মাঝরাতে চাঁদ যদি আলো না বিলায়’ অবসকিউরের সেই গানের পেছনের গল্প

প্রথম অ্যালবামেই অবসকিউর বাজিমাত করেছিলে। কোলাজ

বিনোদন প্রতিবেদক

ঢাকা

আপডেট: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১২: ৫৩ 

মাঝরাতে চাঁদ যদি আলো না বিলায়’, ‘নিঝুম রাতের আঁধারে’, ‘ছাইড়া গেলাম মাটির পৃথিবী’, ‘কলিকালের ভণ্ড বাবা’ কিংবা ‘বিধি তোমার কেমন খেলা’ গানগুলো শোনেননি বা গুনগুন করে গাননি, এমন ব্যান্ড সংগীতানুরাগী কম আছেন। বিশেষ করে আশির দশকের শেষ দিকে কিংবা নব্বইয়ের শুরুতে গান শুনতে শুনতে বড় হয়েছেন এমন শ্রোতারা। এখন যাঁরা ব্যান্ড সংগীত ভালোবাসেন, বয়স যাঁদের চল্লিশের কোঠা পেরিয়েছে, এমন শ্রোতার কাছে অবসকিউরের আলাদা কদর আছে। অবসকিউর এমন গানের দল, যাদের শুরুটা ছিল ‘এলাম, দেখলাম ও জয় করলাম’-এর মতো। প্রথম অ্যালবামেই যাঁরা বাজিমাত করেছিলেন। যে অ্যালবামের গানগুলো আজও ইউটিউবে খুঁজছেন শ্রোতারা।

আজও লাইভ অনুষ্ঠানে অনুরোধ আসে, ‘মাঝরাতে চাঁদ’ গানটা শুনতে চাই…। গতকাল রাতেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই গানের পঙ্‌ক্তি দিয়ে ছবি শেয়ার করতে দেখা গেছে। অনেকে গানটির লিংক শেয়ার করেছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। আজ রইল সেই গান ও অবসকিউরের আলোচিত সেই অ্যালবামের গল্প।
আশির দশকের মাঝামাঝি। সে সময় খুলনার তরুণ শিল্পী সাইদ হাসান টিপু এই ব্যান্ড গড়ার উদ্যোগ নেন। ১৯৮৫ সালের ১৫ মার্চ খুলনায় অবসকিউর প্রতিষ্ঠা করেন টিপু। সে সময় সারগাম স্টুডিওতে শুরু হয় দলটির প্রথম অ্যালবামের কাজ। ১৯৮৬ সালে সেলফ টাইটেল ‘অবসকিউর ভলিউম ১’ শিরোনামে বের হয় ব্যান্ডের অ্যালবাম। অবসকিউরের অন্যতম উদ্যোক্তা শিল্পী টিপু এক সাক্ষাৎকারে অবসকিউরের প্রথম অ্যালবামের গল্প শুনিয়েছিলেন।

সে সময় ব্যান্ডের লাইনআপ ছিলেন ভোকাল টিপু, বেজ গিটার মাসুদ, লিড গিটার জন, রিদম গিটার তুষার, ড্রামস আজম বাবু ও কি-বোর্ড সোহেল। এই শিল্পীরা মিলে শুরু করেছিলেন প্রথম অ্যালবামের কাজ। মোট ১২টি গানের আলোচিত ‘মাঝরাতে চাঁদ যদি’ লিখেছিলেন টিপুর বড় বোনের বান্ধবীর ভাই এহসান। অন্য গানগুলো লিখেছিলেন সোহেল আলম চৌধুরী ও টিপু।

