হোসেনপুরে বজ্রপাতে নিহত সৌদি প্রবাসীর পরিবারের মানবেতর জীবনযাপন; মেলেনি সরকারি সহায়তা

প্রদীপ কুমার সরকার, হোসেনপুর (কিশোরগঞ্জ) সংবাদদাতা

কিশোরগঞ্জের হোসেনপুরে বজ্রপাতে নিহত এক সৌদি প্রবাসীর বিধবা স্ত্রী ও চার সন্তানের দিন কাটছে চরম অনাহার আর অর্থকষ্টে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে পুরো পরিবারটি। নিহতের পর কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেওয়া আশ্বাসের সিংহভাগই এখনো আলোর মুখ দেখেনি বলে অভিযোগ উঠেছে।

​নিহত প্রবাসী রাসেল মিয়া হোসেনপুর পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম ধুলজুরী গ্রামের লিয়াকত আলীর পুত্র।

পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে অন্ধকার

​পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, পরিবারের চরম অভাব-অনটন দূর করার আশায় চড়া সুদে ঋণ ও ধারদেনা করে বিদেশের মাটিতে পাড়ি জমিয়েছিলেন রাসেল মিয়া। কিন্তু সেই স্বপ্ন মাঝপথেই বিষাদে পরিণত হয়। গত ১০ মার্চ ২০২৬ তারিখে সৌদি আরবে কর্মস্থলে মাঠে কাজ করার সময় আকস্মিক বজ্রপাতে ঘটনাস্থলেই রাসেল মিয়ার মৃত্যু হয়।

​একসময় যে মানুষটি প্রবাসে দিনরাত কঠোর পরিশ্রম করে দেশে টাকা পাঠিয়ে পরিবারের মুখে অন্ন তুলে দিতেন, তাঁর আকস্মিক প্রয়াণে পুরো পরিবারে অন্ধকার নেমে এসেছে। ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে চার সন্তানকে নিয়ে একটি ভাঙাচোরা ঘরে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন রাসেলের বিধবা স্ত্রী শাহানাজ। শুধু তাই নয়, স্বামীর মৃত্যুর শোক সামলাতে না সামলাতেই মাত্র ১৬ দিনের মাথায় শাহানাজ তাঁর মাকেও হারান। জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে এসে সব আশ্রয় হারিয়ে তিনি এখন পুরোপুরি দিশেহারা।

আশ্বাসেই সীমাবদ্ধ সরকারি অনুদান

​রাসেলের বৃদ্ধ মা মোমেনা আক্তার ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বর্তমানে তিন বেলা খাবারের পরিবর্তে অনেক দিন একবেলা খেয়েই দিন পার করতে হচ্ছে এই পরিবারটিকে। নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ তো দূরের কথা, ঠিকমতো দুমুঠো চাল জোগাড় করাই এখন কষ্টের। অর্থের অভাবে সন্তানদের লেখাপড়াও বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

​নিহতের পরিবারের অভিযোগ, রাসেলের মৃত্যুর তিন-চারদিন পর পবিত্র ঈদ উপলক্ষে উপজেলা প্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্মকর্তা তাঁদের বাড়িতে এসে কিছু খাদ্যসামগ্রী, জামাকাপড় ও নগদ অর্থ সহায়তা দেন। সে সময় তিনি পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় স্থায়ী পুনর্বাসন ও বিভিন্ন সরকারি অনুদান দেওয়ার জোরালো আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও এখনো পর্যন্ত কোনো উল্লেখযোগ্য সরকারি সহায়তা বা স্থায়ী ভাতা মেলেনি পরিবারটির কপালে।

পাশে দাঁড়ানোর আকুল আবেদন

​কান্নাজড়িত কণ্ঠে রাসেলের স্ত্রী শাহানাজ বলেন—

​”আমার স্বামী চলে যাওয়ার পর মা-ও মারা গেলেন। আমার পাশে দাঁড়ানোর মতো মা-বাবা কিংবা ভাই-বোন কেউ নেই। এই চারটা অবুঝ সন্তান নিয়ে আমি কোথায় যাব, কীভাবে বাঁচব বুঝতে পারছি না। অনেক সময় সন্তানদের মুখে ঠিকমতো খাবারও তুলে দিতে পারি না। আমরা এখনো সরকারি সহযোগিতার আশায় পথ চেয়ে আছি।”

​প্রতিবেশী আবু রায়হান জানান, রাসেল মিয়ার পরিবারটি এখন চরম মানবিক সংকটের মুখোমুখি। তিনি সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন, সমাজসেবা অধিদপ্তর এবং দেশের বিত্তবান ব্যক্তি ও মানবিক সংগঠনগুলোর প্রতি দ্রুত এই অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।

​হোসেনপুর পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মিছবাহ উদ্দিন মানিক গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন—

​”রাসেল মিয়ার পরিবারটি আজ চরম অসহায় অবস্থায় রয়েছে। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে তারা পুরোপুরি পঙ্গু হয়ে পড়েছে। সরকারি স্থায়ী সহায়তার পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান মানুষ ও মানবিক সংগঠনগুলোরও উচিত এই পরিবারটির পাশে দাঁড়ানো। চারটি নিষ্পাপ শিশুর ভবিষ্যৎ রক্ষায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।”

​এলাকাবাসীর দাবি, একজন প্রবাসী দেশের রেমিট্যান্স তথা অর্থনীতিতে অবদান রেখে বিদেশের মাটিতে প্রাণ হারানোর পর তাঁর পরিবার এভাবে অবহেলায় পড়ে থাকতে পারে না। পরিবারটির জন্য সাময়িক সাহায্য নয়, বরং স্থায়ী পুনর্বাসন, বিধবা ভাতা এবং শিশুদের শিক্ষা সহায়তার ব্যবস্থা করতে সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *