মহান পেশা সাংবাদিকতা: দালালি আর ধান্দায় কলুষিত হওয়ার বাস্তবতা

মোহাম্মদ উল্যা, নোয়াখালী জেলা প্রতিনিধি

সাংবাদিকতা কেবল একটি পেশা নয়; এটি সমাজের বিবেক, রাষ্ট্রের আয়না এবং জনগণের কণ্ঠস্বর। ইতিহাসে আমরা দেখি, স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে গণতান্ত্রিক আন্দোলন—সবক্ষেত্রেই সাংবাদিকদের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। যেমন উপমহাদেশে আনন্দবাজার পত্রিকা দীর্ঘদিন ধরে জনমত গঠন ও সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আবার আন্তর্জাতিক পরিসরে BBC নিরপেক্ষ ও তথ্যনির্ভর সংবাদ পরিবেশনের একটি মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত।

আদর্শচ্যুতি ও আস্থার সংকট

একই সঙ্গে অস্বীকার করার উপায় নেই—যখন সাংবাদিকতা সত্য ও জনস্বার্থ থেকে বিচ্যুত হয়ে দালালি, ব্যক্তিস্বার্থ বা আর্থিক ধান্দার হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন এই মহান পেশার মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়। সংবাদ যদি তথ্যের বদলে প্রভাব বিস্তারের উপকরণে পরিণত হয়, তাহলে জনগণের আস্থা ভেঙে পড়ে। আর আস্থা হারালে গণমাধ্যম তার মূল শক্তিই হারায়।

পেশাগত অবক্ষয়ের কারণসমূহ

কেন এই অবক্ষয় ঘটে? তার কিছু মূল কারণ নিচে দেওয়া হলো: ১. অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা: অনেক গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত বেতন ও নিরাপত্তা না থাকায় কিছু ব্যক্তি অনৈতিক পথে ঝুঁকে পড়ে। ২. রাজনৈতিক প্রভাব: মালিকানা ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা সংবাদকে পক্ষপাতদুষ্ট করতে পারে। ৩. পেশাগত নীতির দুর্বল প্রয়োগ: নৈতিক নীতিমালা থাকলেও তা সবসময় কঠোরভাবে মানা হয় না। ৪. ব্যক্তিগত লোভ ও সুযোগসন্ধানিতা: পেশার মর্যাদার চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থ বড় হয়ে গেলে দুর্নীতি ঢুকে পড়ে।

অবক্ষয়ের নেতিবাচক ফলাফল

এই নেতিবাচক প্রবণতার ফলে সংবাদে পক্ষপাত ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। এতে সৎ ও নিষ্ঠাবান সাংবাদিকরা অবমূল্যায়িত হন এবং সমাজে বিভাজন ও অবিশ্বাস বাড়ে। দিনশেষে এর ফলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ে।

উত্তরণের পথ ও করণীয়

সাংবাদিকতা নিজে কখনো “কলুষিত” নয়; বরং কিছু ব্যক্তির অনৈতিক আচরণ পুরো পেশাটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায়গুলো হলো:

  • নৈতিকতার পুনর্জাগরণ: সাংবাদিকদের জন্য কঠোর নৈতিক প্রশিক্ষণ ও আত্মনিয়ন্ত্রণ জরুরি।
  • প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা: গণমাধ্যমের নিজস্ব ও স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা সক্রিয় হতে হবে।
  • স্বচ্ছ মালিকানা ও অর্থায়ন: অর্থের উৎস ও স্বার্থের সম্পর্ক প্রকাশ্য হওয়া উচিত।
  • পেশাগত নিরাপত্তা: ন্যায্য বেতন ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
  • জনসচেতনতা: পাঠক-দর্শককেও সচেতন হতে হবে—সত্য ও গুজবের পার্থক্য বুঝতে হবে।

পরিশেষে বলা যায়, সাংবাদিকতা তখনই মহান থাকে যখন তা সত্য, ন্যায় ও জনস্বার্থের পক্ষে অবিচল থাকে। দালালি ও ধান্দা সাময়িক লাভ দিতে পারে, কিন্তু ইতিহাসে টিকে থাকে কেবল নৈতিকতা ও সাহস। কালজয়ী সাংবাদিকতা তাই কখনো ব্যক্তিস্বার্থে নয়—বরং জাতির কল্যাণে নিবেদিত।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *