হেলেন হাসান

অর্ধশতাব্দী পার করে এসেছি বহু আগেই! ষাটের দশকে দাঁড়িয়ে নিজের ফেলে আসা পথের পানে ফিরে তাকিয়ে বিকেলের রোদে দেখি একধরনের দীর্ঘ ছায়া! নিজেকে এই প্রথম আজ আমি দেখছি? এতগুলো বছর আমি সেই ছায়ার দিকে তাকিয়ে শুধু দীর্ঘশ্বাসই ফেলেছি। শৈশব, কৈশোর, যৌবন আর মধ্যবয়সের বাঁকগুলো পেরিয়ে আসার পর আমার কেবলই মনে হতো, আমার জীবনের খাতাটা বোধহয় শুরু থেকেই ভুল কালিতে লেখা হয়েছিল। মনে হতো, স্রষ্টা আমার ললাটে সুখের কোনো রেখা টানেননি; আগাগোড়া যা লিখেছেন, তার সবটুকুই শোক, বঞ্চনা আর দীর্ঘশ্বাস।
কিন্তু মানুষের নিজের সম্পর্কে গড়া সবচেয়ে কঠিন ধারণাটিও কখনো কখনো একটিমাত্র প্রশ্নের ধাক্কায় নড়ে ওঠে। শেখ নাদিম, যাকে প্রায় চার দশক আগে মামার বিয়েতে ছোট্ট এক বালক হিসেবে বরযাত্রী হয়ে আসতে দেখেছিলাম। বয়সের ব্যবধান খুব বেশি না হলেও সে আমার সন্তানতুল্য, আমার স্বামীর একমাত্র ভাগ্নে! সময়ের কী আশ্চর্য বৃত্ত! চল্লিশ বছর আগের সেই ছোট্ট ছেলেটি আজ পরিণত বয়সে এসে আমাকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দিল! কথা শুরু হয়েছিল আমার স্বামীর আকস্মিক অসুস্থতা নিয়ে, কিন্তু কথার স্রোত কখন যে আমার ভেতরের অর্গলবদ্ধ ঘরগুলোতে গিয়ে আঘাত করল, টেরই পাইনি।
অভ্যস্ত হাহাকার এবং মাতৃত্বের চিরন্তন শোক
অভ্যাসের বশেই বলছিলাম—আমার আর দাম কী, আমার কপালেই তো কিছু নেই, এই বয়সে তিনবেলা দুটো খাবার, কিছু ওষুধ আর মাথা গোঁজার একটু ঠাঁই হলেই তো জীবন কেটে যায়। নাদিম আমার এই অভ্যস্ত হাহাকারকে মাঝপথেই থামিয়ে দিল। সে আমাকে এমন এক সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করাল, যা এতকাল আমার চোখের সামনে থেকেও আড়ালে পড়ে ছিল।
আমার জীবনের দিকে তাকালে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের ক্ষত দেখা যায়, যে দুটিকে এত দিন আমি একই হতাশার পাল্লায় মেপে এসেছি। প্রথম ক্ষতটি আমার মাতৃত্বের, যার কোনো সান্ত্বনা পৃথিবীর কোনো ভাষায় নেই। আমার দুই ছেলে। বড় ছেলেটি ছিল বিধাতার এক বিস্ময়কর দান। স্কুলজীবনেই সে এতটাই মেধাবী ছিল যে, গণিতের পুরো বইটি প্রথম থেকে শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে আত্মস্থ করে ফেলতে পারত—যেন প্রতিটি পাতা তার মস্তিষ্কে হুবহু ছাপা হয়ে থাকত। নিজের সেই অসাধারণ মেধার জোরেই সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগে পড়ার সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু তীব্র হাঁপানি আর দীর্ঘ অসুস্থতার কাছে হার মেনে আমার সেই রত্নটি চিরদিনের মতো চলে গেল।
সন্তান হারানোর পর প্রথম ধাক্কাটা একজন মা হয়তো নিঃশ্বাস নিয়ে বেঁচে থাকার তাগিদে কোনোভাবে সামলে ওঠে, কিন্তু তার ভেতরের পৃথিবীটা চিরকালের মতো নিস্তব্ধ হয়ে যায়। কত রাত আমি স্রষ্টার দিকে তাকিয়ে কেঁদে প্রশ্ন করেছি—কেন আমাকে এই শাস্তি দিলে? আর কতকাল এই বুকের পাথর বয়ে বেড়াতে হবে? আজ এই পরিণত বয়সে এসে আমি বুঝি, আমার সেই প্রশ্ন কোনো অবিশ্বাস ছিল না, ছিল একজন মায়ের হৃদয়ের রক্তক্ষরণ। আর সবচেয়ে বড় সত্য হলো, আমার বড় ছেলের ওই অকালমৃত্যু স্রষ্টার শাস্তি ছিল না, আমার কোনো অপরাধের মাশুলও ছিল না। মানুষের জীবনে কিছু শোক আসে প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে, যার ওপর মানুষের হাত থাকে না। সেই পবিত্র শোককে নিজের জীবনের ব্যর্থতা বা ‘খারাপ কপালের’ সাধারণ হিসাবের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলা ছিল আমার নিজের প্রতিই একধরনের অবিচার।
অন্যদিকে আমার ছোট ছেলেটির জীবন ও স্বভাব গড়ে উঠেছে ভিন্ন ছাঁচে। বড় ভাইয়ের মতো পড়াশোনার সেই তীব্র একাগ্রতা বা ব্যতিক্রমী মেধার পথে সে হাঁটেনি। এখনো তার শিক্ষাজীবনই শেষ হয়নি, অথচ পড়াশোনার পাঠ চুকানোর আগেই, একেবারে অপরিণত বয়সে সে সংসার পেতে বসেছে। প্রায় পাঁচ বছর আগে তার ঘর আলো করে সন্তান এসেছে, আমি দাদী হয়েছি। কিন্তু অগভীর ও অপরিপক্ব বয়সে সংসার শুরু করলে যা হয়—বাস্তবতার ধাক্কা আর বয়সের চঞ্চলতায় স্ত্রীর সঙ্গে তার মান-অভিমান ও ঝগড়াবিবাদ প্রায়ই লেগে থাকে। কখনো তাদের সম্পর্ক খুব মধুর মনে হয়, তো কখনো তীব্র টানাপোড়েন শুরু হয়। বড় ছেলের শূন্যতা যেমন চিরন্তন, ছোট ছেলের এই অস্থির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ ঘিরে আমার মমতা ও উদ্বিগ্নতাও তেমনি গভীর। ডানে-বাঁয়ে ভাইবোনহীন আমার এই ছেলেটি যেন একাকী এক বৃক্ষের মতো; তার মাথার ওপর থেকে বাবার ছায়া সরে গেলে হঠাৎ পাওয়া অঢেল সম্পদ আর চারপাশের প্রলোভন তাকে যেন অকালেই ধ্বংস করে না দেয়, সেই দুশ্চিন্তা আমাকে আজও তাড়িয়ে বেড়ায়।
দাম্পত্যের দীর্ঘ ব্যবধান ও আত্মিক দায়বোধ
কিন্তু সন্তানের শোক ও দুশ্চিন্তার বাইরে আমার জীবনের যে দ্বিতীয় ক্ষতটি—আমার দাম্পত্যের দীর্ঘ পনেরো বছরের বিচ্ছিন্নতা—সেখানে কি আমার নিজেকে প্রশ্ন করার কিছুই ছিল না?
