
কক্সবাজার জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সন্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত হয় মানবপাচার বিষয়ক মতবিনিময় সভা( আজ দুপুরে)
নিজস্ব প্রতিবেদক, কক্সবাজার
প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১৮: ৫৯
কক্সবাজার উপকূলকে সমুদ্রপথে মানব পাচারের একটি নিরাপদ রুট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। শীত শুরুর আগে, অক্টোবর মাস থেকে বঙ্গোপসাগর শান্ত হয়ে আসায় এ পথে মানব পাচারের ঘটনা বৃদ্ধি পায়। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগে থেকে প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি বলে কক্সবাজারে অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায় বক্তারা জানিয়েছেন।
আজ মঙ্গলবার দুপুরে কক্সবাজার পুলিশ সুপার কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে ‘কক্সবাজারে মানব পাচার ও মানব পাচারসংক্রান্ত বর্তমান প্রেক্ষাপট’ শীর্ষক এই সভা অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি এবং জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থা আইওএম যৌথভাবে এর আয়োজন করে। সভায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আইনজীবী, গণমাধ্যমকর্মী ও বিভিন্ন এনজিওর কর্মকর্তারা অংশ নেন।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও বিচারিক দীর্ঘসূত্রতা
সভায় বক্তারা জানান, কক্সবাজারের বিভিন্ন আদালতে মানব পাচারের ৪৬২টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। বিচারিক কার্যক্রমের দীর্ঘসূত্রতার কারণে অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে এবং পাচারের শিকার পরিবারগুলো মামলা করতে নিরুৎসাহিত হচ্ছে। বক্তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারির পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে সচেতন করার ওপর জোর দেন।
জেলা পুলিশ সুপার মো. সাইফ উদ্দীন শাহীন বলেন, কক্সবাজারে ১৪ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী থাকায় পাচারকারীরা এই অঞ্চলকে মানব পাচারের নিরাপদ জোন হিসেবে বেছে নিয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রোহিঙ্গা নারী ও শিশুরা পাচারের শিকার হচ্ছে। জেলার টেকনাফ, উখিয়া, মহেশখালী, কক্সবাজার সদরসহ ২১টি পয়েন্ট দিয়ে সমুদ্রপথে এই পাচার কার্যক্রম চলে। পুলিশ ও যৌথ বাহিনীর অভিযানে নিয়মিত পাচারকারী ও তাদের শিকার হওয়া লোকজন উদ্ধার হলেও মানব পাচার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না।
সমাধানে করণীয়
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. জসিম উদ্দিন চৌধুরী বলেন, শীতকালে সাগর শান্ত থাকার কারণে মানব পাচার বাড়ে। তিনি এই সমস্যার মূল কারণ ও জড়িতদের চিহ্নিত করার জন্য গবেষণার ওপর জোর দেন। একই সঙ্গে, সাগরের প্রায় ৫ হাজার মাছ ধরার ট্রলারে জিপিআরএস সিস্টেম স্থাপন এবং মাঝিদের অনলাইন ডেটাবেজে যুক্ত করার প্রস্তাব দেন, যা পাচাররোধে কার্যকর হতে পারে।
বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির কর্মকর্তা সাফায়েত বিন কামাল জানান, ২০১২ সাল থেকে ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত ১৩ বছরে কক্সবাজারে ৪৬২টি মামলা হলেও বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, গত বছর জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে ৮৬টি মানব পাচারের ঘটনা ঘটেছে, যার অধিকাংশই রোহিঙ্গা। ২০২৩ সালে সারাদেশে দায়ের হওয়া মানব পাচার মামলার ৪৪ শতাংশই কক্সবাজার জেলার।
আইওএম কক্সবাজারের কর্মকর্তা আরাবি মহিউদ্দিন তাহের বলেন, গত এক বছরে উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে ৬০০টির বেশি মানব পাচারের ঘটনা চিহ্নিত হয়েছে, কিন্তু বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে সেগুলোর মামলা হচ্ছে না। তিনি মামলার দীর্ঘসূত্রতা, আপসরফা এবং সাক্ষীর অভাবকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা প্রত্যাশীর কর্মকর্তা রশীদা খাতুনও দালাল ও পাচারকারীদের আইনের আওতায় আনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
