স্থানীয় সরকার প্রকৌশল, না কেন্দ্রীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ?

মোশাররফ হোসেন মুসা

এদেশে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা কার্যকর না হওয়ার পেছনে আমলা শ্রেণি ও এনজিওগুলো বেশি দায়ী। এখানে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ উদাহরণ হতে পারে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল, তথা এলজিইডি’র নাম শুনে অনেকে মনে করেন এটি স্থানীয় সরকারের অধীনস্থ কোনো বিভাগের নাম। কিন্তু বাস্তবে এটি স্থানীয় সরকারের কোনো প্রতিষ্ঠান নয়; এটি কেন্দ্রীয় সরকারের স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ একটি বিভাগের নাম। এ কারণে, এর নাম স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ না হয়ে ‘কেন্দ্রীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ’ হওয়াই বাঞ্ছনীয়।

স্থানীয় সরকারের স্তর ও প্রকৌশল কাঠামো

এদেশে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশন, ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ নামে বহু স্তরবিশিষ্ট স্থানীয় ইউনিট রয়েছে। এগুলোর মধ্যে পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশন ও জেলা পরিষদে নিজস্ব প্রকৌশল ব্যবস্থা বিদ্যমান রয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও বিভাগের কোনো প্রকৌশল ব্যবস্থা নেই। ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ প্রকৌশলীরা কাজ করে থাকেন। অন্যান্য ইউনিটগুলোতে এলজিইডি কাজ করছে (উপজেলা পরিষদে ১৩টি বিভাগের কাজ হস্তান্তরের কথা বলা হয়, তার মানে ১৩টি বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা স্থানীয় সরকারের নিজস্ব কর্মকর্তা-কর্মচারী নয়)।

বর্তমানে প্রায় ১১ কোটি লোক ইউনিয়ন তথা গ্রামীণ এলাকায় বসবাস করছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ প্রধানত গ্রামীণ রাস্তাঘাট উন্নয়নে নিয়োজিত রয়েছে। তবে এ বিভাগ নগরীয় এলাকায় রাস্তাঘাট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের কাজও করছে। এদেশের বহু রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী ও আমলার মতে, এদেশে যদি তৃণমূল উন্নয়নে কোনো বিভাগ কাজ করে তার নাম ‘এলজিইডি’। আবার তারা একই মুখে তৃণমূল জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণের কথাও বলেন।

‘বটম-আপ’ বনাম ‘টপ-ডাউন’ পদ্ধতি

কিন্তু ‘গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার’-এর দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে, এই বিভাগের কারণে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মতামত যে ব্যাপকভাবে উপেক্ষিত হচ্ছে—অর্থাৎ ‘বটম-আপ’ পদ্ধতির বিপরীতে ‘টপ-ডাউন’ পদ্ধতি আরও জোরদার হয়েছে—এটা তারা বুঝতেই চান না। কৌতূহলের বিষয় হলো, এলজিইডি’র প্রধান রূপকার মরহুম কামরুল ইসলাম সিদ্দিক নিজেই স্থানীয় সরকারের প্রতিষ্ঠান জেলা বোর্ডের অধীনে যোগদান করেছিলেন। তবে তিনি জেলা বোর্ডকে শক্তিশালী করার পথে যাননি। বরং এটি থেকে বোর্ডকে বের করে কীভাবে কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনস্থ করা যায়, তথা গ্রামীণ স্থানীয় কাজগুলোকে কীভাবে কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে নেওয়া যায়, সে চেষ্টাই করেছেন। আর এটির উদাহরণ কাজে লাগিয়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ, গণপূর্ত বিভাগ, সড়ক ও জনপথ বিভাগ ইত্যাদিও একই পথে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ

ব্রিটিশ সরকার তার শাসন পরিচালনার স্বার্থে ১৭৭২ সাল থেকে বাংলায় ২৩টি জেলা গঠন করে প্রত্যেকটিতে একজন করে ব্রিটিশ কালেক্টর নিয়োগ করেন। সেই থেকে জেলা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক স্তর হিসেবে বিবেচিত হতে থাকে। সে সময় বঙ্গীয় স্বায়ত্তশাসন আইন ১৮৮৫ প্রবর্তনের মাধ্যমে জেলা পর্যায়ে ‘জেলা বোর্ড’ গঠন করা হয়। জেলা বোর্ডের অধীনে প্রাথমিক শিক্ষা, পল্লি এলাকায় সড়ক ও পুল নির্মাণ, জনস্বাস্থ্য এবং পয়ঃনিষ্কাশন ইত্যাদি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়।

