“গোহাইলকান্দি উচ্চ বিদ্যালয়ের সম্পত্তি অবৈধ” খালেকের আবেদনে আদালতের রায়

অনুসন্ধানী ধারাবাহিক: ৪র্থ পর্ব

​শেখ মেহেদী হাসান নাদিম

​ময়মনসিংহের গোহাইলকান্দিতে সরকারি ১ নম্বর খাস খতিয়ান ও অর্পিত সম্পত্তি ব্যক্তিগত চক্রান্তে গিলে খাওয়ার যাবতীয় অপচেষ্টা ২০১১ সালের ২৪ মার্চেই বিচারিক আদালতের রায়ে আইনিভাবে চিরতরে ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। ময়মনসিংহের ২য় যুগ্ম জেলা জজ আদালতের তৎকালীন বিজ্ঞ বিচারক মোঃ জহিরুল কবীর ‘অন্যান্য দেওয়ানি মামলা নং ২২/২০০৫’-এর চূড়ান্ত রায়ে বাদী খালেক মাস্টারের দাখিল করা আবেদন ও স্বত্ব ঘোষণার দাবি খারিজ করে ১৯২৭ সালের কথিত ৫২ শতকের দানপত্রকে সরাসরি ‘অস্তিত্বহীন’ ঘোষণা করেন। আদালতের স্পষ্ট পর্যবেক্ষণ ছিল: “যার দ্বারা সহজে অনুমেয় প্রকৃতপক্ষে এইরূপ কোন দলিলের কোন অস্তিত্ব নাই।” একই সাথে রায়ে বিচারিক চূড়ান্ত সিলমোহর বসিয়ে বিজ্ঞ বিচারক উল্লেখ করেন: “বাদী অত্যন্ত সুকৌশলে মূল জিনিস এড়াইয়া সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন মূল্যবান সম্পত্তি গ্রাস করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হইয়া বিভিন্ন কৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন।”

​উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ ছাড়া দেওয়ানি আদালতের এই রায় আইনত চূড়ান্ত ও অখণ্ডনীয়। ট্রায়াল কোর্টের এই সুনির্দিষ্ট রায়ের মাধ্যমে বাদীর কথিত স্বত্ব, মালিকানা ও বিদ্যালয়ের নামে দেওয়া ভুয়া দানপত্রের সমস্ত দাবি আইনের বিচারে সম্পূর্ণ ‘হোয়াইটওয়াশ’ ও অবৈধ প্রমাণিত হয়েছে। ফলে, ২০১১ সালের পর উক্ত সরকারি অর্পিত সম্পত্তি কিংবা গোহাইলকান্দি উচ্চ বিদ্যালয়ের সীমানায় থাকা জমি নিয়ে যেকোনো ব্যক্তিগত দখলদারিত্বের দাবি, প্রশাসনিক খামখেয়ালিপনা বা ফোনালাপের অজুহাত যে আইনের চোখে শুরু থেকেই বিচারিক রায় অবমাননা এবং সরকারি জমি আত্মসাতের শামিল—তা শতভাগ প্রমাণিত ও নথিভুক্ত।

ফোনালাপের প্রথম দুই মিনিটের নাট্যাভিনয় ও ‘রিটায়ারমেন্টের সুরক্ষার চাদর’

​আদালতের রায়ে সরকারি জমি দখলের জালিয়াতি উন্মোচিত হওয়ার প্রায় ১৫ বছর পর, ২০২৬ সালে গোহাইলকান্দি উচ্চ বিদ্যালয়ের বর্তমান জমির দাপ্তরিক বাস্তবতা জানতে ফোন করা হয় প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলামকে। কিন্তু সাংবাদিক পরিচয়ে কথা শুরু করতেই ফোনের ওপারে শুরু হলো এক চরম লুকোচুরি খেলা!

​কথোপকথনের প্রথম দুই মিনিট টানা অস্বীকার ও শাক দিয়ে মাছ ঢাকার মহড়া—

​“এটা কেন গোহাইলকান্দি স্কুল হতে যাবে? এটা তো ব্যক্তিগত ফোন নম্বর!”

​সাংবাদিকের ধারালো প্রশ্ন ও জেরার মুখে যখন তিন মিনিটের মাথায় অস্বীকারের দেওয়াল ধসে পড়ল, তখন তিনি সঙ্গে সঙ্গে গায়ে জড়িয়ে নিলেন এক অলৌকিক সুরক্ষার চাদর—“আমি তো চার-পাঁচ মাস আগে রিটায়ারমেন্টে চলে গেছি!”

​প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘ দুই দশকের সমস্ত দাপ্তরিক অবহেলা ও আইনি ব্যর্থতা এড়াতে এক নিমেষে ‘অবসরের আইনি দুর্গ’ বানিয়ে নিজেকে অধরা প্রমাণের এমন নাট্যাভিনয় দেওয়ানি অনুসন্ধানের ইতিহাসে বিরল।

দাপ্তরিক জিম্মাদারের সংবিধিবদ্ধ অপরাধ: অবসরে গেলেই কি দায় সাফ হয়?

​প্রশ্ন হলো, ২০১১ সালের আদালতের রায়ে খালেক মাস্টারের দানপত্র ভুয়া প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও, প্রধান শিক্ষক পদে আসীন থাকাকালীন নিজের সংবিধিবদ্ধ দাপ্তরিক দায়িত্ব পালন না করে কেবল ‘অবসরে যাওয়া’র অজুহাতে সাবেক প্রধান শিক্ষক কি দায় এড়াতে পারেন?

​আইন ও প্রশাসনিক বিধিমালার আলোকে তাঁর দাপ্তরিক বাধ্যবাধকতাগুলো ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট:

  • ​আইনগত জিম্মাদার হিসেবে ব্যর্থতা (Non-Government Secondary School Management Rules): ‘বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা বিধিমালা’ অনুযায়ী, প্রধান শিক্ষক কেবল পাঠদানের প্রধান নন; তিনি প্রতিষ্ঠানের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির ‘আইনগত জিম্মাদার’ (Legal Custodian / Trustee)। দীর্ঘ দুই দশক চেয়ারে বসেও তিনি বিদ্যালয়ের ৮৬ শতক জমির সরকারি নামজারি (Mutation) সম্পন্ন না করে ১ নম্বর খাস খতিয়ান ও অর্পিত সম্পত্তির খাতায় ফেলে রাখলেন কার স্বার্থে?
  • ​শিক্ষা বোর্ড ও মাউশিকে তথ্য না জানানোর অপরাধ (BISE & DSHE Rules): শিক্ষা বোর্ডের স্থায়ী স্বীকৃতি ও এমপিও (MPO) নীতিমালার স্পষ্ট শর্ত হলো—প্রতিষ্ঠানের নামে নিরঙ্কুশ জমি ও নিজস্ব খতিয়ান থাকা। ২০১১ সালে আদালতে খালেক মাস্টারের দানপত্র ‘জাল ও অস্তিত্বহীন’ প্রমাণিত হওয়ার পরও, তিনি তথ্য গোপন করে কেন জেলা শিক্ষা অফিসার (DEO), মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (DSHE) বা জেলা প্রশাসককে (DC) সরকারি অর্পিত সম্পত্তি থেকে বিদ্যালয়কে দীর্ঘমেয়াদী বন্দোবস্ত (Lease) দেওয়ার কোনো সরকারি উদ্যোগ নেননি?
  • ​‘খালেক মাস্টারের জমি’ জপের নেপথ্য স্বার্থ: যে লোক ফোনালাপের শুরুতে প্রথম তিন মিনিট স্কুলের পরিচয়কেই উধাও করে দিতে চাইলেন, সেই একই মুখ দিয়ে একটু পরেই অনায়াসে জপ শুরু হলো—“এটা তো খালেক মাস্টারেরই জমি!” আদালতের রায়ে দানপত্র অস্তিত্বহীন প্রমাণিত হওয়ার ১৫ বছর পরও এই মিথ্যাচার প্রমাণ করে—তাঁর এই ‘অবসরের নাটক’ কোনো নিরপেক্ষ অবস্থান নয়, বরং নিজের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সত্য গোপন করার এক চতুর ‘হাফ ট্রুথ, হাফ ড্রামা‘!

৮৬ শতকের জাদুকরী গণিত: ‘বাউন্ডারি ওয়াল’ যখন নতুন দাতা!

​সাবেক প্রধান শিক্ষকের বয়ানে এরপর ভেসে এলো বিদ্যালয়ের ৮৬ শতক জমির এক আজব গণিত! তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী স্কুলের বাউন্ডারির ভেতরের জমির হিসাবটি হলো:

  • ​৫২ শতক: খালেক মাস্টার দিছেন! (যা ২০১১ সালেই আদালত কর্তৃক ‘অস্তিত্বহীন ও ভুয়া’ প্রমাণিত হয়েছে!)
  • ​১০ শতক: আলাউদ্দিন মহাজন ২০০১-০২ সালের দিকে দিছেন।
  • ​২৪ শতক: এটার মালিক নাকি ‘বাউন্ডারি ওয়াল’!

​বাকি ২৪ শতক জমির কোনো রেজিস্ট্রি দলিল বা কাগজপত্র আছে কি না জানতে চাইলে সাবেক প্রধান শিক্ষকের ঐতিহাসিক জবাব—

​“না লিখিতভাবে দেয় নাই, এমনিতেই দিছে যে বাউন্ডারিটা মনে করে রাখছে। হয়তো কোনো কারণে দিতে পারে নাই।”

​অর্থাৎ, কোনো লিখিত দলিল নেই, খতিয়ান নেই, কেবল চারপাশে দেওয়াল তুলে দিলেই নাকি সরকারি জমি স্কুলের হয়ে যায়! দেওয়ানি ও ভূমি আইনের ইতিহাসে এমন ‘বাউন্ডারি ওয়ালীয় স্বত্ব’ আর কখনো দেখা যায়নি। সাবেক প্রধান শিক্ষক নিজেই স্বীকার করেন—স্কুলের নামে এই সরকারি অর্পিত সম্পত্তির খাজনা দিতে গিয়ে তিনি নিজেই আইনি গ্যাঁড়াকলে আটকে গিয়েছিলেন। “সবটাই তো মামলা, মামলা চলতেছে।”

পিতার মামলার ফাইলের পাহারাদারে ছেলে: গদিতে ‘ভারপ্রাপ্ত জাদুকর’

​গোহাইলকান্দি স্কুলের এই দেওয়ানি নাটকের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর দৃশ্যটি উন্মোচিত হয় প্রশাসনিক গদিতে!

​যে খালেক মাস্টারের বিরুদ্ধে ভুয়া কাগজপত্র বানিয়ে সরকারের কোটি টাকার অর্পিত সম্পত্তি ও স্কুলের জমি আত্মসাতের বিচারিক প্রমাণ মিলল, অবসরে যাওয়ার সময় সাবেক প্রধান শিক্ষক স্কুলের স্টিয়ারিং ও মামলার সমস্ত গোপন ফাইল বুঝিয়ে দিয়ে গেলেন কার হাতে? সেই মূল বাদী খালেক মাস্টারের জ্যেষ্ঠ পুত্র, সহকারী প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) খালেদুজ্জামানের হাতে!

​সাবেক প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম নিজেই পরম নিশ্চিন্তে পরামর্শ দিলেন—জমি ও চলমান মামলার যাবতীয় হাঁড়ির খবর জানতে হলে এই ‘পুত্রের’ শরণাপন্ন হতে হবে!

​“উনার কাছে আপনি বিস্তারিত জানতে পারবেন। উনারা তো মামলা যেহেতু করতাছে, এটা কি অবস্থায় আছে বিস্তারিত সেই জানে।”

​স্বার্থের সংঘাতের (Conflict of Interest) এর চেয়ে বড় ক্লাসিক নমুনা আর কী হতে পারে? ২০১১ সালের রায়ে যে দাবি ভুয়া ও সাজানো প্রমাণিত, সেই চক্রান্তে অভিযুক্ত মূল বাদীর ছেলে নিজেই এখন স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক এবং সরকারি জমি রক্ষা ও মামলার ফাইলের প্রধান জিম্মাদার! অন্যদিকে গত ৫ বছর ধরে বিদ্যালয়ে কোনো নির্বাচিত পরিচালনা কমিটি নেই; কেবল এডহক কমিটির প্রলেপ দিয়ে পুরো বিচারিক জালিয়াতিকে ঢেকে রাখার চেষ্টা চলছে।

​২০১১ সালের ট্রায়াল কোর্টের রায়ের কাছে এই সমস্ত প্রশাসনিক জালিয়াতি ও ফোনালাপের অপচেষ্টা ইতিমধ্যেই আইনিভাবে নিঃশেষিত ও বাতিল। ২০২৬ সালে এসে অবসরের নাটক, বাউন্ডারি ওয়ালের অলৌকিক দখল আর বাদীর ছেলের হাতে ফাইল হস্তান্তরের মাধ্যমে যে অবৈধতাকে ‘সত্য’ বানানোর চেষ্টা চলছে, দেওয়ানি ও প্রশাসনিক আইনের চোখে সেই ভণ্ডুল চক্রান্ত এখন পুরোপুরি উন্মোচিত।

​(চলবে…)