সরকারি সম্পত্তি আত্মসাৎ: ৩য় পর্ব
শেখ মেহেদী হাসান নাদিম

দেওয়ানি আদালতে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের (Specific Relief Act, 1877) ৪২ ধারায় যখন কেউ স্বত্ব ঘোষণার (Title Declaration) জন্য আরজি (Plaint) দাখিল করেন, তখন দেওয়ানি কার্যবিধির (CPC) সুসংহত নীতি অনুযায়ী বাদীকে সম্পূর্ণ ‘পরিষ্কার হাত’ (Clean hands) নিয়ে হাজির হতে হয়। কিন্তু ২০০৫ সালে ময়মনসিংহের গোহাইলকান্দিতে সরকারের কোটি কোটি টাকা মূল্যের ‘খ’ তফসিলভুক্ত অর্পিত সম্পত্তি গিলে খাওয়ার যে মহা-নাটক খালেক মাস্টার সাজিয়েছিলেন, তা আইনি ইতিহাস নয়—এক অভূতপূর্ব রূপকথা!
অন্যান্য দেওয়ানি মামলা নং ২২/২০০৫-এর নথিপত্র এবং ২০১১ সালের ২৪ মার্চ ময়মনসিংহের দ্বিতীয় যুগ্ম জেলা জজ আদালতের তৎকালীন বিজ্ঞ বিচারক মো. জহিরুল কবীরের দেওয়া ঐতিহাসিক রায়টি পাঠ করলে বোঝা যায়, অর্পিত সম্পত্তিকে ব্যক্তিগত সাম্রাজ্যে পরিণত করার এই সার্কাসে আইন, সাক্ষ্য প্রমাণ ও বাস্তবতার কীভাবে ধূলিসাৎ ঘটেছিল!
১৯৬৫ সালের দেশত্যাগ ও ৩৬ বছর পর পৌরসভার ‘প্রেতাত্মা’ সমন!
নথির আইনি সত্য অনুযায়ী, সিএস রেকর্ডের মালিক জোত রাম কুমার আইচ, দং ঈশান চন্দ্র আইচ, প্রসন্ন কুমার আইচ, নবিন চন্দ্র আইচ (সর্ব পিতা: রাম জীবন আইচ), নিত্য সুন্দরী আইচ (জং রাম কুমার আইচ) এবং এসএ রেকর্ডীয় মূল মালিক ছিলেন যোগেশ, নির্মল চন্দ্র, পরিমল চন্দ্র আইচ (সর্ব পিতা: ঈশান চন্দ্র আইচ) এবং অবিনাশ চন্দ্র দত্ত (পিতা: সতিশ চন্দ্র দত্ত) গং। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের সংকটময় মুহূর্তে তারা ভিটেমাটি ছেড়ে ভারতে পাড়ি জমায়। ফলে তৎকালীন পাকিস্তান প্রতিরক্ষা আদেশ (Pakistan Defence Rules, 1965) এবং পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশের অর্পিত ও অবিনাশী সম্পত্তি আইন অনুযায়ী ওই বিপুল সম্পত্তি ‘খ’ তফসিলভুক্ত অর্পিত সম্পত্তিতে পরিণত হয়।
কিন্তু দেওয়ানি আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে খালেক মাস্টার এমন এক অলৌকিক বয়ান হাজির করলেন, যা সাক্ষ্য আইনের (Evidence Act, 1872) সমস্ত মূলনীতিকে বুড়ো আঙুল দেখায়! তিনি দাবি করলেন—ঐ হিন্দু মালিকরা নাকি ভারতমুখীই হননি, বরং ময়মনসিংহে বসেই পরলোক গমন করেছেন! প্রমাণ হিসেবে দাখিল করা হলো ময়মনসিংহ পৌরসভা থেকে সংগৃহীত কয়েকটি মৃত্যুসনদ (যার দাপ্তরিক কোড নাম: ‘প্রদর্শনী-৪ সিরিজ’)।
ঘটনার ব্যবচ্ছেদ করতে গিয়ে বিজ্ঞ বিচারক দেখলেন, ১৯৬৫ সালে ভারতে চলে যাওয়া সনাতন ধর্মাবলম্বী মালিকদের শ্মশানের ছাই থেকে যেন ‘প্রেতাত্মারা’ হেঁটে এসে ৩৬-৩৭ বছর পর ময়মনসিংহ পৌরসভায় নিজেদের মৃত্যুর খবর নথিভুক্ত করিয়ে গেছে! পৌরসভা থেকে কোনো কর্মকর্তা সাক্ষীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে এই আজগুবি সনদের সত্যতা প্রমাণের সাহস পাননি, কোনো মূল রেজিস্ট্রি বইও আদালতে উপস্থাপিত হয়নি।
দেওয়ানি আদালতের বিচারে বিজ্ঞ বিচারক মো. জহিরুল কবীর রায়ে বাদীর এই অলৌকিক দাবিকে কটাক্ষ করে লেখেন:
“বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় প্রায় ৩৬-৩৭ বছর আগে কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর সংবাদ তাঁর পরিবার ছাড়া অন্য কেউ পৌরসভায় গিয়ে জানিয়ে তা রেজিস্ট্রিভুক্ত করেছে—এমন বিষয় আদালতের কাছে সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও বিশ্বাসযোগ্য নয়।”
আদালত চূড়ান্ত বিচারে রায় দেন—সরকারি অর্পিত সম্পত্তি আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে পরবর্তীতে বাদীপক্ষ জাল ও ভুয়া উপায়ে (Antedated / Fabricated) এই মৃত্যুসনদগুলো সৃজন করেছে।
আরজির তথ্য গোপন ও কার্টিজ পেপারের ‘গায়েবী টিপছাপ’
দেওয়ানি কার্যবিধির (CPC) মৌলিক নীতি হলো—আরজিতে কোনো বস্তুগত তথ্য গোপন করা (Suppression of Material Facts) হলে বাদী আদালতের কোনো প্রতিকার পাওয়ার অধিকারী হন না। খালেক মাস্টার তাঁর মূল আরজিতে নালিশি জমির একচ্ছত্র মালিকানা দাবি করলেন, অথচ ভূমির ওপর ডালপালা মেলে দাঁড়িয়ে থাকা ‘গোহাইলকান্দি উচ্চ বিদ্যালয়’ এবং সেখানে নিজের বিন্দুমাত্র দখল না থাকার বিষয়টি সম্পূর্ণ চেপে গেলেন!
