী এবং বৈশ্বিক গণমাধ্যমের সমর্থনের মতো জটিল রাজনৈতিক বিষয়গুলোকে উপস্থাপন করা হয়।
এআই-এর মারাত্মক “হ্যালুসিনেশন” ও মিথ্যা রচনার দক্ষতা
এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, এআই মডেলগুলো সত্যের চেয়ে “কাঠামোগত সৌন্দর্য” এবং “ভাষাগত বিশ্বাসযোগ্যতা” তৈরির দিকে বেশি মনোযোগ দেয়।
- ১. বিভ্রান্তিকর বিশ্বাসযোগ্যতা: এআই যেভাবে পুরো প্রতিবেদনটি সাজিয়েছে, তা প্রথম দেখায় যে কারো কাছেই সত্য এবং অত্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক বলে মনে হবে।
- ২. প্রেক্ষাপটের সম্পূর্ণ বিকৃতি: একটি মিষ্টি রোমান্টিক কথোপকথনকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ও আইনি লড়াইয়ের মতো সংবেদনশীল প্রেক্ষাপটে রূপান্তর করা এআই-এর অ্যালগরিদমিক দুর্বলতার চরম বহিঃপ্রকাশ।
- ৩. সত্যের অপলাপ: সত্যের সাথে সামান্যতম সংযোগ না থাকা সত্ত্বেও এআই যেভাবে দাবিগুলো সাজিয়েছে, তা সামাজিক বা আইনি ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হলে বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারত।
সাংবাদিকদের ভূমিকা ও তীব্র সমালোচনা
ঘটনাটি যিনি উন্মোচন করেছেন, তিনি একজন পেশাদার সাংবাদিক। তিনি ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে জানান, এআই-এর এই “অসামান্য মিথ্যা কথা বলার দক্ষতা” এবং “প্রেক্ষাপট বিকৃত করার ক্ষমতা” অত্যন্ত ভীতিকর। কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়া এই প্রযুক্তির দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে যদি কোনো নিউজ পোর্টাল বা আইনি প্রতিষ্ঠান কাজ করত, তবে তা কেবল অপসাংবাদিকতাই ছড়াত না, বরং নির্দোষ মানুষের জীবনও ধ্বংস করে দিতে পারত।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা ও উপসংহার
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই-এর এই কাল্পনিক তথ্য তৈরির প্রবণতা (AI Hallucination) নতুন কিছু নয়, তবে জেমিনির মতো অগ্রগামী মডেলে এ ধরনের স্থূল ভুল অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এটি প্রমাণ করে যে, এআই এখনো মানুষের বিকল্প হতে পারেনি। বিশেষ করে সাংবাদিকতা, আইনি পর্যালোচনা এবং গবেষণার মতো স্পর্শকাতর ক্ষেত্রে মানুষের প্রত্যক্ষ নজরদারি এবং তথ্য যাচাইয়ের (Fact-checking) কোনো বিকল্প নেই।
এই বিভ্রান্তিকর ঘটনাটি বিশ্বব্যাপী এআই প্রযুক্তির নৈতিক ব্যবহার এবং এর সীমাবদ্ধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
