নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা

বিডিআর হত্যাকাণ্ড তদন্তে জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার জন্য বর্তমান পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলমসহ পাঁচ পুলিশ কর্মকর্তার নাম এসেছে। স্পর্শকাতর ওই প্রতিবেদনে আইজিপির নাম আসার পরই প্রশাসনের ভেতরে নানা আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
প্রতিবেদনে আইজিপির বিরুদ্ধে নেতিবাচক তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। বিশেষ করে পুলিশের বিশেষ শাখায় (এসবি) দায়িত্ব পালনকালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখা এবং বিরোধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সক্রিয় থাকার অভিযোগ উঠে এসেছে বাহারুল আলমের বিরুদ্ধে। এ অবস্থায় তার ভাগ্যে কী হতে পারে—তা নিয়েও চলছে জল্পনা-কল্পনা।
আইজিপির ভবিষ্যৎ
বাহারুল আলমকে কোনো দেশে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়া অথবা তার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল—এ দুই সিদ্ধান্তের যেকোনো একটি হতে পারে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হতে পারে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
বাহারুল আলম বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের ১৯৮৪ ব্যাচের কর্মকর্তা। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০ নভেম্বর পুলিশ বাহিনীতে রদবদলের অংশ হিসেবে বাহারুল আলমকে চুক্তিভিত্তিক চাকরিতে ফিরিয়ে আইজিপির দায়িত্ব দেয় অন্তর্বর্তী সরকার।
তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য
২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহের নামে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ মোট ৭৪ জনকে হত্যা করা হয়। তদন্ত কমিশন গত ৩০ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়।
প্রতিবেদনে বিডিআর হত্যাকাণ্ডে বহিঃশক্তির সরাসরি সম্পৃক্ততা ও তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সরাসরি জড়িত থাকার শক্তিশালী প্রমাণ মিলেছে। বিডিআর হত্যাকাণ্ড পরিকল্পিত এবং এর পেছনে প্রধান সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করেছিলেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সাবেক মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস।
প্রতিবেদনে ১৪৬ নম্বর পয়েন্টে পাঁচজন পুলিশ কর্মকর্তার নাম রয়েছে। তারা হলেন— তৎকালীন আইজিপি নূর মোহাম্মদ, তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার নাইম আহমেদ, তৎকালীন অতিরিক্ত আইজিপি (এসবি প্রধান) বাহারুল আলম, সাবেক (পলাতক) অতিরিক্ত আইজিপি মনিরুল ইসলাম, বিডিআর হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল কাহার আকন্দ এবং তার অধীনস্থ তদন্ত দল।
- তদন্ত কমিশন প্রধানের বক্তব্য: এ বিষয়ে জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশনের প্রধান অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আ ল ম ফজলুর রহমান বলেন, “তদন্তে পাঁচজন পুলিশ কর্মকর্তার নাম এসেছে। তাদের মধ্যে বর্তমান আইজিপি বাহারুল আলমও আছেন।” কেন তাদের নাম এসেছে, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার কারণেই তাদের নাম প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
- আইজিপির বক্তব্য: তদন্ত প্রতিবেদনে নাম আসার ব্যাপারে আইজিপি বাহারুল আলম গণমাধ্যমকে বলেন, “তদন্ত কমিশন তদন্ত করেছে, এখন সরকার যা সিদ্ধান্ত নেওয়ার নেবে। এখানে আমার দেখার বা বলার কিছু নেই।”
শহীদ পরিবারের দাবি ও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার আশ্বাস
শহীদ পরিবারগুলোর পক্ষ থেকে বিডিআর হত্যাকাণ্ডে জড়িত কেউ যেন বিচার থেকে রেহাই না পায়, সে বিষয়ে সরকারের কঠোর ভূমিকা রাখার দাবি জানানো হয়েছে।
মঙ্গলবার (২ ডিসেম্বর) সচিবালয়ে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত কোর কমিটির সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন:
“বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) হত্যাকাণ্ড নিয়ে গঠন করা তদন্ত কমিশনের সুপারিশগুলো অবশ্যই বাস্তবায়ন করা হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এটা খুব সিরিয়াসলি দেখছে।”
শহীদ লেফটেন্যান্ট কর্নেল লুৎফর রহমানের মেয়ে ডা. ফাবলিহা বুশরা বলেন, “আমাদের পূর্ণ আস্থা রয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনের মাধ্যমে সত্য জানতে পারবো। যত দ্রুত সম্ভব তদন্ত প্রতিবেদন যেন জনসম্মুখে প্রকাশিত হয়। কারণ বিডিআর হত্যাকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে জানার অধিকার দেশের সব নাগরিকের রয়েছে।”
সাবেক বিডিআরের (বর্তমান বিজিবি) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদের ছেলে রাকিন আহমেদ ভূঁইয়া বলেন, “এ হত্যাকাণ্ডের বিচার হতেই হবে, আমরা ছাড়বো না। রিপোর্টে যাদের নাম এসেছে তাদের বিরুদ্ধে এখনই ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করতে হবে সরকারকে। মীরজাফরদের বিচার করতে হবে, না হলে আরও একটা পিলখানা হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে।”
