ভুয়া ক্যান্সারের রিপোর্টে রোগীর ৩৮ সেমি সুস্থ বৃহদান্ত্র চুরি! সিবিএমসিবি এখন মরণফাঁদ
শেখ মেহেদী হাসান নাদিম

২০২৫ সালের জুন মাস। তপ্ত দুপুরে ময়মনসিংহের কমিউনিটি বেজড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (CBMCH) ওপিডি-তে বসে ছিলেন ৬০ বছর বয়সী মো. রমজান মোল্লা।
এক মাস ধরে পেটের ডান পাশে হালকা ব্যথা আর সামান্য একটা ফোলা বা ‘লাম্প’—এই ছিল অভিযোগ। সাধারণ চোখে এটি হয়তো একটি মামুলি অ্যাপেন্ডিক্সের সমস্যা মনে হতে পারে, কিন্তু রমজান মোল্লা জানতেন না, তিনি পা রাখতে যাচ্ছেন এক সাজানো মৃত্যুফাঁদে।

বিজ্ঞানের বিচ্যুতি যেখানে শুরু
মেডিকেল সায়েন্সের আন্তর্জাতিক প্রোটোকল (NICE এবং ACR গাইডলাইন) চিৎকার করে বলে: ৫০ ঊর্ধ্ব কোনো রোগীর পেটে এমন ‘লাম্প’ দেখা দিলে Contrast-Enhanced CT (CECT) করা বাধ্যতামূলক। কারণ, ৯৭% নির্ভুল এই পরীক্ষাই বলে দিতে পারে এটি সাধারণ প্রদাহ নাকি মরণব্যাধি ক্যান্সার।

কিন্তু CBMCH-এর সার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. তৌফিকুল হক যেন বিজ্ঞানের চেয়ে অনুমানের ওপর বেশি ভরসা করলেন। তিনি গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড CT স্ক্যানকে পাশ কাটিয়ে বেছে নিলেন USG আর কলোনোস্কোপি। অথচ গবেষণায় প্রমাণিত, আল্ট্রাসনোগ্রাফির (USG) সেন্সিটিভিটি মাত্র ৫২-৮৬%, যা পেটের গ্যাস বা রোগীর শরীরের গঠনের কারণে ভুল ফলাফল দিতে পারে।

সেই ‘ভয়ংকর’ ৫ জুলাই
২৩ জুন কলোনোস্কোপি করলেন অধ্যাপক ডা. চিত্ত রঞ্জন দেবনাথ। তিনি দেখলেন ‘Proliferative Growth’। সন্দেহ করলেন ক্যান্সার (Caecal Neoplasm) অথবা টিবি। নিয়ম অনুযায়ী তখন একটি CT স্ক্যান করে নিশ্চিত হওয়ার কথা থাকলেও, তাকে সরাসরি বায়োপসির জন্য পাঠানো হলো ‘মির্জা প্যাথলজি’-তে।

৫ জুলাই। রমজান মোল্লার পরিবারের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। রিপোর্টের পাতায় বড় বড় অক্ষরে লেখা:“Well-differentiated adenocarcinoma”—অর্থাৎ শরীরে বাসা বেঁধেছে ঘাতক ক্যান্সার!
৩৮ সেন্টিমিটারের চুরি
২৩ জুলাই অপারেশন থিয়েটারে ছুরি চলল। অধ্যাপক তৌফিকুল হক ‘Limited Right Hemicolectomy’ করলেন। শরীর থেকে কেটে নেওয়া হলো ৩৮ সেন্টিমিটার সুস্থ অন্ত্র—সিকাম, অ্যাসেন্ডিং কোলন এবং টার্মিনাল ইলিয়াম। স্বজনরা ভাবলেন, ক্যান্সার দমাতেই এই বিসর্জন।

★ No Cancer ★ No TB ★No Tumour!
কিন্তু ট্র্যাজেডি তখনো বাকি ছিল।
১০ আগস্ট চূড়ান্ত হিস্টোপ্যাথলজি রিপোর্ট এল: “No malignancy is seen”। কোনো ক্যান্সার নেই! রিপোর্টে ধরা পড়ল সাধারণ ‘ক্রনিক অ্যাপেন্ডিসাইটিস’ আর প্রদাহ।
প্রশ্ন যখন বিবেকের কাছে
একটি ভুল রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে একজন মানুষের সুস্থ অন্ত্রের ৩৮ সেন্টিমিটার চুরি করা কি শুধুই ভুল, নাকি অপরাধ? কেন আন্তর্জাতিক গাইডলাইন অমান্য করে CT স্ক্যান ছাড়াই অপারেশন করা হলো? মির্জা প্যাথলজির রিপোর্টে যে ক্যান্সারের কোষ দেখা গিয়েছিল, অপারেশন করা অন্ত্রে তা উধাও হয়ে গেল কীভাবে?

রমজান মোল্লার অপরাধ কি?
তিনি বাচার আশায় CBMCB এর মরণ ফাঁদে পা রেখেছিলেন?
অযোগ্য ডাক্তার আর মেয়াদোত্তীর্ণ পরীক্ষকদের চক্রান্তের স্বীকার হলেন তিনি!? এদের দেখার জন্য বা আইনের আওতায় নেয়ার জন্য যারা মাসে মাসে মোটা অংকের বেতন নিচ্ছেন, তাদের কাজ কি?
পরবর্তী পর্বে দেখুন:
মির্জা প্যাথলজির সেই রহস্যময় রিপোর্টের ব্যবচ্ছেদ, স্কয়ার হাসপাতালের স্পষ্ট কথা যে “কোনো ক্যান্সার ছিল না”, আর রমজান মোল্লার বর্তমান করুণ জীবন—যেখানে প্রতিদিনের ডায়রিয়া আর অসাড়তা তাকে খেয়ে ফেলছে।

পরবর্তী পর্বের জন্য ভয়ে আর আতংকে আছি।