লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী শুধু পাঠ নিতে আসে না; এখানে শিক্ষার্থী আসে নিরাপদে বেড়ে উঠতে, জ্ঞান ও মূল্যবোধ অর্জন করতে এবং নিজের সম্ভাবনা বিকশিত করতে। মাদ্রাসার ক্ষেত্রেও এই প্রত্যাশা সমানভাবে প্রযোজ্য। ধর্মীয় শিক্ষা, নৈতিকতা ও মানবিকতার চর্চা যেখানে মুখ্য, সেখানে শিক্ষার্থীর প্রতি নিষ্ঠুরতা বা অপমানের অভিযোগ সমাজকে বিশেষভাবে নাড়া দেয়।
কোনো শিক্ষার্থী নির্যাতনের শিকার হলে তার শারীরিক ক্ষতির পাশাপাশি তৈরি হতে পারে দীর্ঘস্থায়ী ভয়, লজ্জা, মানসিক আঘাত এবং শিক্ষার প্রতি অনীহা। আবার অভিযোগ উঠলেই যাচাই ছাড়া কোনো শিক্ষককে অপরাধী বলে চাপিয়ে দেওয়া হলে তাঁর সম্মান, জীবিকা ও পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই ন্যায়বিচারের দাবি দ্বিমুখী—নির্যাতনের শিকার শিক্ষার্থীকে সুরক্ষা ও প্রতিকার দিতে হবে, আর অভিযুক্ত শিক্ষককেও ন্যায্য তদন্ত ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে।
মূল নীতি: এই ভারসাম্যকে অজুহাত করে কোনো অভিযোগ ধামাচাপা দেওয়া চলবে না, আবার জনরোষকে বিচারের বিকল্প করাও গ্রহণযোগ্য নয়। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করবে প্রমাণ, তদন্ত ও যথাযথ আইনের প্রক্রিয়া।
আইনি কাঠামো ও শিশু সুরক্ষা
বাংলাদেশে শিশু সুরক্ষার সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো রয়েছে:
- শিশু আইন, ২০১৩ (৭০ ধারা): এই ধারায় শিশুর দায়িত্বে বা পরিচর্যায় থাকা ব্যক্তির দ্বারা আঘাত, উৎপীড়ন, অবহেলা কিংবা পরিত্যাগের ফলে শিশুর অহেতুক দুর্ভোগ বা স্বাস্থ্যের ক্ষতি হলে শাস্তির বিধান রয়েছে। শাস্তির পরিমাণ ও কোন আইন প্রযোজ্য হবে, তা নির্দিষ্ট ঘটনার তথ্য ও তদন্তের ভিত্তিতে আদালত নির্ধারণ করে। শিশু সুরক্ষার বিষয়টি তাই কোনো প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলাবিধির বিষয়মাত্র নয়, এটি সরাসরি আইনের প্রশ্ন।
- শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা (২০১১): শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে (মাদ্রাসাসহ) শারীরিক ও মানসিক শাস্তি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বেত্রাঘাত, চড়-থাপ্পড় বা অপমানজনক আচরণকে শিক্ষাদানের গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি বলা যায় না।
জরুরি পদক্ষেপ ও প্রাথমিক সুরক্ষা
আইন ও নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও কোথাও অভিযোগ উঠলে প্রথম ও প্রধান প্রশ্ন হওয়া উচিত—শিক্ষার্থী এখন নিরাপদ কি না?
- তার চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা এবং নির্ভরযোগ্য অভিভাবক বা সহায়তাকারীর কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
- অভিযোগ তদন্তের জন্য রেকর্ড, সাক্ষ্য বা প্রাসঙ্গিক তথ্য সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।
- প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষার তাগিদে অভিযোগকারীকে প্রত্যাহারে চাপ দেওয়া, ঘটনাকে “শাসন” বলে ব্যাখ্যা করা বা অভিযুক্ত ব্যক্তিকে শিক্ষার্থীর কাছাকাছি রাখা সম্পূর্ণ অন্যায়।
সাময়িক সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা: গুরুতর অভিযোগে তদন্ত চলাকালে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে সাময়িকভাবে শিক্ষার্থীর সরাসরি তত্ত্বাবধান থেকে সরিয়ে রাখা যেতে পারে, যাতে অভিযোগকারী নিরাপদে থাকে এবং সাক্ষীর ওপর কোনো চাপ না পড়ে। এই ব্যবস্থা হবে অস্থায়ী, লিখিত ও পর্যালোচনাযোগ্য।
নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া
- স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত: প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধান ছাড়াও পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষকে আইন অনুযায়ী নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে।
- তথ্য সংগ্রহ: অভিভাবক, প্রত্যক্ষদর্শী, সহপাঠী, চিকিৎসক এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যক্তির বক্তব্য নিতে হবে। শিশুকে বারবার একই ঘটনা বলতে বাধ্য না করে তার বয়স ও মানসিক অবস্থার উপযোগী পদ্ধতিতে তদন্ত সম্পন্ন করতে হবে।
- গুজব বর্জন: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট বা জনশ্রুতি তদন্তের বিকল্প নয়। একইভাবে প্রভাবশালী কারও মৌখিক অস্বীকৃতিও অভিযোগ খারিজের ভিত্তি হতে পারে না।
দোষীদের শাস্তি ও নির্দোষের সুরক্ষা
- আইন অনুযায়ী শাস্তি: অভিযোগ প্রমাণিত হলে পদ, পরিচিতি, ধর্মীয় মর্যাদা বা আর্থিক প্রভাব যেন কাউকে দায়মুক্তি না দেয়। অপরাধের ধরন অনুযায়ী ফৌজদারি বিচার এবং চাকরিগত বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে হবে। শাস্তি শুধু প্রতিশোধ নয়, বরং ভবিষ্যৎ অপরাধ রোধের বার্তা দেয়।
- সুনাম পুনরুদ্ধার: অভিযোগ প্রমাণিত না হলে বা তদন্তে অসদুদ্দেশ্যপূর্ণ মিথ্যা অভিযোগ প্রমাণিত হলে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সুনাম পুনরুদ্ধার ও ন্যায্য প্রতিকার নিশ্চিত করা জরুরি। অভিযোগ প্রমাণ না হওয়া আর অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণ হওয়া এক কথা নয়।
সাংবিধানিক অধিকার ও উভয়পক্ষের মর্যাদা রক্ষা
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে আইনের আশ্রয় ও আইনানুগ আচরণের অধিকার স্বীকৃত এবং আইনবহির্ভূত পদক্ষেপ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
- অভিযোগ প্রকাশের আগে যাচাই, অভিযুক্তকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ, গোপনীয়তা এবং প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থী ও শিক্ষক উভয়ের সুরক্ষার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
- আদালতের রায় বা তদন্তের ফলাফলের আগে কাউকে সামাজিকভাবে দোষী সাব্যস্ত করা যাবে না।
কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক শিশু-সুরক্ষা ব্যবস্থা
কাগুজে নীতিমালা যথেষ্ট নয়, প্রতিটি মাদ্রাসায় কার্যকর শিশু-সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে:
- অভিযোগ বাক্স ও কমিটি: সহজে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা থাকতে হবে। কমিটিতে প্রতিষ্ঠানের প্রধান বা অভিযুক্তের একক নিয়ন্ত্রণ থাকা যাবে না; বরং নারী প্রতিনিধি, শিশু সুরক্ষা বিশেষজ্ঞ এবং অভিভাবক প্রতিনিধি রাখতে হবে।
- হেল্পলাইন ও সহায়তা: শিশুরা অনেক সময় ভয় বা লজ্জায় সরাসরি অভিযোগ করতে পারে না। তাই নিয়মিত নিরাপদ কথোপকথন এবং সরকারি শিশু সহায়তা হেল্পলাইন ‘১০৯৮’-এর নম্বর সহজে দৃশ্যমান জায়গায় প্রদর্শন করতে হবে।
শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও তদারকি
- রাগের মাথায় শাস্তি দেওয়া, শিক্ষার্থীকে সবার সামনে অপমান করা বা গালমন্দ করাকে শৃঙ্খলা রক্ষার নামে চালিয়ে দেওয়া যাবে না।
- শিক্ষককে শ্রেণিকক্ষ ও আবাসিক পরিবেশে শিশুদের আচরণ সামলানোর অহিংস পদ্ধতি এবং অভিযোগ পেলে করণীয় বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
- শিক্ষা বোর্ড, অধিদপ্তর, পরিচালনা কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসনকে নিয়মিত পরিদর্শন ও তদারকি বাড়াতে হবে।
কওমি ও আলিয়ার সমন্বিত উদ্যোগ
সাম্প্রতিক সময়ে কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ সমন্বয়কারী সংস্থা ‘আল-হাইআতুল উলয়া’ শিক্ষার্থী নির্যাতন প্রতিরোধে শারীরিক শাস্তি নিষিদ্ধ, সুরক্ষা কমিটি সক্রিয় রাখা এবং অভিযোগ তদন্তের নির্দেশনা দিয়েছে। এই নির্দেশনার বাস্তব প্রতিফলন ঘটাতে হবে। শুধু কওমি নয়, আলিয়া ও কওমি—সব ধারার প্রতিষ্ঠানে সুরক্ষার ন্যূনতম মান নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
উপসংহার
মাদ্রাসার শিক্ষকরা সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বহু শিক্ষক নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। একজনের অপরাধে পুরো শিক্ষকসমাজকে অভিযুক্ত করা যেমন অন্যায়, তেমনি শিক্ষকসমাজের মর্যাদার অজুহাতে অভিযোগকে অবিশ্বাস করাও অন্যায়।
একটি সুস্থ শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষক হবেন নিরাপত্তা ও জ্ঞানের সহায়ক, আর শিক্ষার্থী থাকবে মর্যাদা ও সুরক্ষার অধিকারী। অপরাধ আড়াল না করে, নির্দোষকে অপমান না করে এবং প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য নিরাপদ ও সম্মানজনক শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তোলার মাধ্যমেই শিক্ষক ও মাদ্রাসার প্রকৃত মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।