চার মাসের নির্দেশ, এক মাসে সমাপ্তি- আসল তাড়াহুড়োটা কি সময় বাঁচানোর নাকি পালানোর?

সরকারি সম্পত্তি আত্মসাৎ – (দ্বিতীয় পর্ব)

​শেখ মেহেদী হাসান নাদিম

​আদালতের বারান্দায় যেখানে একটি ফাইল এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে যেতেই কয়েক মাস কাবার হয়ে যায়, সেখানে চার মাসের কাজ এক মাসে নামিয়ে আনাকে কী বলা যায়? বিচারিক আনুগত্যের পরাকাষ্ঠা, নাকি কৌশলগত পলায়নবৃত্তি?

​মামলার অন্যতম পক্ষ স্নেহাশীষ ঘোষ সম্প্রতি এমনই একটি চোখ-কপালে তোলা প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন। হাইকোর্ট যখন নির্দেশ দিলেন চার মাসের মধ্যে আপিল নিষ্পত্তি করতে, ঠিক তার এক মাসের মাথায় বাদীপক্ষ আপিলটাই প্রত্যাহার করে কেটে পড়ল! স্নেহাশীষের ভাষায়—এ যেন ‘তিন গুণ স্পিডে বিচারিক পলায়ন’!

​গল্পটা যদি কোনো রূপকথার জাদুকর শোনাতেন, তবে হয়তো বলা যেত—আদালতের ক্যালেন্ডারে এ এক অলৌকিক গতি। কিন্তু এটি কোনো রূপকথা নয়, ময়মনসিংহের গোহাইলকান্দির ৭.৯৯ একর মূল্যবান অর্পিত জমি নিয়ে দুই দশকের পুরোনো এক বাস্তব লড়াই।

​দুই দশকের পুরোনো মামলা ও আসল ওয়ারিশের প্রবেশ

​২০০৫ সালে দায়ের হওয়া মূল মামলাটি দেওয়ানি বিচারিক আদালতের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে ২০১১ সালে খারিজ হয়েছিল। শুরু হলো আপিল। দীর্ঘ এক যুগ ঝুলে থাকার পর ২০২৩ সালে মূল স্বত্বাধিকারীর আসল ওয়ারিশ হিসেবে স্নেহাশীষ ঘোষ মিশু ৩য় পক্ষ হিসেবে এই আপিলে যুক্ত হতেই পুরো দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করে।

​হাইকোর্ট আদেশে স্পষ্ট করে দিলেন—নতুন পক্ষকে অন্তর্ভুক্ত রেখেই চার মাসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি করতে হবে। সাধারণ চোখে মনে হওয়ার কথা ছিল, দীর্ঘদিনের ঝুলন্ত একটি মামলার এবার বুঝি চূড়ান্ত আইনি নিষ্পত্তি হতে যাচ্ছে।

​কিন্তু ঠিক সেখানেই ঘটল আসল নাটকীয়তা। চার মাসের অপেক্ষা আর সইল না। ২০২৫ সালের ২৬ আগস্ট বাদীপক্ষ দেওয়ানি কার্যবিধির নিয়ম ধরে আদালত থেকে নিজেদের মূল মামলা আর আপিল—দুটোই একদম চুপচাপ প্রত্যাহার করে নিয়ে বিদায় নিল।

​আড়ালে সমান্তরাল জালিয়াতির ফাঁদ

​এখানেই যেকোনো সচেতন পাঠকের মনে কৌতূহল জাগা স্বাভাবিক—পরীক্ষার প্রশ্ন সামনে আসতেই পরীক্ষার খাতা জমা দিয়ে এক দৌড়ে বেরিয়ে যাওয়ার এই কৌশলটি কেন?

​আইনি পাড়ায় অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে যা বেরিয়ে এলো, তা দেওয়ানি চক্রান্তের আরও ভয়াবহ এক রূপ। আদালতে মামলা চলাকালেই বাদী ও তাদের সহযোগীরা (আফরোজা খাতুন, কামরুজ্জামান, খোরশেদুজ্জামান গং) আড়ালে এক সমান্তরাল জালিয়াতির ফাঁদ পাতছিল।

​নথিপত্র সাক্ষ্য দিচ্ছে, ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে তারা প্রথমে ২টি পৃথক নামজারি (২০৩৯২ ও ২১৭৭৪ নং) করিয়ে নেয়। এরপর আদালতে মামলা নিষ্পত্তির আইনি চাপ সৃষ্টি হতেই, দেওয়ানি মামলা চলমান থাকার মূল তথ্য সম্পূর্ণ গোপন করে সম্প্রতি (২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে) তড়িঘড়ি করে আরও ৬টি বেআইনি নামজারি (৪৭৩৫, ৪৭ ৩৮, ৪৭৩৯, ৪৭৪০, ৪৭৪১ ও ৪৭৪২ নং) হাসিল করে নেয়!

​দ্বিমুখী ফাঁদে পড়ে তড়িঘড়ি প্রস্থান

​বিষয়টি নজরে আসতেই ৩য় পক্ষ স্নেহাশীষ ঘোষ মিশু সহকারী কমিশনার (ভূমি), সদর, ময়মনসিংহে মিস মোকদ্দমা নং- ৯২৬(XIII)২০২৫-২৬ দায়ের করে উক্ত ৮টি অবৈধ নামজারিই বাতিলের আবেদন জানান। ভূমি অফিস থেকে যখন আফরোজা খাতুন ও খাদেজা বেগমদের বিরুদ্ধে ২৮/০২/২০২৬ খ্রিঃ তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে এই জাল নামজারি বাতিলের শুনানির নোটিশ জারি হলো, ঠিক তখনই তারা দেওয়ানি আদালতের মামলা প্রত্যাহার করে সটান কেটে পড়ার পথ বেছে নিল!

​অর্থাৎ, একদিকে দেওয়ানি আদালতে আসল ওয়ারিশের উপস্থিতিতে পরাজয় নিশ্চিত, অন্যদিকে ভূমি অফিসে গোপনে করা ৮টি জাল নামজারি ফাঁস হয়ে যাওয়া—এই দ্বিমুখী ফাঁদে পড়েই কি তবে তাদের এত তড়িঘড়ি প্রস্থান?

​বিচারব্যবস্থার প্রশ্ন ও আগামী পর্বের ইঙ্গিত

​আইন অনুযায়ী মামলা প্রত্যাহারের সুযোগ বাদীপক্ষের অবশ্যই আছে। কিন্তু এত বছরের রাষ্ট্রীয় সময়, অর্থ আর বিচারিক ব্যবস্থার পেছনে খরচ হওয়া দিনগুলোর হিসাব কি কেবল একটি প্রত্যাহার আবেদনেই চুকে যায়? গোপনে ভুয়া নামজারি বানিয়ে আবার আদালত থেকে সটান কেটে পড়ার এই চক্রান্ত কি বিচার ব্যবস্থার মুখে এক বড় প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দেয় না?

​দীর্ঘ এই আইনি চক্রান্তের এটি তো কেবল শুরুর দৃশ্য। হঠাৎ করে মামলা গুটিয়ে নেওয়ার এই তাড়া বুঝতে হলে ঘটনার সুতো ধরে টান দিতে হবে আরও পেছনের দিকে।

​সিএস রেকর্ডের রাম কুমার আইচ থেকে শুরু করে আর.ও.আর-এর অবিনাশ চন্দ্র দত্ত হয়ে জমির মালিকানার রূপান্তরটা ঠিক কীভাবে হয়েছিল? আর ১৯৯৫ সালের ৮.৫১ একর জমি কীভাবে ২০০৫ সালে এসে ৭.৯৯ হল?

​সেই জট খোলা যাক আগামী পর্বের ধীরস্থির গল্পের ভাঁজে…

​(চলবে…)