পাকিস্তান আমলে ১৯৫৯ সালে মৌলিক গণতন্ত্র আদেশ অনুযায়ী জেলা বোর্ডের নামকরণ করা হয় ‘জেলা কাউন্সিল’। জেলা কাউন্সিলের দায়িত্বাবলির মধ্যে ছিল সড়ক, ভবন, হাসপাতাল, ডিসপেনসারি, স্কুল ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য ও পয়ঃপ্রণালি, নলকূপ, ডাকবাংলো সংরক্ষণ ও জেলার অন্তর্গত স্থানীয় পরিষদসমূহ পরিচালনা করা। সেজন্য বলা হয়, পরাধীন আমলে স্থানীয় সরকারের যতটুকু ক্ষমতা ছিল, স্বাধীন দেশে সেটিকে আরও অগ্রসর না করে বরং পূর্বের ক্ষমতাটুকুও কেড়ে নেওয়া হয়। অবশ্য এর জন্য রাজনীতিবিদরা কম দায়ী নন। তবে বহু আমলা কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা বাস্তবায়নের পক্ষে তাদের মেধাকে ব্যয় করেছেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

এলজিইডি’র উত্থান ও কামরুল ইসলাম সিদ্দিক

এ প্রসঙ্গে এলজিইডি’র প্রাক্তন প্রধান প্রকৌশলী শহীদুল হাসানের ‘তৃণমূল মানুষের প্রকৌশল’ শীর্ষক একটি লেখার কিছু অংশ তুলে ধরা যেতে পারে। তিনি বলেছেন— “কামরুল ইসলাম সিদ্দিক ১৯৬৬ সালে বুয়েট থেকে পাস করে ১৯৬৭ সালে কুষ্টিয়া জেলা বোর্ডে পূর্ত কর্মসূচি শাখায় সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। স্বাধীনতার পর খুলনা মিউনিসিপ্যালিটিতে পূর্ত শাখায় যোগদান করেন। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পূর্ত কর্মসূচি সেল গঠিত হলে সেখানে নির্বাহী প্রকৌশলী পদে যোগদান করেন। তিনি আমাকে বলেছেন—অস্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সংগঠিত ও দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে। গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে কৃষিজাত পণ্য উৎপাদন বৃদ্ধি ও বিপণনের প্রসার করতে হবে। গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে ইত্যাদি।”

তাঁর প্রচেষ্টাতেই ১৯৮২ সালে প্রশাসনিক পুনর্গঠন ও বিকেন্দ্রীকরণকল্পে সরকার পূর্ত কর্মসূচির বিভিন্ন স্তরে কর্মরত লোকবল একক কাঠামোয় আনতে ‘পূর্ত কর্মসূচি উইং’ সৃষ্টি করে। কিন্তু অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ায় এর বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। তিনি না দমে গিয়ে রাজস্ব খাতে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর নামে একটি স্থায়ী সংস্থা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়ে যান। ১৯৮৪ সালে প্রাথমিক সাফল্য অর্জন করেন এবং রাজস্ব খাতে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল ব্যুরো বা এলজিইবি নামে স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হন। ১৯৯৬ সালের মধ্যে সব জেলায় নিজস্ব অফিস ও বাসভবন কমপ্লেক্স নির্মাণ সম্পন্ন হয় (সমকাল ১ সেপ্টেম্বর, ২০১০)।

নিয়োগ প্রক্রিয়া ও জনবল কাঠামো

কোনো কাজে সফল হতে হলে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারণ করে অগ্রসর হতে হয়। কামরুল ইসলাম সিদ্দিকের লক্ষ্য ছিল জেলা বোর্ডে কর্মরত প্রকৌশলীদের কেন্দ্রীয় সরকারে নিয়ে যাওয়া, বেকার প্রকৌশলীদের চাকরি দেওয়া এবং তাদেরকে রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্ত করা। সেক্ষেত্রে তিনি শতভাগ সফল হয়েছেন বলা যায়। এর সাথে স্থানীয় সরকার কার্যকর হওয়া তথা স্থানীয়দের ক্ষমতায়নের কী সম্পর্ক তা সঙ্গত কারণেই বোধগম্য নয়।

তিনি গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য নিজের মতো করে বহু প্রকল্প সৃষ্টি করেন এবং সেসব প্রকল্পে বেকার যুবকদের চাকরি প্রদান করেন। কিন্তু সংস্থাপন মন্ত্রণালয় (বর্তমানে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়) ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া সরকারি চাকরির পদ সৃষ্টি করা ও নিয়োগ দেওয়া যায় না। কামরুল ইসলাম সিদ্দিক সেসব নিয়মের তোয়াক্কা করেননি। বেকার যুবক-যুবতীরা (কন্যাদায়গ্রস্ত ব্যক্তিগণসহ) তাঁর মনে করুণার উদ্রেক করতে পারলেই তিনি তাদের একটি গতি করেছেন। তাঁর বিধি-বহির্ভূত নিয়োগযজ্ঞ পরবর্তীকালে বহু সমস্যার সৃষ্টি করে। প্রকল্প শেষ হওয়ার পর নিয়োগপ্রাপ্তরা উচ্চ আদালতের রায়ের মাধ্যমে রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। জেলা ও উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিসের সঙ্গে তাদের বেতন-ভাতা নিয়ে বহু দ্বন্দ্ব-ফ্যাসাদ লক্ষ করা গেছে। জনৈক বিশেষজ্ঞ এ প্রসঙ্গে বলেছেন— “এলজিইডি স্থানীয় সরকারের কাজে না লাগলেও বেকারদের উপকার করেছে।”

