শত্রু

শেখ মেহেদী হাসান নাদিম

পরিচয় বদলে গেল।
প্রাকৃতিকভাবে যা কিছু নিয়ে আপনি পৃথিবীতে এসেছিলেন, তার কিছুই বদলায়নি। শরীর, মুখাবয়ব, রক্তের টান, পরিবার, স্মৃতি, ভালোবাসা কিংবা জন্মভূমি—সবকিছু আগের মতোই রয়ে গেল। শুধু বদলে গেল আপনার পরিচয়। জন্মের পর থেকে, কিংবা কয়েক পুরুষ ধরে যে পরিচয় বহন করে আপনি এতদূর এসেছেন, রাষ্ট্রের নথিতে একদিন তার পাশে লেখা হলো একটি শব্দ—শত্রু।

আয়নার সামনে অচেনা বাস্তবতা

একটু আয়নার সামনে দাঁড়ান।
আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে জানতে পারলেন, নিজের রাষ্ট্রই আপনাকে ‘শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। গতকাল সকালে এই একই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে কী হিসেবে দেখেছিলেন? পরিবার, প্রতিবেশী ও সমাজের মানুষই বা আপনাকে কী হিসেবে চিনত? চব্বিশ ঘণ্টার ব্যবধানে আপনি কোনো অপরাধ করেননি, রক্ত বা মাটিরও কোনো পরিবর্তন ঘটেনি; অথচ যে মাটির চেয়ে বয়সে ঢের ছোট এই রাষ্ট্র নিজে, সেই রাষ্ট্রই আজ মাটির সন্তানকে বলছে—তুমি শত্রু।

৩ ডিসেম্বর, ১৯৬৫: জরুরি অবস্থা ও শত্রু সম্পত্তি আইন

এক মুহূর্ত থামুন। নিজেকে সেই সময়ের একজন মানুষ হিসেবে কল্পনা করুন।
৩ ডিসেম্বর ১৯৬৫। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ‘ডিফেন্স অব পাকিস্তান রুলস’-এর অধীনে শত্রু সম্পত্তি প্রশাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি আদেশ কার্যকর হয়েছে। পৈতৃক বাড়ি, জমি কিংবা সম্পত্তির ওপর নেমে এসেছে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের নতুন খড়্গ।

পুরোনো মহল্লার চেনা সকাল ও শঙ্কার মেঘ

আপনি ময়মনসিংহের কোনো এক পুরোনো জনপদের বাসিন্দা। সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রতিদিনের মতো সংসারের কাজে ব্যস্ত হয়েছেন। উঠানে সন্তান খেলছে, স্ত্রী ঘরের কাজে ব্যস্ত, আর বৃদ্ধ মা-বাবা বাড়ির পরিচিত পরিবেশে দিন কাটাচ্ছেন। বাড়ি সেই একই বাড়ি। জমি সেই একই জমি। অথচ সম্পত্তির রাষ্ট্রীয় পরিচয় বদলে যাওয়ার আশঙ্কা আপনার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।

যুদ্ধকালীন আতঙ্ক ও পরিবারের সুরক্ষা সংকট

এবার নিজের বেঁচে থাকার কথা ভাবুন।
চারদিকে যুদ্ধকালীন জরুরি অবস্থার আতঙ্ক। এরই মধ্যে খবর এল, একজন বন্ধুতুল্য মানুষের বাড়িতে হামলা হয়েছে। বাড়ির সর্বস্ব লুট হয়েছে। পরিবারের সামনেই তাঁর স্ত্রী ও বোনের সম্ভ্রমের ওপর নেমে এসেছে আক্রমণ ও হুমকি। ঘটনাটি জানার পর আপনি নিজের পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়লেন।
ঘরে স্ত্রী, বোন ও কন্যা আছেন। মনে প্রশ্ন জাগছে—আজ কি আমার বাড়িতেও এমন ঘটনা ঘটবে? রাতের অন্ধকারে কি পরিবার নিয়ে পালাতে হবে? হয়তো সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, সম্পত্তি থাকুক পেছনে, আগে মানুষগুলোকে বাঁচাতে হবে। অথচ কোথায় যাবেন, কীভাবে বাঁচবেন, সামনে কী অপেক্ষা করছে—কিছুই জানেন না।

​চেনা সমাজের নিঃশব্দ রূপান্তর ও সামাজিক অবক্ষয়

কিন্তু এখানেই শেষ নয়।
পাড়ার দিকে একবার তাকান। যে বাড়ির সামনে দিয়ে এলাকার উচ্ছৃঙ্খল ছেলেরা একসময় মাথা নিচু করে চলত, যে পরিবারের সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখতে পারাকে অনেকে সৌভাগ্য মনে করত, সেই বাড়ির সামনের পরিবেশই আজ বদলে গেছে।
একসময় যে বাড়ির সামনে দিয়ে মানুষ সম্মান দেখিয়ে ছাতা নামিয়ে ফেলত, কেউ কেউ পায়ের জুতো হাতে নিত, ছোট শিশু কোলে থাকলে বাবা-মা তাকে আরও যত্নে সামলে নিতেন—আজ সেই বাড়ির সামনে দিয়েই কেউ কেউ অসম্মানজনক আচরণ করছে। যে পরিবারের মেয়েরা একসময় নির্ভয়ে রাস্তায় চলাফেরা করত, আজ তাদের লক্ষ্য করেই হচ্ছে অশালীন মন্তব্য, ইভটিজিং ও হয়রানি।
একটু ভাবুন। যে পারিবারিক পরিচয় গতকালও একটি তরুণীকে গোটা এলাকায় সম্মান ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিত, রাষ্ট্রীয় কাগজের একটি শব্দ কীভাবে আজ তাকে নিজের ঘরেও অনিরাপদ করে তুলল?

নৈতিক স্খলন ও দৃষ্টিভঙ্গির রূপান্তর

যে মানুষগুলো একসময় আপনার সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে পারাকে সম্মানের বিষয় মনে করত, তাদের কেউ আজ এড়িয়ে যাচ্ছে। কেউ কথা বলতে ভয় পাচ্ছে। কেউ নীরব দর্শক হয়ে থাকছে। আবার কেউ সেই দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে।
আপনি কি বদলে গেছেন? পরিবারের মানুষগুলো কি বদলে গেছে? নাকি আপনাকে দেখার চোখগুলো বদলে গেছে?

ময়মনসিংহের ঐতিহাসিক জনপদ ও শিকড়ের ঐতিহ্য

এবার শহরের দিকে তাকান। আমি এই ময়মনসিংহের সন্তান। ব্রহ্মপুত্রের পাদদেশে গড়ে ওঠা এই শহরের পুরোনো জনপদগুলোর নামের মধ্যে আজও অতীতের মানুষের শ্রম, ঘাম ও আদি পরিচয় খুঁজে পাই।
পণ্ডিতপাড়া, পুরোহিতপাড়া, রামবাবু রোড, জে.সি. গুহ রোড, সি.কে. ঘোষ রোড, গঙ্গাদাস গুহ রোড, হিন্দুপল্লি, ব্রাহ্মপল্লি।
এই নামগুলো শুধু রাস্তা বা এলাকার পরিচয় নয়। এগুলোর পেছনে রয়েছে মানুষের বসতি, পরিবার, পূর্বপুরুষ এবং প্রজন্মের পর প্রজন্মের স্মৃতি। একটি জনপদ গড়ে উঠতে শত শত বছর লাগে। মানুষ বাড়ি তৈরি করে, রাস্তা তৈরি করে, বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে, ব্যবসা গড়ে তোলে। তাদের নাম, কাজ ও স্মৃতি একসময় সেই এলাকার পরিচয় হয়ে ওঠে। আজও আমাদের ব্যক্তিগত ও আইনি বিষয়ে, যোগাযোগের ঠিকানায়, লেখাপড়া ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আমরা সেই মানুষগুলোর দেওয়া পরিচয়কেই ব্যবহার করে চলেছি।

ইতিহাস ও পরিচয়ের নির্মম বৈপরীত্য

তাহলে যে পূর্বপুরুষদের শ্রমে-ঘামে এই ভূখণ্ডের আদি পরিচয় গড়ে উঠল, যাঁদের বসতির স্মৃতি আজও এই শহরের নামের মধ্যে টিকে আছে—সেই ‘পরিচয় প্রদানকারী’ পরিবারগুলোকেই একসময় রাষ্ট্রের নথিতে ‘শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত করা হলো কীভাবে? যে বাড়িতে একসময় সম্মান ছিল, সেই বাড়ির মানুষকে কেন একদিন নিজের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে হলো? যে পরিবার এই জনপদের পরিচয়ের অংশ ছিল, তাদের সন্তানদের কেন একসময় নিজেদের পূর্বপুরুষের বাড়ির ঠিকানা কেবল গল্প করে বলতে হবে?

বাস্তুভিটা হারানোর বেদনা

একটি বাড়ি হারানো মানে শুধু কয়েকটি দেয়াল হারানো নয়। হারিয়ে যায় পরিচিত রাস্তা, প্রতিবেশী, শৈশব, পারিবারিক স্মৃতি, সামাজিক মর্যাদা এবং ফিরে আসার নিশ্চয়তা।

প্রবাসীর সংলাপ ও স্মৃতির আশ্রয়

একজন বাবা হয়তো একদিন তাঁর সন্তানকে বলবেন, “এই শহরের অমুক জায়গায় তোমার দাদার বাড়ি ছিল। সেখানে তোমার পূর্বপুরুষেরা বসবাস করতেন।”
সন্তানটি হয়তো প্রশ্ন করবে, “তাহলে আমরা সেখানে থাকি না কেন?”
সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে বাবাকে বলতে হবে, “আমরা তো কোথাও যাইনি খোকা; একসময় আমাদের পরিচয় বদলে গিয়েছিল। যে বাড়িকে নিজেদের বলে জানতাম, সেখানে আমাদের থাকা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল।”

প্রাকৃতিক অধিকার ও নাগরিক সমতার প্রশ্ন

একবার নিজের জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন। বাড়ি, পরিবার, সামাজিক সম্মান, সন্তানের নিরাপত্তা এবং নিজের জন্মভূমিতে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা যদি একসঙ্গে প্রশ্নের মুখে পড়ে, তখন আপনি কী আঁকড়ে ধরবেন?
সম্ভবত শুধু একটি জিনিস—বেঁচে থাকার প্রাকৃতিক অধিকার।
এই ইতিহাস কোনো একটি সম্প্রদায়ের প্রতি অনুকম্পা দেখানোর বিষয় নয়। এটি মানুষের পরিচয়, নিরাপত্তা, সম্পত্তির অধিকার এবং নিজের জন্মভূমিতে সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকারের প্রশ্ন। গতকাল যিনি মায়ের সন্তান ছিলেন, সন্তানের বাবা ছিলেন, স্ত্রীর স্বামী ছিলেন, প্রতিবেশীর বন্ধু ও শহরের একজন পরিচিত মানুষ ছিলেন—আজ তাঁর নামের পাশে একটি শব্দ বসে গেল: শত্রু।

বিবেকের কাঠগড়ায় প্রশ্ন ও আত্মোপলব্ধি

এখানেই একটি প্রশ্ন রেখে যাই।
যাঁদের দেওয়া পরিচয়ে আজও এই জনপদের অলিগলি পরিচিত, তাঁদের ললাটে এই ‘শত্রু’ তকমাটি এঁটে দেওয়ার অধিকার কে দিয়েছিল? কে ছিল এই ‘শত্রু’ শব্দটির প্রথম উচ্চারণকারী? আর যে মানুষটি গতকালও আপনার প্রতিবেশী, বন্ধু ও স্বজন ছিলেন, আজ তাঁর পরিচয় বদলে যাওয়ায় আপনি তাঁকে কীভাবে দেখতে শুরু করলেন?
মানুষটি কি সত্যিই বদলে গেছেন, নাকি তাঁকে দেখার আপনার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেছে?
অন্তত একবার নিজের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে এই প্রশ্নটির উত্তর খুঁজুন।

সম্পাদনা ও ঐতিহাসিক টীকা

১৯৬৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর জারিকৃত ‘ডিফেন্স অব পাকিস্তান অর্ডিন্যান্স’ ও ‘ডিফেন্স অব পাকিস্তান রুলস’ (বিধি ১৮২)-এর অধীনে জারি হয় শত্রু সম্পত্তি (তত্ত্বাবধায়ন ও নিবন্ধন) আদেশ। এরই ধারাবাহিকতায় ৩ ডিসেম্বর ১৯৬৫-এর প্রাদেশিক দাপ্তরিক আদেশের মাধ্যমে শত্রু সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা ও তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়াকে মাঠপর্যায়ে কার্যকর করা হয়। এটি প্রত্যেক ব্যক্তির সম্পত্তি ওই দিনই তালিকাভুক্ত হয়েছিল এমন দাবি নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়ার নির্ধারক পদক্ষেপ।


উল্লিখিত স্থাননামগুলো ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন ও ভূমি জরিপ নথিতে প্রচলিত ঐতিহাসিক নাম।

চলবে,,,,