মাদকের নীল দংশনে বিপন্ন যুব সমাজ, ধ্বংসের কিনারে আগামীর বাংলাদেশ
আকরাম হোসেন,বাগেরহাট জেলা প্রতিনিধি

দেশের ভবিষ্যৎ গড়ার কারিগর যে তরুণ সমাজ, আজ তাদের বড় একটি অংশ মাদকের মরণনেশায় নিমজ্জিত। শহর থেকে গ্রাম, অলিগলি থেকে উচ্চবিত্তের ড্রয়িংরুম—সর্বত্রই পৌঁছে গেছে মাদকের বিষাক্ত থাবা। ইয়াবা, আইস (ক্রিস্টাল মেথ) আর নতুন নতুন সিন্থেটিক ড্রাগের দাপটে খেই হারিয়ে ফেলছে যুবসমাজ। এই সামাজিক ব্যাধি কেবল একটি জীবন ধ্বংস করছে না, বরং একটি পরিবার, সমাজ তথা গোটা রাষ্ট্রকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
ভয়ংকর মাদকের বিস্তার ও পরিসংখ্যান
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা প্রায় ৮০ লাখ ছাড়িয়েছে, যার ৮০ শতাংশই তরুণ। আগে মাদক বলতে কেবল ফেনসিডিল বা গাঁজাকে বোঝানো হলেও এখন মরণঘাতী ‘আইস’ ও ‘এলএসডি’র মতো দামী ও ভয়ংকর মাদক ছড়িয়ে পড়ছে। সীমান্ত রুট দিয়ে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার মাদক দেশে ঢুকছে। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া—মাদকের এই সিন্ডিকেট এতটাই শক্তিশালী যে, প্রশাসনের নানামুখী অভিযানের পরও এর বিস্তার রোধ করা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অপরাধ প্রবণতা ও কিশোর গ্যাং কালচার
সমাজ বিজ্ঞানীদের মতে, বেকারত্ব, হতাশা, পারিবারিক কলহ এবং আকাশ সংস্কৃতির নেতিবাচক প্রভাব তরুণদের মাদকের দিকে ধাবিত করছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, নিছক কৌতূহল বা বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে শুরু হলেও দ্রুতই তা নেশায় রূপ নিচ্ছে। মাদকের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে মেধাবী ছাত্ররা জড়িয়ে পড়ছে ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও খুনের মতো জঘন্য অপরাধে। কিশোর গ্যাং কালচারের উত্থানের পেছনেও প্রধান জ্বালানি হিসেবে কাজ করছে এই মাদক।
পারিবারিক ও সামাজিক ভাঙন
মাদক কেবল শরীরকে পঙ্গু করে না, এটি মানুষের বিবেককেও ধ্বংস করে দেয়। গত কয়েক বছরে মাদকের টাকার জন্য সন্তান কর্তৃক মা-বাবাকে হত্যা কিংবা মা-বাবার হাতে সন্তান নিধনের মতো শিউরে ওঠার মতো ঘটনা জাতীয় পত্রিকার শিরোনাম হয়েছে। নেশার টাকা না পেয়ে ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও লাঞ্ছনা এখন অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারের নিত্যদিনের গোপন কান্না।
সরকারের জিরো টলারেন্স ও বর্তমান পরিস্থিতি
বর্তমান সরকার ও প্রশাসন মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করেছে। র্যাব, পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নিয়মিত অভিযানে বড় বড় চালান ধরা পড়লেও নেপথ্যের ‘গডফাদাররা’ প্রায়ই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। মাদক নিরাময় কেন্দ্রগুলোর অবস্থাও আশাব্যঞ্জক নয়; অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসার নামে সেখানে চলে অপচিকিৎসা।
মাদক নির্মূলে বিশেষজ্ঞ পরামর্শ
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল পুলিশি অভিযান দিয়ে মাদক নির্মূল সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন পারিবারিক সচেতনতা, ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা এবং তরুণদের খেলাধুলা ও সৃজনশীল কাজে ব্যস্ত রাখার সুযোগ সৃষ্টি। এছাড়া মাদক প্রবেশের প্রধান রুটগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারি ও বিজিবি-র টহল আরও জোরদার করা জরুরি।
মাদকের এই ভয়াল গ্রাস থেকে যুবসমাজকে রক্ষা করতে না পারলে টেকসই উন্নয়ন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে। এখনই সময় সমন্বিত সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার। মাদকের অন্ধকার গলি থেকে আমাদের সন্তানদের ফিরিয়ে এনে আলোর পথে ধাবিত করা আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
