‘রোগীর গোপনীয়তা রক্ষা’র ঢালে অঙ্গচুরি, চিকিৎসা কি সেবা নাকি বাণিজ্য?

ময়মনসিংহ

শেখ মেহেদী হাসান নাদিম

​চিকিৎসাবিজ্ঞানের জনক হিপোক্রেটিস (Hippocrates) তাঁর বিখ্যাত নীতিশাস্ত্রে চিকিৎসকদের জন্য এক চিরন্তন আদেশ দিয়ে গিয়েছিলেন— “প্রথমত, রোগীর কোনো ক্ষতি করা যাবে না এবং দ্বিতীয়ত রোগীর গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে”! কিন্তু ময়মনসিংহ কমিউনিটি বেজড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (সিবিএমসিএইচ) বিজ্ঞ সিন্ডিকেট যেন আধুনিক প্রযুক্তিতে হিপোক্রেটিসের সেই শপথপত্র ডিজিটাল এডিট করে নিয়েছে! মূল সনদের “রোগীর ক্ষতি করা যাবে না” বাক্যটি তারা সযত্নে ‘ডিলিট’ করে দিয়েছে! আর কেবল পরের অংশটুকু—“রোগীর গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে”—কপি পেস্ট করে নিজেদের জালিয়াতি ও চিকিৎসাগত অপরাধ ঢাকার ঘোমটা বানিয়ে নিয়েছে!

৩ লাখের ভুয়া প্যাকেজ ও ঢাকার স্কয়ারে ৭ লাখের পুঁজ-সেচন

​পেটের সামান্য ব্যথায় আসা ৬০ বছর বয়সী এক অসহায় বৃদ্ধ রোগীকে নিয়ে সিবিএমসিএইচ-এর চিকিৎসকরা যা করলেন, তা চিকিৎসাবিজ্ঞানের কোনো ভুল নয়, বরং প্রাইভেসির মোড়কে ঢাকা এক অলৌকিক অঙ্গচুরি ও পকেটকাটার মহাকাব্য:

  • প্রথম কিস্তি (সিবিএমসিএইচ): আন্তর্জাতিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড গাইডলাইন (যেমন- NICE guidelines বা সংশ্লিষ্ট স্বীকৃত প্রটোকল) অনুসরণ না করে, ‘মির্জা প্যাথলজি’র মিথ্যা ‘ক্যান্সার’ রিপোর্টের ওপর ভর করে সুস্থ সোয়া এক ফুট (৩৮ সেন্টিমিটার) কোলন কেটে ছাঁটাই করা হলো। আর অপারেশনের বিনিময়ে পকেট থেকে খসানো হলো প্রায় ৩ লাখ টাকা!
  • দ্বিতীয় কিস্তি (স্কয়ার হাসপাতাল): অপারেশনের মারাত্মক অবহেলায় বৃদ্ধের পেটের ভেতর দেড় লিটার জমাটবদ্ধ পুঁজ ও সংক্রামিত রক্ত উপহার দিয়ে ‘রোগীর উন্নতি হয়েছে’ বলে জ্যান্ত সেপটিক অবস্থায় তাকে হাসপাতাল থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হলো! সেই পুঁজ ড্রেন করে বের করে জীবন বাঁচাতে ঢাকায় দৌড়ে গিয়ে স্কয়ার হাসপাতালে ঢালতে হলো আরও ৭ লাখ টাকা।
  • মোট খেসারত: মামুলি এক পেট ব্যথার পেছনে মোট খেসারত—১০ লাখ টাকা!

আঁধার ভেদ করে সত্যের আলো: প্যাথলজি বিভাগের প্রধানের সততা

​পুরো প্রতিষ্ঠান যখন মিথ্যা রিপোর্ট ও অঙ্গচুরির সিন্ডিকেটে কলঙ্কিত, তখন চিকিৎসাবিজ্ঞানের পেশাগত নীতি ও সততার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন সিবিএমসিএইচ-এর বর্তমান প্যাথলজি বিভাগের প্রধান।

​অস্ত্রোপচার শেষে কেটে ফেলা অঙ্গটি যখন ল্যাবে পাঠানো হয়, তখন প্যাথলজি বিভাগের প্রধানের নেতৃত্বে সিবিএমসিএইচ প্যাথলজির একটি টিম অত্যন্ত পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা পরিচালনা করে। সিন্ডিকেটের কোনো প্রভাবে কান না দিয়ে তিনি নির্ভীকভাবে সত্য রিপোর্ট প্রকাশ করে দেন: “No granuloma, No tumor, No malignancy!”

​অর্থাৎ, মির্জা প্যাথলজির মিথ্যা রিপোর্টকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্যাথলজি বিভাগের প্রধানের দেওয়া সত্য রিপোর্ট অকাট্যভাবে প্রমাণ করে দেয়—কেটে ফেলা সুস্থ নাড়িতে কোনো ক্যান্সার বা টিউমার ছিলই না; ছিল নিতান্তই অ্যাপেন্ডিসাইটিস ও সাধারণ প্রদাহ!

​সুস্থ অঙ্গ কেটে, পেটে দেড় লিটার পুঁজ বানিয়ে, ১০ লাখ টাকা খসিয়ে দেওয়ার পর এখন অনুসন্ধানী প্রতিবেদকের ফোনালাপে বিজ্ঞ পরিচালকমণ্ডলী ঘোমটা টেনে বলছেন—“রোগীর প্রাইভেসি রক্ষা করা আমাদের ঈমানী দায়িত্ব!”

​ভুল রিপোর্টে অঙ্গ কেটে নেওয়া বা পেটে দেড় লিটার পুঁজ তৈরি করা কোনো প্রাইভেসির বিষয় নয়, এটা দণ্ডবিধির ৩২০, ৩২৬ ও ৪২০ ধারায় চিকিৎসকের গুরুতর ও জামিনঅযোগ্য অপরাধচিত্র।

​ঢাকায় পিগটেইল ড্রেন বসিয়ে দেড় লিটার পুঁজ বের করার পর স্কয়ার হাসপাতাল স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে—রোগীর কোনো কেমোথেরাপির প্রয়োজন নেই। হিপোক্রেটিসের ওথ এডিট করে আর অডিওতে প্রাইভেসির নাটক দেখিয়ে পার পাওয়ার দিন শেষ। প্যাথলজি বিভাগের প্রধানের সাহসিকতায় বেরিয়ে আসা সত্য প্যাথলজি রিপোর্ট, স্কয়ারের ডিসচার্জ ফাইল এবং অডিওর অকাট্য নথিপত্র এখন সিভিল সার্জন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও আন্তর্জাতিক সংস্থার টেবিলে। আইনি ব্যবচ্ছেদ কীভাবে সম্পন্ন হয়, তা দেখতে চোখ রাখুন ‘দৈনিক জাহান’-এর পাতায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *