অনুসন্ধানী ধারাবাহিক: ৬ষ্ঠ পর্ব
শেখ মেহেদী হাসান নাদিম

দেওয়ানি আদালতের বারান্দায় বছরের পর বছর মামলা ঝুলিয়ে রেখে অর্পিত সম্পত্তি গ্রাস করার যে মহাকাব্যিক রচনা শুরু করেছিলেন খালেক মাস্টার, তাঁর প্রয়াণের পরও সেই রচনার এক অক্ষরও মুছে যেতে দেয়নি তাঁর উত্তরসূরিরা। পিতৃদেবের রেখে যাওয়া অসম্পূর্ণ মিশনকে পরম আদরে ও নীরবে সামনে টেনে নিয়েছে তারা। গোহাইলকান্দি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ছায়াতলে বসেই চালিয়ে যাচ্ছে সেই একই চক্রান্ত।
তবে দেওয়ানি আদালতের চতুর আইনজীবীদের মুখে আজ একটি কথা বারবার ঘুরছে—“আজ খালেক মাস্টার বেঁচে থাকলে অন্তত আদালতে গিয়ে এমন আত্মঘাতী কাঁচা কাজ করতেন না!”
যে লোক সারাজীবন আইনি মারপ্যাঁচ আর দাপ্তরিক ফাঁকফোকর গলে জমি দখলের খেলা খেলে গেছেন, তিনি কখনো দেওয়ানি কার্যবিধির ২৩ আদেশের ১ নম্বর নিয়ম অনুযায়ী লিখিতভাবে “আমাদের উদ্দেশ্য সফল হইয়াছে” বাক্যটি বসিয়ে নিজের জালিয়াতির ঐতিহাসিক প্রমাণ আদালতে তুলে দিতেন না। পিতৃদেবের সেই চতুরতা আর ধারালো বুদ্ধির অভাবই উন্মোচিত করেছে উত্তরসূরিদের এই আনাড়ি পদক্ষেপ, যা জালিয়াতির জেনারেশনাল গ্যাপকে (Generational Gap) একদম নগ্নভাবে ফুটিয়ে তুলেছে!
প্রাতিষ্ঠানিক উত্তরাধিকার ও নীরবে ফাইল সামলানোর খেলা
দেওয়ানি জালিয়াতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট বোঝা যায়, অপরাধ যখন বংশানুক্রমিক প্রথায় রূপ নেয়, তখন তার চরিত্র হয় আরও নীরব ও কৌশলী।
খালেক মাস্টারের উত্তরসূরিরা রাজপথে কোনো শোরগোল তোলেনি। তারা খোদ সেই প্রতিষ্ঠানের ভেতরেই নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে, যে প্রতিষ্ঠানের জমি দখল করাই তাদের আসল লক্ষ্য:
- স্বার্থের চরম সংঘাত (Conflict of Interest): মূল অভিযুক্তের জ্যেষ্ঠ পুত্র বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের গদিতে বসে পুরো প্রতিষ্ঠানের স্থাবর সম্পত্তি ও আদালতের ফাইল পাহারা দিয়েছে।
- কমিটি গঠনে বাধা: গত কয়েক বছর ধরে তারা বিদ্যালয়ে কোনো পূর্ণাঙ্গ নির্বাচিত পরিচালনা কমিটি গঠন করতে দেয়নি। কেবল একটি ‘এডহক কমিটি’র আবরণ রেখে বিদ্যালয়ের জমি রক্ষার বিষয়টি দাপ্তরিকভাবে চেপে রেখেছে।
- নথি আটকে রাখা: আদালতের মামলা পরিচালনার সুযোগ নিয়ে তারা বিদ্যালয়ের নিজস্ব রেকর্ডপত্র এবং ২০১২ সালের অর্পিত সম্পত্তি সংক্রান্ত মূল নথি গোপন রেখেছে।
“কর্তা থাকলে এই আত্মঘাতী স্বীকারোক্তি দিতেন না!”
ভূমি অফিসে চক্রান্তের জাল বিছিয়ে বিদায়ী এসিল্যান্ডের আমলে ৬টি নামজারি খতিয়ান বাগিয়ে নেওয়ার পর, আনন্দে আত্মহারা হয়ে উত্তরসূরিরা আদালতে যে লিখিত দরখাস্তটি দাখিল করেছে—সেখানেই বেরিয়ে এসেছে এই জেনারেশনাল গ্যাপ।
খালেক মাস্টার ছিলেন দেওয়ানি আইনের ঝানু খেলোয়াড়। তিনি খুব ভালো করেই জানতেন—আদালতের খাতায় কোনো বাক্য লেখা হলে তা চিরদিনের জন্য নথিভুক্ত হয়ে যায়। তিনি হয়তো মামলা বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রাখতেন, কিন্তু তাড়াহুড়ো করে “আমাদের উদ্দেশ্য সফল হইয়াছে” লিখে আদালতে নিজেদের জালিয়াতি প্রমাণের সুযোগ নিজ হাতে তৈরি করতেন না।
উত্তরসূরিদের এই অপক্ক উল্লাসই আজ জালিয়াতির কফিনে সবচেয়ে বড় দাপ্তরিক প্রমাণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা ভেবেছিল মামলা প্রত্যাহার করে কেটে পড়লেই সব শেষ! কিন্তু আইনি পরামর্শকের চতুর খসড়ার ফাঁদে পড়ে তারা এমন এক আত্মঘাতী দলিলে সই ঠুকে দিয়েছে, যা হাইকোর্ট থেকে শুরু করে নিম্ন আদালত—প্রতিটি আইনি লড়াইয়ে আজ তাদের বিরুদ্ধে প্রধান অস্ত্র।
অর্পিত সম্পত্তির আইনি দেয়াল ও হাইকোর্টের নির্দেশ
পিতৃদেবের শেখানো পথ ধরে এই দেওয়ানি মহাকাব্য তারা যত সগৌরবেই টেনে নিক না কেন, বিচারিক নথির সামনে এসে এখন সব থমকে গেছে।
- হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ: দেওয়ানি আপিল থেকে যে প্রত্যাহারনামা দিয়ে তারা পার পেতে চেয়েছিল, মহামান্য হাইকোর্টের সিভিল রিভিশন (নং ৩২১৮/২০২৬)-এ সেই প্রত্যাহার আদেশের ওপর ইতিমধ্যেই স্থগিতাদেশ এসেছে।
- অর্পিত সম্পত্তির স্থায়িত্ব: ২০১২ সালের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী জমিটি যে অর্পিত সম্পত্তি, বংশানুক্রমিক কোনো ভুয়া নামজারি দিয়ে তার আইনি চরিত্র বদলানো অসম্ভব।
পিতৃদেবের অসমাপ্ত দেওয়ানি মহাকাব্য এগিয়ে নেওয়ার আনন্দে উত্তরসূরিরা সাময়িকভাবে হাসলেও, আদালতে নিজ হাতে জমা দিয়ে আসা ওই আত্মঘাতী লিখিত স্বীকারোক্তিই এখন প্রমাণ করছে—চক্রান্ত যত সূক্ষ্মই হোক, দেওয়ানি আইনের বিচারিক কাঠগড়ায় তা একদিন না একদিন নিজ মুখেই ধরা দেয়!
(চলবে…)