বিবাদী সরকারপক্ষ যখন লিখিত জবাবে প্রাঙ্গণে স্কুলের সীমানা ও দখলের তথ্য আদালতে উন্মোচিত করে দিল, তখন খালেক মাস্টার রাতারাতি পল্টি মেরে লিখিত দরখাস্তে দাবি করলেন—তিনি নাকি মহা-দানবীর হয়ে ১৯৮৭ সালেই গোহাইলকান্দি উচ্চ বিদ্যালয়ের জন্য ০.৫২ একর (৫২ শতক) জমি ‘স্বত্বার্পণ দলিল’ বা দানপত্রের মাধ্যমে দিয়ে দিয়েছেন!
বিজ্ঞ আদালত যখন ওই কথিত দানপত্রের সহি-মোহরি নকল (Certified copy) তলব করে পরীক্ষা করলেন, তখন জালিয়াতির চরম হাস্যরসাচ্ছল রূপ ধরা পড়ল। সার্টিফাইড কপির কার্টিজ পেপারের উল্টো পিঠে ছিল অস্পষ্ট কিছু গায়েবী টিপছাপের দাগ, যার সমর্থনে কোনো মূল দলিল বা যৌক্তিক প্রমাণ বাদী দিতে পারেনি।
নথি পরীক্ষা করে বিজ্ঞ বিচারক তাঁর রায়ে সেই কালজয়ী পর্যবেক্ষণটি লিপিবদ্ধ করেন:
“যার দ্বারা সহজে অনুমেয় প্রকৃতপক্ষে এইরূপ কোন দলিলের কোন অস্তিত্ব নাই।”
বিচারকের চূড়ান্ত চাবুক: “মূল জিনিস এড়াইয়া সম্পত্তি গ্রাসের অপচেষ্টা”
সাক্ষ্য-প্রমাণ, ভুয়া আরজি ও নথির পাহাড় ঠেলে জালিয়াতির তাসের ঘর যখন ধসে পড়ল, তখন ময়মনসিংহের দ্বিতীয় যুগ্ম জেলা জজ আদালতের বিজ্ঞ বিচারক মো. জহিরুল কবীর বাদীপক্ষের এই দেওয়ানি অপকৌশলের ব্যবচ্ছেদ করেন।
আইনের মূল নীতি—‘Fraud vitiates everything’ (জালিয়াতি সমস্ত দাবিকে বাতিল করে)। রায়ের ৩য় পৃষ্ঠায় বাদী খালেক মাস্টারের চক্রান্তকে উলঙ্গ করে দিয়ে বিচারক পর্যবেক্ষণে সরাসরি লেখেন:
“বাদী অত্যন্ত সুকৌশলে মূল জিনিস এড়াইয়া সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন মূল্যবান সম্পত্তি গ্রাস করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হইয়া বিভিন্ন কৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন।”
নালিশি তফসিলভুক্ত ভূমিতে বাদীপক্ষের বিন্দুমাত্র আইনি স্বত্ব (Chain of Title) প্রমাণিত না হওয়ায় ২৪ মার্চ ২০১১ তারিখে আদালত চূড়ান্ত আদেশ শোনান:
“অত্র মোকদ্দমা বিবাদীপক্ষের বিরুদ্ধে বিনা খরচায় ডিসমিস হইল।”
২০১১ সালের রায় ও ২০২৬ সালের বাস্তবতা
২০১১ সালের বিচারিক রায়ে ৫২ শতকের কথিত দানপত্রকে ‘অস্তিত্বহীন’ এবং পৌরসভার মৃত্যুসনদকে ‘সৃজিত জাল কাগজ’ ঘোষণা করে সরকারবিরোধী চক্রান্ত ধূলিসাৎ করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আদালতের সেই কড়া চাবুকের পরও অর্পিত সম্পত্তি দখলের প্রশাসনিক নাটক থেমে থাকেনি।
আদালতের রায়ের ১৫ বছর পর, ২০২৬ সালে এসে যখন গোহাইলকান্দি উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলামের অডিও ফোনালাপ সামনে এলো, তখন থলে থেকে বেরিয়ে এলো আরও বিস্ফোরক তথ্য! বিচারিক রায়ে মামলা হারলেও, কীভাবে জালিয়াতির ফাইল পাহারা দেওয়ার জন্য মূল বাদীর বড় ছেলেকেই স্কুলে ‘ভারপ্রাপ্ত জাদুকর’ বানিয়ে রাখা হয়েছে—তা ফুটে ওঠে তাঁর বক্তব্যে।
(চলবে…)