প্রায় পঁয়ত্রিশ-চল্লিশ বছর আগে, পরিবারের সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে এক গভীর ভালোবাসার টানে যিনি আমাকে বিয়ে করেছিলেন—আজ নাদিম যখন আমাকে নব্বইয়ের দশকের সেই দিনগুলোতে ফিরিয়ে নিয়ে গেল, তখন আমার মনে পড়ল, সেই সময় মানুষটার কাছে আমার মূল্য ছিল পৃথিবীর যেকোনো কিছুর চেয়ে বেশি। সেই ভালোবাসা আর মূল্যায়নে কোনো কৃত্রিমতা ছিল না। অথচ সময়ের নির্মম পরিহাসে এবং আমাদের প্রিয় বড় সন্তানটিকে হারানোর অসহনীয় শোকের ভার সইতে না পেরে সেই মানুষটিই ধীরে ধীরে নিজেকে এক আত্মধ্বংসী পথে ঠেলে দিল। সন্তান হারানোর সেই গভীর ক্ষত তাকে নিজের প্রতি এতটাই উদাসীন ও বেপরোয়া করে তুলল যে, বছরের পর বছর ধরে চরম অনিয়ম করে সে নিজের শরীর ও জীবনের ওপর নিজেই জুলুম করে গেছে। আর এই ভাঙনের স্রোতে আমাদের মাঝখানেও তৈরি হলো পনেরো বছরের এক দুস্তর ব্যবধান।
আজ সে গুরুতর অসুস্থ, নিজের শরীরের ওপরই তার নিয়ন্ত্রণ নেই। তবু দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতার পরেও আমি তার জন্য উপরওয়ালার কাছে সুস্থতা প্রার্থনা করি। একজন সার্বক্ষণিক সঙ্গী বা দেখাশোনার মানুষ পেলে সে যদি বেঁচে থাকে, সুস্থ থাকে—তাতে আমি বরং স্বস্তিই পাবো। কারণ দীর্ঘ সম্পর্কের দাবি কেবল কাগজের অধিকারে সীমাবদ্ধ থাকে না; তার ভেতরে জড়িয়ে থাকে হাজারো অভিযোগ, পুরোনো মমতা, সন্তানের মাথার ওপর পিতার ছায়া টিকে থাকার প্রার্থনা এবং একটি পরিবারের অস্তিত্বের ভিত্তি। আমাদের মোহনগঞ্জের সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত এবং ব্রিটিশ আমলের শিক্ষিত ব্যক্তি ডাক্তার বদরউদ্দিন আহমদের ছেলে সালেকুল হাসান লেলিন! এই উপজেলার অগণিত মানুষের আস্থার প্রথম স্থান, একজন সম্মানিত সমাজসেবক! আমাদের সম্পর্কের দাবিতে যদি বিচারের কথা বলতে হয়, “তাকে আমার হাতে এনে দিন, নিজ হাতে তাকে কঠোর শাস্তি দিতে আমি প্রস্তুত! কিন্তু কোনো তৃতীয় ব্যক্তি তাকে নিয়ে শাস্তি তো দূরের কথা, একটি কটুকথা বললেও বোধকরি আমি তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে কালক্ষণ বিলম্ব করব না!”
আজ নিজের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একটি কঠিন প্রশ্ন আমি এড়িয়ে যেতে পারি না। স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে তা রক্ষা করা কঠিন, অর্থ উপার্জনের চেয়ে অর্থ ধরে রাখা কঠিন, আর মানুষের কাছ থেকে সম্মান ও ভালোবাসা পাওয়ার চেয়েও শতগুণে কঠিন সেই মর্যাদা আজীবন ধরে রাখা। যৌবনের শুরুতে যে অকৃত্রিম মূল্য আমি তার কাছে পেয়েছিলাম, তা সযত্নে ধরে রাখার মতো মানসিক পরিপক্বতা বা কৌশল কি আমার জানা ছিল? আমি তো ফেরেশতা ছিলাম না, রক্ত-মাংসের মানুষই ছিলাম। হয়তো আমারও অপরিপক্বতা ছিল, হয়তো অভিমান বা অজ্ঞতার বশে আমিও এমন কিছু ভুল করেছিলাম যা দূরত্বের দেয়ালটিকে কেবলই উঁচু করেছে। একটি সম্পর্ক তো কখনো একজনের একক ভুলে ভাঙে না, একজনের একক চেষ্টায় টিকেও থাকে না। স্বামীর নিজের প্রতি এই অবিচারের দায় যেমন আমার নয়, তেমনি সম্পর্কের ছন্দপতনে নিজের অংশের মানবিক সীমাবদ্ধতাটুকু স্বীকার করে নেওয়া মানেও নিজেকে অপরাধী সাব্যস্ত করা নয়। বরং এই স্বীকারোক্তিই মানুষের প্রজ্ঞার পরিচয়।
কপালের হিসাব বনাম আত্মিক পরিশোধন (সিজনিং)
আমার জীবনের সবচেয়ে বড় বাঁকবদলটি ঘটল তখনই, যখন আমি ‘কপাল’ শব্দটির আসল অর্থ নতুন করে ভাবতে বসলাম। কথায় কথায় আমি বলতাম—আমার কপালে সুখ নেই, কপালে থাকলে কি আর এমন হতো! নাদিম আমাকে অত্যন্ত সহজ অথচ তীক্ষ্ণ একটি প্রশ্ন করল—কপাল কে লেখেন? স্রষ্টা। তবে কি দিনরাত কপালকে দোষ দিয়ে আমি পরোক্ষভাবে স্রষ্টার বিচারকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করছি না? আবার নিজের ভুল বা অপরিপক্বতার দায়টুকুও কি ‘কপালের লিখন’ বলে আড়াল করছি না? একজন বিশ্বাসী মানুষ হিসেবে এই প্রশ্নটি আমার ভেতরে প্রচণ্ড আলোড়ন তুলল।
ঠিক তখনই আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল এক আশ্চর্য সত্যের ছবি। আজ যে নিখুঁত স্বর্ণের আংটিটি মাথার ওপর একটি মূল্যবান পাথর ধারণ করে মানুষের আঙুলে শোভা পায়, যার এত মূল্য, এত যত্ন, তার জন্মের ইতিহাস কি কেবলই সমাদরের? মাটির গভীর অন্ধকার থেকে যখন তাকে আকরিক হিসেবে তোলা হয়, তখন তো তার গায়ে কেবলই কাদা, পাথর আর খাদ। সেই মাটিমাখা আকরিক থেকে খাঁটি স্বর্ণে রূপান্তরিত হতে তাকে কী ভয়াবহ পথই না পাড়ি দিতে হয়! কারিগরের হাপরের তীব্র আগুনে তাকে গলতে হয়, তীব্র অ্যাসিডের দহনে তার ভেতরের সমস্ত খাদ ও কলুষ পুড়ে ছাই হতে হয়, নেহাইয়ের ওপর হাতুড়ির নির্মম আঘাত সহ্য করে তাকে নির্দিষ্ট আকার নিতে হয়।
একজন জহুরি বা স্বর্ণকারের চোখে এই আগুন, এই অ্যাসিড, এই আঘাত কোনো ধ্বংসযজ্ঞ নয়—এটি হলো ‘সিজনিং’ বা পরিশোধন। কাঁচা ধাতু বা স্বর্ণ যদি সঠিক তাপে ও চাপে পোড়ানো না হয়, তবে তা কখনোই মূল্যবান রত্ন ধারণ করার যোগ্যতা অর্জন করে না; সামান্য চাপে তা বেঁকে যায় বা ভেঙে পড়ে।
আমার জীবনের এই পঁয়ত্রিশ-চল্লিশ বছরের দহন, সন্তান হারানোর তীব্র আগুন, সম্পর্কের বিচ্ছিন্নতার অ্যাসিড, আর গত ছয় মাস ধরে নিজের অসুস্থ শরীর নিয়ে একাকী ময়মনসিংহে বারবার ছুটে যাওয়ার এই ক্লান্তিকর সংগ্রাম—এসবই কি তবে আমাকে শেষ করে দেওয়ার জন্য ছিল? নাকি আমার ভেতরের সমস্ত খাদ পুড়িয়ে আমাকে এক খাঁটি, সহনশীল ও প্রজ্ঞাবান মানুষে পরিণত করার জন্যই বিধাতার এই দীর্ঘ ‘সিজনিং’ চলছিল?
স্মৃতির ছাই পেরিয়ে জীবনের নতুন সূর্যোদয়
আগুনে পোড়ার সময় সোনা ভাবে সে বুঝি নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কারিগর জানেন, এই তাপটুকু সহ্য না করলে তার মাথায় মূল্যবান পাথর বসানো যাবে না। আমি এত দিন কেবল আগুনের তাপটুকুই গুনেছি, নিজেকে খাঁটি সোনা হিসেবে গড়ে ওঠার প্রক্রিয়াটি দেখিনি।
আমি শিক্ষিত হয়েও আজ অন্যের অনুগ্রহের পাত্র হয়ে আছি। কারও কাছে গেলে নিজের অসহায়ত্ব আর না-পাওয়ার ইতিহাসই কেবল মেলে ধরতাম। কিন্তু আজ আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি, নিজের অসম্মান বা অপ্রাপ্তির কথা বারবার মানুষের কাছে উচ্চারণ করলে সহানুভূতি হয়তো মেলে, কিন্তু মর্যাদা বাড়ে না; বরং নিজের মূল্য নিজের হাতেই কমানো হয়। সম্মান বাইরে থেকে ভিক্ষা করার বিষয় নয়; মানুষ নিজেকে যে মূল্যে দেখে এবং নিজের ব্যক্তিত্বকে যে উচ্চতায় রাখে, সমাজ শেষ পর্যন্ত তাকে সেই নামেই ডাকে।
আমার তো শিক্ষা আছে, অর্জিত সনদ আছে, ভাষা আছে, আর সবচেয়ে বড় কথা—জীবনের দীর্ঘ অগ্নিপরীক্ষায় পোড় খাওয়া এমন এক অভিজ্ঞতা আছে, যা কোনো বইয়ের পাতায় পাওয়া যায় না। আমি তো কখনো শপথ করিনি যে আমার এই শিক্ষা আর প্রজ্ঞা আমি কোনো দিন কাজে লাগাব না! খাওয়া, ঘুম আর ওষুধের হিসাবের মধ্যেই যদি ষাট বছরের একটি শিক্ষিত ও সংবেদনশীল জীবন সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, তবে এতকাল ধরে সহ্য করা সেই আগুনের মূল্য কী রইল?
অতীতের যা কিছু হারিয়ে গেছে, তা আর ফিরে আসবে না। বড় ছেলের শূন্য আসনটি চিরকালই শূন্য থাকবে, যৌবনের সেই ফেলে আসা দিনগুলোও আর নতুন করে শুরু হবে না। কিন্তু আমার ভেতরে যে অভিজ্ঞতার খাঁটি স্বর্ণটুকু অবশিষ্ট আছে, তাকে অব্যবহৃত ফেলে রাখার কোনো অধিকার আমার নেই।
আমার চারপাশে আজ কত নতুন প্রজন্মের মানুষ অপরিণত বয়সের আবেগ, দাম্পত্যের টানাপোড়েন, প্রাপ্তি, অহংকার আর হতাশার গোলকধাঁধায় পথ হারাচ্ছে। তারা জানে না ভালোবাসা পাওয়া মানেই ভালোবাসা ধরে রাখা নয়; তারা জানে না সম্পদ বা তারুণ্য চিরকাল থাকে না; তারা জানে না জীবনের আঘাত মানেই জীবনের সমাপ্তি নয়। আমার এই দীর্ঘ জীবনের ভুল, শিক্ষা, ধৈর্য ও আত্মসমীক্ষার আলো যদি আমি কলমের ভাষায় তুলে ধরি, তবে তা কি অন্য কারও চলার পথকে আলোকিত করবে না?
মানুষ যখন চারপাশের দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ায় মনে করে তার সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই, কোনো দরজা অবশিষ্ট নেই—তখন সে নিজের ভেতরের শক্তিকে জাগিয়ে তুললে এক বিস্ময়কর সত্য আবিষ্কার করে। সে বুঝতে পারে, অন্যের তৈরি করা দরজার জন্য অপেক্ষা করার তার আর প্রয়োজন নেই; নিজের অর্জিত প্রজ্ঞা আর অভিজ্ঞতা দিয়ে সে নিজেই অন্য মানুষের জন্য একটি খোলা দরজা হয়ে উঠতে পারে, নিজেই হয়ে উঠতে পারে একটি নতুন পথ।
আজ আমার জীবনের খাতাটি আমি নতুন করে খুলছি। শোককে বুকে ধারণ করেই, নিজের অংশের ভুলটুকু বিনীতভাবে স্বীকার করেই, এবং স্রষ্টার দেওয়া প্রতিটি পরীক্ষার প্রতি পূর্ণ আস্থা রেখেই আমার এই নতুন যাত্রার সূচনা। বিকেলের দীর্ঘ ছায়া দেখে যাকে মনে হচ্ছিল ক্লান্ত জীবনের সূর্যাস্ত, নিজের ভেতরের খাঁটি সোনাটুকু চিনে নেওয়ার পর আজ দেখছি—এ তো অবসান নয়, এ আমার জীবনের এক নতুন সূর্যোদয়! দীর্ঘকালের আগুনে পোড়া এই জীবন আর কোনো আক্ষেপের ছাই হয়ে পড়ে থাকবে না—এখন সময় এসেছে তার অর্জিত দ্যুতিটুকু পৃথিবীর কাজে লাগানোর।