কিশোরগঞ্জের হাওরে দেশি মাছ বিলুপ্তির পথে, সংকটে হাজারো জেলের জীবিকা

ফাইল ছবি।

কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি:

দেশের অন্যতম প্রাকৃতিক মৎস্য ভান্ডার হিসেবে পরিচিত কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চল থেকে দ্রুত গতিতে হারিয়ে যাচ্ছে সুস্বাদু দেশি মাছ। একসময় যেখানে শত শত নৌকা মাছ নিয়ে ভিড়তো, সেই করিমগঞ্জ উপজেলার বালিখলা মাছ বাজারে এখন নেমে এসেছে চরম জৌলুসহীনতা। মাছের প্রজাতি কমে যাওয়ায় হাজারো জেলের জীবিকা এখন হুমকির মুখে।
ভোরের বাজারে শূন্যতা ও জেলের দুর্ভোগ
বুধবার (৮ অক্টোবর) সকালে বালিখলা বাজার ঘুরে দেখা যায়, আগের মতো মাছের স্তূপের পরিবর্তে হাতেগোনা কিছু মাছ ঘিরেই সীমিত কেনাবেচা চলছে।

জেলেদের হতাশা: ইটনা থেকে আসা জেলে মনির উদ্দিন বলেন, “রাতভর জাল ফেলে যা পাই, তা দিয়ে খরচই ওঠে না। পাবদা, চাপিলা—আগে যেসব মাছ হরহামেশা পাওয়া যেত, এখন সেগুলো চোখেই পড়ে না।”

পেশা বদল: আরেক জেলে মতিউর মিয়া জানান, একসময় নৌকা বোঝাই করে মাছ আনলেও এখন নৌকার তলায় সামান্য মাছ পড়ে থাকে। সংসার চালাতে না পেরে অনেকেই বাধ্য হয়ে শহরে পাড়ি জমাচ্ছেন বা দিনমজুরি করছেন।


আড়তের আয় কমেছে, কমেছে কেনাবেচা
হাওরে পানি কমে যাওয়া এবং নিষিদ্ধ জালের মারাত্মক ব্যবহারের কারণে মাছের উৎপাদন কমেছে।

আড়তদারের মন্তব্য: বালিখলা বাজারের প্রবীণ আড়তদার নিপেন্দ্র বর্মণ বলেন, বাজারে ৬৫টি আড়তের প্রতিটি আগে দিনে গড়ে ৬-৭ লাখ টাকার মাছ বিক্রি করত। এখন সেই বিক্রি অনেকটাই কমে গেছে।

রাজস্বে ধস: বাজারের সাধারণ সম্পাদক সালাহ উদ্দিন বলেন, দু-তিন বছর আগেও দিনে ৪ থেকে ৫ কোটি টাকার মাছ কেনাবেচা হলেও মাছ কমে যাওয়ায় এখন পাইকাররাও আগের মতো আসে না।


দেশি মাছ বিলুপ্তির প্রধান কারণ
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টরা দেশি মাছ কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ চিহ্নিত করেছেন:

জলাশয় ভরাট: নদী ও জলাশয়গুলোতে পলি জমে ভরাট হয়ে যাচ্ছে, যা মাছের চলাচল ও প্রজননে বাধা সৃষ্টি করছে।

নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার: নিষিদ্ধ জালের নৈরাজ্যের কারণে মা-মাছ ও পোনাসহ সব মাছ নির্বিচারে ধরা পড়ে, এতে মাছের প্রজনন চক্র ভেঙে পড়ছে।

দূষণ ও দখল: হাওরের চাষাবাদে ব্যাপক কীটনাশক ব্যবহারের ফলে পানি দূষিত হচ্ছে। পাশাপাশি অপরিকল্পিত বাঁধ, রাস্তা ও জলাশয় দখলের কারণে মাছের আবাসস্থলও হারিয়ে যাচ্ছে।


হারিয়ে যাচ্ছে বৈচিত্র্য ও জীবিকা
এক দশক আগেও হাওরে ১৪৩ প্রজাতির দেশি মাছ পাওয়া যেত। বর্তমানে টিকে আছে মাত্র ৭০ থেকে ৭৫ প্রজাতি। চাপিলা, শিং, গজার, খলসে, কালবাউশ, টাটকিনি, মহাশোলসহ অনেক মাছ আর তেমন চোখে পড়ে না।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম বলেন, প্রজাতি রক্ষায় তাঁরা অভিযান চালাচ্ছেন, তবে শুধু প্রশাসনের পক্ষে এটা সম্ভব নয়; স্থানীয়দেরও সচেতন হতে হবে। সচেতন মহলের মতে, মাছ শুধু খাবার নয়, এটি হাওরবাসীর অন্যতম জীবিকা ও অস্তিত্বের অংশ।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *