শেখ মেহেদী হাসান নাদিম

রাষ্ট্র যখন তার গাম্ভীর্য হারিয়ে ফেলে, তখন তার প্রতিটি পদক্ষেপ জনগণের কাছে ‘কৌতুক’ হিসেবে ধরা দেয়। বাংলাদেশ পুলিশের ভেরিফায়েড পেজে লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারের পুরস্কার ঘোষণা করে যে পোস্টটি দেওয়া হয়েছে, তার নিচের কমেন্টবক্সটি যেন আজ ‘গণআদালত’-এ পরিণত হয়েছে। আমি খুব মনোযোগ দিয়ে সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়াগুলো পড়লাম। সেখানে ভয় নেই, আছে তীব্র উপহাস আর ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ। এই কমেন্টগুলো কেবল সোশ্যাল মিডিয়ার স্ট্যাটাস নয়, এগুলো এই মুহূর্তে বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের মনের জবানবন্দি।
পুরস্কার নাকি চুরির নতুন ‘স্টার্টআপ’?
জনগণের সাধারণ বোধবুদ্ধি বা ‘কমন সেন্স’ প্রশাসনের চেয়ে অনেক বেশি তীক্ষ্ণ। কমেন্টবক্সে একজন লিখেছেন, “এলএমজি ফেরত দিলে ৫ লাখ, ব্ল্যাক মার্কেটে সেল করলে ১০ লাখ+”। আরেকজন লিখেছেন, “বাজেটে আরো বাড়ান, তখন মানুষ কিইন্যা আইনা ফেরত দিবো”। জনগণ ঠিকই ধরে ফেলেছে—এই পুরস্কার ঘোষণা মূলত অস্ত্র ব্যবসাকে উস্কে দেওয়ার একটি রাষ্ট্রীয় বোকামি। যেই চোর অস্ত্র লুট করেছে, তাকেই আপনারা ৫ লাখ টাকার অফার দিচ্ছেন? এতে তো পেশাদার অপরাধীরা উৎসাহিত হবে! একজন মন্তব্য করেছেন, “চোরকে তো আর শাস্তি নেই… ভায়ের ভাই কি একটা অবস্থা”। অর্থাৎ, রাষ্ট্র নিজেই চোরকে পুরস্কৃত করে অপরাধকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছে।
এলএমজি কার বুকে চালানোর জন্য?
আমার আগের কলামে আমি যে প্রশ্ন তুলেছিলাম, আজ বাংলার আমজনতাও ঠিক একই প্রশ্ন করছে। কমেন্টবক্সে একজন বিস্ময় প্রকাশ করে লিখেছেন, “পুলিশ এলএমজি ব্যবহার করতো? কার বিরুদ্ধে?”। আরেকজন লিখেছেন, “৫ই আগস্ট ৩৫০০+ এসএমজি এলএমজি গায়েব… পুলিশ কি তবে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিল?”। জনগণ বোকা নয়। তারা বোঝে, এলএমজি বা এসএমজি চোর-ডাকাত ধরার অস্ত্র নয়, এটি যুদ্ধের অস্ত্র। নিজ দেশের করদাতা নাগরিকদের বুক ঝাঁঝরা করতেই যে এই মারণাস্ত্রগুলো মজুদ করা হয়েছিল, তা আজ মানুষের কাছে স্পষ্ট।
রক্ষক যখন ভক্ষক: আস্থার সংকট
সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থার মৃত্যু। অস্ত্র ফেরত দেওয়ার আহ্বান জানালেও মানুষ ভয়ে আছে। কমেন্টবক্সে ভুরি ভুরি মন্তব্য— “যে ফেরত দিতে যাবে, দেখা যাবে পুলিশ তাকেই ফাঁসিয়ে দিয়ে উল্টো মুনাফা দাবি করে বসে আছে”। অন্য একজন লিখেছেন, “থানায় নিয়ে গেলে উল্টো মামলা দিয়ে দিবে”। রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি ঘৃণা কোন পর্যায়ে পৌঁছালে মানুষ ভাবতে পারে যে, ভালো কাজ করতে গেলেও তাকে ফাঁসানো হবে? একজন তো সরাসরি লিখেছেন, “পুলিশের কাছে অস্ত্র থাকার চেয়ে না থাকা ভালো, অন্তত জনগণ নিরাপদে থাকবে”। এই একটি বাক্যেই প্রমাণ হয়, পুলিশি ব্যবস্থা নৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে গেছে।
জনগণের টাকায় ব্যর্থতার দায়
পুরস্কারের এই ৫ লাখ টাকা কার? আমার, আপনার—জনগণের ট্যাক্সের টাকা। কমেন্টবক্সে একজন যথার্থই বলেছেন, “টাকা না দিয়ে একটা করে চাকরির ব্যবস্থা করে দিন”। আরেকজন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, “নিজেদের ব্যর্থতার দায় জনগণের কাঁধে চাপিয়ে জনগণের ট্যাক্সের টাকা পুরস্কার দিচ্ছেন?”। নিজেদের অস্ত্র নিজেরা সামলাতে পারেননি, এখন সেই অস্ত্র খোঁজার জন্য জনগণের পকেট কাটছেন? এই নির্লজ্জতা ঢাকার জায়গা কোথায়? একজন মন্তব্যকারী তো বলেই দিয়েছেন, “এই টাকা দিয়ে পুলিশ পালতেছে কিসের জন্য?”।
শেষ কথা
ফেসবুকের এই হাজার হাজার কমেন্ট কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি একটি সতর্কবার্তা। জনগণ আপনাদের এই ‘অস্ত্র উদ্ধার নাটক’ ধরে ফেলেছে। তারা বুঝতে পেরেছে, এই ৫ লাখ টাকার অফার আসলে নিজেদের দুর্নীতি আর ব্যর্থতা ঢাকার একটি চটকদার বিজ্ঞাপন মাত্র। একজন সাংবাদিক হিসেবে আমি সেই সব মন্তব্যকারীর সাথে একমত পোষণ করে বলতে চাই—আগে জবাব দিন, সিভিলিয়ান এরিয়ায় এলএমজি কেন ছিল? আগে জবাব দিন, জনগণের ট্যাক্সের টাকার এই শ্রাদ্ধ কেন? মনে রাখবেন, কমেন্টবক্সের এই উপহাসগুলোই আগামীর প্রতিবাদের বারুদ।