‘মাঝরাতে চাঁদ যদি’ গানটি হঠাৎ হাতে আসে টিপুর। টিপুর ভাষ্যে, ‘আমরা তখন গান তৈরি করছি। নতুন নতুন গান। যে যা পারে লিখে দিচ্ছে। আমরা সেখান থেকে বাছাই করছি। এহসান কোনোদিন গান লেখালেখির মধ্যে ছিল না। লিখত বলেও মনে হয় না। একদিন বিকেল বেলায় আমরা বাসায় যে রুমে প্র্যাকটিস করতাম, এহসান একটা কাগজ পকেটের মধ্যে গুঁজে দিল। দিয়ে বলে, “ভাইয়া পড়ে দেইখেন।” সে সময় আর মনে নেই। পরে রাতে বাসায় কাপড় চেঞ্জ করতে গিয়ে মনে হলো দেখি কাগজে কী লেখা। খুলে দেখি লেখা “মাঝরাতে চাঁদ যদি আলো না বিলায়/ ভেবে নেব আজ তুমি চাঁদ দেখোনি…।” এ দুটি লাইন পড়ে মনে হলো দেখা যাক। বসে গেলাম। এক বসায় সুরও করে ফেললাম। কোনো কিছু চেঞ্জ করিনি। যা ছিল তা–ই। পরের দিনই আমি মোটামুটি ফাইনাল করে ফেলি।’

স্মৃতিচারণা করে টিপু বলেন, বাবার কাছ থেকে ১২ হাজার টাকা নিয়ে ব্যান্ডের অ্যালবাম করার জন্য ঢাকা এসেছিলেন তাঁরা। অবশ্য আসার সময়েও কম ঝামেলা হয়নি। টিপু বলেন, ‘কি-বোর্ডিস্ট সোহেলের বাবার দুই চোখের বিষ হয়ে গেলাম আমি। তাঁর ছেলে এসব ছন্নছাড়া টাইপের গানবাজনা করবে, এটা তিনি মেনে নিতে পারেননি। সেসবের জন্য আবার ঢাকায় যেতে হবে! শেষে ব্যাপারটা এমন পর্যায়ে চলে গেল যে তিনি হুমকি দিয়ে বসলেন, ছেলে যদি ঢাকায় যায়, তাহলে তাঁর মাকে তিনি ডিভোর্স দেবেন। বিরাট ঝামেলা লেগে গেল তাঁর বাসায়।’

নব্বই দশকে মঞ্চে পরিবেশন করছে অবসকিউর
ফাইল ছবি

মা বোঝেন, বাবা বোঝেন না। আমরা কয়েকজন মিলে বহু কষ্টে তাঁকে রাজি করালাম। সোহেলের পুরো দায়িত্ব নিলাম। ঢাকায় এসে বাদল ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় হলো। সত্যি কথা বলতে, কিছু মানুষ আশীর্বাদ হয়ে আমাদের জীবনে এলেন।
ফুয়াদ নাসের বাবু ভাই, মাকসুদ ভাই, লাবু ভাই, পিয়ারু ভাই, শেখ ইশতিয়াক ভাই, মাকসুদ জামিল মিন্টু ভাইসহ অনেকের নাম বলতে হয়। টিপু বলেন, ‘আমাদের কি-বোর্ডিস্ট সারা জীবনে হারমোনিয়াম ছাড়া কিছু চোখে দেখেনি। তাকে দেওয়া হলো মানাম আহমেদের বাবার কাছ থেকে ভাড়া করা ইয়ামাহা ডিএক্স ৭ কি-বোর্ড। সেটির কিছুই সে জানে না। এগিয়ে এলেন বাবু ভাই ও মিন্টু ভাই। কোন গানে কী টোন দিয়ে বাজালে ভালো লাগবে, সে বিষয়ে পরামর্শ দিলেন।’
টিপুর ভাষায়, সংগীতচর্চার জন্য ওই সময়টা ছিল দারুণ অনুকূল। সে সময়টায় গানের মানুষেরা যেভাবে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতেন, তা অবিশ্বাস্য। পুরো ফিডব্যাকের সঙ্গে আমাদের আজব এক বন্ধন তৈরি হয়ে গিয়েছিল সে সময়। ঠিক হলো রাত ১১টার পর তিন দিন ধরে অবসকিউরের গানের কাজ হবে। কেননা, দিনের বেলায় অন্যদের কাজ হয়। যাঁরা ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠিত, তাঁদের কাজই প্রাধান্য পাবে। ঠিক হলো প্রথম দুই দিন ট্র্যাকিং হবে আর শেষ রাতে ভোকাল।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *