ময়মনসিংহে গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের কবর জিয়ারত ও দোয়া করল মহানগর জামায়াত

রাশিদ আহমেদ নিসর্গ, ময়মনসিংহ প্রতিনিধি

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ময়মনসিংহ মহানগর শাখার উদ্যোগে ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শাহাদাতবরণকারী বীর শহীদদের কবর জিয়ারত ও তাঁদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় বিশেষ দোয়া অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল সোমবার (২০ জুলাই) সকালে নগরীর দুটি পৃথক গোরস্থানে এই জিয়ারত ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।

দুই গোরস্থানে শ্রদ্ধা ও জিয়ারত

​মহানগর জামায়াতের নায়েবে আমীর আসাদুজ্জামান সোহেলের নেতৃত্বে দলীয় নেতাকর্মীরা প্রথমে আকুয়া মাদরাসা কোয়ার্টার গোরস্থানে যান। সেখানে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে শহীদ হওয়া রিদওয়ান হোসেন সাগরের কবর জিয়ারত করেন তারা। এরপর নেতৃবৃন্দ ভাটিকাশর গোরস্থানে গিয়ে উক্ত আন্দোলনের আরেক বীর শহীদ আব্দুল্লাহ আল মাহিনের কবর জিয়ারত করেন। জিয়ারত শেষে শহীদদের রুহের মাগফিরাত এবং দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়।

​শহীদ রিদওয়ান হোসেন সাগরের কবর জিয়ারতের সময় তাঁর পিতা মোঃ আসাদুজ্জামান আসাদ উপস্থিত ছিলেন।

“আর কোনো বাবা-মায়ের যেন এমন কষ্ট না হয়” — শহীদের বাবা

​কবর জিয়ারত শেষে এক আবেগঘন পরিবেশে শহীদ সাগরের পিতা মোঃ আসাদুজ্জামান আসাদ বলেন—

​”আজ আমি একজন বাবা হিসেবে আপনাদের সামনে দাঁড়িয়েছি। আমার বুকের ভেতর যে শূন্যতা, তা কোনো ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই আমার সন্তান সাগরকে আমি হারিয়েছি। একজন বাবা-মায়ের কাছে সন্তানের মৃত্যু পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কষ্ট। সাগর ছিল আমাদের পরিবারের স্বপ্ন, আমাদের আশার আলো। পরিবারকে ভালো রাখা আর দেশের জন্য সুন্দর একটি ভবিষ্যৎ গড়ার অনেক স্বপ্ন ছিল তার। কিন্তু সেই স্বপ্নগুলো আজ অসমাপ্ত রয়ে গেছে। আমি আমার সন্তানের হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই, তবে সেই বিচার হোক দেশের প্রচলিত আইনের মাধ্যমে, শতভাগ ন্যায়বিচারের মাধ্যমে। আমি চাই, আর কোনো বাবা-মাকে যেন আমার মতো সন্তানের লাশ কাঁধে নিতে না হয়। আর কোনো পরিবার যেন এমন অসহনীয় বেদনার মধ্য দিয়ে না যায়। আমি সবাইকে অনুরোধ করব, আমরা যেন ঘৃণা নয়; ন্যায়, মানবিকতা ও শান্তির পথ বেছে নিই। শহীদদের আত্মত্যাগ যেন আমাদের একটি নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার প্রেরণা দেয়।”

শহীদদের রক্ত বৃথা যেতে দেওয়া হবে না: মহানগর নায়েবে আমীর

​শহীদ পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে ময়মনসিংহ মহানগর জামায়াতের নায়েবে আমীর আসাদুজ্জামান সোহেল বলেন—

​”২০২৪ সালের জুলাই মাস আমাদের জাতীয় ইতিহাসে এক রক্তঝরা ও গৌরবময় অধ্যায় হয়ে থাকবে। দীর্ঘদিনের স্বৈরাচারী শাসন, দুর্নীতি, অনিয়ম এবং মানুষের অধিকার হরণের বিরুদ্ধে আমাদের তরুণ প্রজন্ম ও ছাত্রসমাজ রাজপথে নেমে এসেছিল। তারা চেয়েছিল একটি বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক এবং ইনসাফপূর্ণ সমাজ। এই আন্দোলনে ময়মনসিংহের ছাত্র-জনতা যে সাহসিকতা দেখিয়েছে, তা ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। আমি গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি সেই সকল বীর শহীদদের, যারা বুক পেতে দিয়ে বুলেট গ্রহণ করেছেন, কিন্তু অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি। আমাদের ময়মনসিংহের দামাল ছেলেরা তাদের রক্ত দিয়ে এই গণঅভ্যুত্থানকে চূড়ান্ত রূপ দিয়েছে। আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, এই শহীদদের রক্ত বৃথা যেতে দেওয়া হবে না। তারা যে আগামীর স্বপ্ন দেখেছিল—সেখানে থাকবে না কোনো জুলুম, থাকবে না কোনো স্বৈরাচার ও নিপীড়ন। একটি ইনসাফপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠা করাই এখন আমাদের মূল লক্ষ্য।”

​তিনি আরও যোগ করেন, আন্দোলনে আহতদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং শহীদ পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো সবার নৈতিক দায়িত্ব। জামায়াতে ইসলামী শুরু থেকেই তাঁদের পাশে ছিল এবং ভবিষ্যতেও এই পরিবারগুলোর পাশে থাকবে।

উপস্থিত নেতৃবৃন্দ

​উক্ত তাৎপর্যপূর্ণ কর্মসূচিতে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের ময়মনসিংহ জেলা শাখার সভাপতি মাওলানা মাহমুদ উল্লাহ ফারুকী, ময়মনসিংহ মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি শহীদুল্লাহ কায়সার, সাংগঠনিক সম্পাদক আল হেলাল তালুকদার, যুব বিভাগের সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল বারী, কর্মপরিষদ সদস্য হায়দার করিম, আব্দুল আজিজ, ডা. আসাদ, আবু কাউসার এবং আল মামুনসহ সংগঠনের বিভিন্ন স্তরের স্থানীয় দায়িত্বশীল ও সাধারণ কর্মীবৃন্দ।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *