সীমান্তে মাদক ও চোরাচালান নিয়ে লেখার নির্মম পরিণতি: নেত্রকোণায় ৫ গুলিতে ঝাঁঝরা অনলাইন সাংবাদিক আলিফ

রেজাউল করিম, ময়মনসিংহ

নেত্রকোণা সীমান্ত অঞ্চলের চিহ্নিত মাদক সিন্ডিকেট, চোরাচালান চক্র ও স্থানীয় দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সোচ্চার থাকা অনলাইন সাংবাদিক লুৎফর জামান ফকির আলিফকে অতর্কিত গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা।

​আজ শুক্রবার (১৬ অক্টোবর ২০২৬) রাত আনুমানিক সোয়া ৮টার দিকে তাঁকে লক্ষ্য করে অত্যন্ত কাছ থেকে (পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ) একে একে পাঁচটি গুলি চালিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যায়।

​পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জে হামলা ও মৃত্যু

​প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, রাতের আঁধারে অতর্কিত হামলার শিকার হন সাংবাদিক আলিফ। সন্ত্রাসীদের ছোড়া গুলিতে তাঁর মাথা, গলা ও বুক ঝাঁঝরা হয়ে যায়। ঘটনাস্থলে রক্তাক্ত অবস্থায় লুটিয়ে পড়লে স্থানীয় বাসিন্দারা তাঁকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

​সাংবাদিকতার নেপথ্য ও ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’

​নিহত লুৎফর জামান ফকির আলিফ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন সাবেক সদস্য ছিলেন। সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহণের পর তিনি সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত হন। সর্বশেষ তিনি ‘রূপসী বাংলা’ নামের একটি নিবন্ধিত আইপি টিভিতে কাজ করছিলেন।

​তবে মূলধারার ইলেকট্রনিক বা প্রিন্ট মিডিয়ার পাশাপাশি নেত্রকোণা সদর, দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা সীমান্ত অঞ্চলে তিনি বহুল পরিচিতি পান ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ (Detective Article) নামের একটি ফেসবুকভিত্তিক অনুসন্ধানী পেজের মাধ্যমে। ওই পেজের মাধ্যমে তিনি সীমান্তবর্তী এলাকার শক্তিশালী মাদক সিন্ডিকেট, অবৈধ চোরাচালান, স্থানীয় প্রভাবশালী চক্রের আধিপত্য, অপসাংবাদিকতা এবং পুলিশ প্রশাসনের বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে নিয়মিত তথ্য, প্রমাণ ও অনুসন্ধানী ভিডিও প্রকাশ করতেন।

​হত্যাকাণ্ডের কারণ ও সাংবাদিক সমাজের ক্ষোভ

​সহকর্মী ও স্থানীয় সাংবাদিকদের মতে, প্রান্তিক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে কোনো ধরনের ভয় বা আপস ছাড়া অপরাধ জগতের ভেতরের খবর উন্মোচন করে আসছিলেন আলিফ। তাঁর এই নির্ভীক ও সাহসী সাংবাদিকতা স্থানীয় অপশক্তি, চোরাচালান সিন্ডিকেট ও প্রভাবশালী মহলের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ধারণা করা হচ্ছে, সীমান্ত সিন্ডিকেটের ধারাবাহিক অপকর্ম ও অবৈধ সাম্রাজ্যের গোপন খবর ফাঁস করে দেওয়ার প্রতিশোধ নিতেই পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে।

​হত্যাকাণ্ডের খবর পাওয়ার পরপরই নেত্রকোণা জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। ময়নাতদন্তের জন্য নিহতের মরদেহ উদ্ধার করে জেলা হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।

​এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে জড়িত ঘাতকদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শনাক্ত ও গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী ও সচেতন নাগরিক সমাজ।

​পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের চিহ্নিত করতে এলাকা জুড়ে অভিযান শুরু হয়েছে এবং ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।