স্টাফ রিপোর্টার

আজ বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর ২০২৬) পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব দৃষ্টি দিবস’। প্রতিবছর অক্টোবর মাসের দ্বিতীয় বৃহস্পতিবার বিশ্বজুড়ে পালিত হয়ে আসা এই আন্তর্জাতিক দিবসটির মূল লক্ষ্য হলো—অন্ধত্ব ও দৃষ্টিশক্তি হ্রাসের পেছনের কারণগুলো চিহ্নিত করা, চোখের বিভিন্ন রোগ সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি এবং নিয়মিত চোখের যত্ন নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা।
এবারের বিশ্ব দৃষ্টি দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারিত হয়েছে— ‘আপনার চোখকে ভালোবাসুন’ (Love Your Eyes)। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান ও অন্ধত্ব প্রতিরোধ
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান বিশ্বে প্রায় ২২০ কোটি মানুষ কাছের অথবা দূরের দৃষ্টিজনিত সমস্যায় ভুগছেন। এর মধ্যে অন্তত ১০০ কোটি মানুষের দৃষ্টি প্রতিবন্ধকতা বা অন্ধত্ব আগে থেকেই প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল কিংবা সঠিক সময়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করলে তা নিরাময় করা যেত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সময়মতো রোগ নির্ণয় ও যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে পারলে অন্ধত্বের বড় একটি অংশ এড়ানো সম্ভব।
শিশু-কিশোরদের দৃষ্টিতে ডিজিটাল স্ক্রিনের ঝুঁকি
আধুনিক যুগে শিশু-কিশোরদের মধ্যে স্মার্টফোন, ট্যাব ও কম্পিউটারের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে চোখের স্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ছে। একটানা দীর্ঘ সময় ডিজিটাল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার কারণে চোখ শুষ্ক হয়ে যাওয়া, চোখে অতিরিক্ত চাপ পড়া, মাথাব্যথা এবং ঝাপসা দেখার মতো সমস্যা দেখা দিচ্ছে। এছাড়া বাইরে পর্যাপ্ত সময় না কাটানো এবং একটানা কাছের বস্তু দেখার অভ্যাসের ফলে শিশুদের মধ্যে মায়োপিয়ার (স্বল্পদৃষ্টি) ঝুঁকি উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের চোখের সমস্যা অনেক সময় সহজে বোঝা যায় না। তবে দূরের জিনিস দেখতে না পাওয়া, বই বা খাতা চোখের অতি নিকটে এনে পড়া, চোখ কুঁচকে তাকাতে বাধ্য হওয়া, ঘন ঘন চোখ ডলানো কিংবা পড়ার সময় প্রায়ই মাথাব্যথার কথা বললে অভিভাবকদের সতর্ক হতে হবে এবং দ্রুত চক্ষু বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হতে হবে।
দৃষ্টিশক্তি হ্রাসের প্রধান কারণ ও করণীয়
ডব্লিউএইচওর তথ্যানুযায়ী, চোখের পাওয়ারের ত্রুটি সংশোধন না করা বিশ্বব্যাপী দৃষ্টি প্রতিবন্ধকতার সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি। এছাড়া মায়োপিয়া, হাইপারোপিয়া, অ্যাস্টিগমাটিজম এবং বয়সজনিত প্রেসবায়োপিয়ার মতো সমস্যাগুলো যথোপযুক্ত চশমা বা চিকিৎসা পদ্ধতির মাধ্যমে অনায়াসেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
পাশাপাশি ছানি, গ্লুকোমা, ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি এবং বয়সজনিত ম্যাকুলার ডিজেনারেশনের মতো গুরুতর রোগগুলোও দৃষ্টিশক্তি হারানোর বড় ঝুঁকি তৈরি করে। বিশেষ করে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত রোগীদের নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করা বাধ্যতামূলক। কারণ গ্লুকোমার মতো কিছু নীরব ঘাতক রোগ প্রাথমিক অবস্থায় কোনো লক্ষণ প্রকাশ ছাড়াই ধীরে ধীরে চোখের অপূরণীয় ক্ষতি করে ফেলে।
চোখের সুরক্ষায় বিশেষজ্ঞ পরামর্শ
চোখকে সুস্থ ও কর্মক্ষম রাখতে চিকিৎসকরা কিছু সুনির্দিষ্ট পরামর্শ দিয়েছেন:
- স্ক্রিন টাইম কমানো: শিশুদের একটানা দীর্ঘ সময় স্ক্রিন ব্যবহার করা থেকে বিরত রাখতে হবে এবং কাজের মাঝে নিয়মিত বিরতি নেওয়ার অভ্যাস করাতে হবে।
- সুষম পরিবেশ ও পুষ্টি: পর্যাপ্ত আলোতে পড়াশোনা করা, পর্যাপ্ত ঘুমানো এবং ভিটামিনসমৃদ্ধ পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করা জরুরি।
- বাইরে সময় কাটানো: শিশুদের প্রতিদিন কিছু সময় রোদে বা দিনের আলোয় বাইরে খেলাধুলা ও শারীরিক কার্যক্রমে উৎসাহিত করতে হবে।
- প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা: কর্মক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ বা কলকারখানায় কাজ করার সময় অবশ্যই মানসম্মত সুরক্ষা চশমা ব্যবহার করতে হবে।
বিশ্ব দৃষ্টি দিবস উপলক্ষে চিকিৎসকরা জোর দিয়ে বলেছেন, চোখের সমস্যা হওয়ার পর কেবল চিকিৎসা নেওয়া নয়, বরং নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করানোর সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। প্রতিরোধযোগ্য অন্ধত্ব দূর করতে ব্যক্তি, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামগ্রিক স্বাস্থ্য খাতের সমন্বিত উদ্যোগই পারে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দৃষ্টিশক্তি সুরক্ষিত রাখতে।