একটি উপজেলার এলজিইডি অফিস পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে—১ জন প্রকৌশলী, ১ জন সহ-প্রকৌশলী, ৩ জন উপ-সহকারী প্রকৌশলী, ১ জন নকশাকার, ১ জন সার্ভেয়ার, ৪ জন ওয়ার্ক অ্যাসিস্ট্যান্ট, ১ জন কমিউনিটি অর্গানাইজার, ১ জন অফিস সহকারী, ১ জন হিসাবরক্ষক, ৪ জন এমএলএসএস এবং মাস্টাররোলে ৩ জন ওয়ার্ক অ্যাসিস্ট্যান্ট, ২ জন অফিস সহকারী ও ১ জন সার্ভেয়ার (তারা তাদের চাকরি স্থায়ীকরণের জন্য ইতোমধ্যে মামলা করে জয়ী হয়েছেন); সব মিলিয়ে ২৫ জন কর্মরত রয়েছেন।

স্থানীয় সরকারের সীমাবদ্ধতা ও অনিয়ম

সরকারের দিক থেকে অভিযোগ হলো, উপরিউক্ত পদাধিকারীদের কাজের বিপরীতে নিয়োগ প্রদান করা হয়নি। সেজন্য তারা একজনের কাজ তিনজনে মিলে সম্পন্ন করেন এবং অবশিষ্ট সময় গল্পগুজব করে ব্যয় করেন। অথচ ইউনিয়ন পরিষদে রয়েছেন মাত্র ১ জন সচিব (এখন গালভরা নাম প্রশাসনিক কর্মকর্তা) যাকে একসঙ্গে দুর্গার হাতের দশরকম কাজ করতে হয় (গত ৫/৬ বছর পূর্বে ১ জন হিসাবরক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে)।

ইউনিয়ন পরিষদে দেওয়া বরাদ্দ যেমন—থোক বরাদ্দ, এডিপি, এলজিএসপি, ১% ভূমি উন্নয়ন কর, হাট-বাজার রাজস্ব আয় ইত্যাদি প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হলে এলজিইডি থেকে প্রাক্কলন (এস্টিমেট) প্রস্তুত ও অনুমোদন নিতে হয়। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নির্দিষ্ট অঙ্কের পার্সেন্টেজ ছাড়া উক্ত প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলী ও কর্মচারীগণ কোনো প্রাক্কলন তৈরি এবং বিল প্রদান করেন না। এলজিইডি স্থানীয় সরকারের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হলেও ঠিকাদারদের সঙ্গে বন্ধুত্ব রক্ষা করে চলে। এখানে উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক হবে, আমি ২০০৯ সালে আগারগাঁও এলজিইডি’র প্রধান কার্যালয়ে কামরুল ইসলাম সিদ্দিকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিশদ আলোচনা করি। তিনি অভিযোগগুলো শুনে পদ্ধতিগত ত্রুটিগুলো স্বীকার করেন।

উত্তরণের পথ ও গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার

স্থানীয় উন্নয়নে স্থানীয় সরকার কার্যকর থাকে—এটি গণতান্ত্রিক বিশ্বে স্বীকৃত বিষয়। কিন্তু এদেশের স্থানীয় সরকারগুলো স্বাধীন ও স্বশাসিত না হওয়ায় এককভাবে স্থানীয় কাজগুলো সম্পাদন করার ক্ষমতা রাখে না। ফলে কেন্দ্রীয় সরকারের নেওয়া বহু প্রকল্প স্থানীয়দের কোনো কাজে আসে না। একই কারণে এলজিইডি কর্তৃক বহু রাস্তা ও ব্রিজ-কালভার্ট পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়।

সেজন্য দুই প্রকারের সরকার ব্যবস্থা অর্থাৎ কেন্দ্রীয় সরকার ব্যবস্থা ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করে স্থানীয় কাজগুলো স্থানীয় সরকারের হাতে ছেড়ে দিতে হবে। তখন স্থানীয় সরকারগুলো তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী লোকবল নিয়োগ করবে। সেক্ষেত্রে প্রয়োজনে এলজিইডি’র অপ্রয়োজনীয় কর্মচারীদের স্থানীয় সরকারগুলোতে হস্তান্তর করা যেতে পারে। এরূপ ব্যবস্থা গৃহীত হলে স্থানীয় সরকারগুলো আর উপহাসের পাত্র হবে না। কেন্দ্রীয় সরকারের মতো এগুলোও আলাদা সরকার হিসেবে বিবেচিত হবে। সেই সঙ্গে জনগণের কাছে সরকার কোনো দূরবর্তী কিংবা বায়বীয় বিষয় থাকবে না। ফলে সকলের মাইন্ডসেট হবে— ‘আমিই সরকার, আমিই জনগণ’।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *