আমি অভিমানী চির-ক্ষুব্ধ হিয়ার কাতরতা, ব্যথা সুনিবিড়
তারেক খান

অমনি শেষ হওয়ার তো কথা নয়! যে গল্পের প্রতিটি লাইন রাজপথের তপ্ত পিচে ছিটকে পড়া রক্তবিন্দু আর বারুদের গন্ধে লেখা, সে গল্পের উপসংহার কি এত সহজে টানা যায়?
বিশ বছরের সংগ্রাম ও রাজপথের রক্তঋণ
বিশটি বছর! যখন এদেশের আকাশ-বাতাস শ্বাসরুদ্ধকর অন্ধকারে ডুবে ছিল, তখন নাজিম উদ্দিন আলমের মতো মানুষেরা শৃঙ্খল ভাঙার গান বুকে নিয়ে রাজপথে নেমেছেন। পুলিশের শটগানের ছররা গুলি আর টিয়ারশেলের আঘাতে ক্ষতবিশত হয়েছে শরীর, রাজপথ ভিজেছে রক্তে, তবু পিছু হটেননি। আমরা দেখেছি, সেই রক্তাক্ত শরীর নিয়ে, মৃত্যুকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তাঁরা কীভাবে অধিকার আদায়ের জয়গান গেয়েছেন।
বিজয়ের আলোয় উপেক্ষিত লড়াকু সৈনিকেরা
আর আজ? যখন কাঙ্ক্ষিত ভোরের সূর্য উঠল, যখন স্বাধীন বাতাসে উড়ল বিজয়ের নিশান, তখন উৎসবের আলোকসজ্জায় তাঁদের আর দেখা গেল না! প্রথম সারির সুসজ্জিত ভোজনালয়ে যখন চারপাশ মুখরিত, তখন যাঁদের ঘাম আর রক্তে কেনা এই বিজয়—তাঁদের ঠাঁই হলো না! এ অভিমান কোনো ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট পাওয়ার কাঙালপনা নয়। এ অভিমান একবুক নিঃস্বার্থ ভালোবাসার, দীর্ঘদিনের লালিত এক পবিত্র অধিকারের। যে মানুষগুলো বুলেটের সামনে পাহাড়ের মতো অটল ছিল, আপনজনের এই নিদারুণ অবহেলায় আজ তাদের বুকের ভেতরটা নীরবে দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে।
আধুনিক রাজনৈতিক মঞ্চ ও মহানায়কের ভূমিকা
কিন্তু আমি তারেক খান, আজ এই কলমে কোনো আক্ষেপের প্রলেপ মাখাবো না। ছোট ভাই নাদিম যখন বর্তমান রাজনীতির এই নির্মম অথচ সুদূরপ্রসারী ছকের কথা শোনাল, তখন আমার চোখের সামনের বাষ্পীভূত পর্দাটা সরে গেল। নাদিম খুব স্পষ্ট করেই আমার মনের সংশয় দূর করে বলল— “ভাই, বর্তমান রাজনৈতিক মঞ্চটা একেবারেই আধুনিক তাত্ত্বিক! সহজ করে বলি—ওপেনিংয়ে নামা ব্যাটসম্যানরা যদি আজ হাততালির মোহে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তবে আমাদের মহানায়ক কিন্তু ব্যক্তি স্বার্থকে মুকুট হিসেবে ধরে রেখে নিশ্চুপ বসে থাকবেন না।”
নাদিমের এই অমোঘ উপমা শুনে নজরুলের সেই ‘বিদ্রোহী’ কবিতার প্রলয়নাচন মনে পড়ে গেল। আমাদের মহানায়ক তো এমনই—প্রয়োজনে সব ব্যর্থতার ছক তিনি চূর্ণ করে দেবেন:
“আমি দুর্বার,
আমি ভেঙে করি সব চুরমার!
আমি অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খল,
আমি দলি যাই যত বন্ধন, যত নিয়ম কানুন শৃঙ্খল!”
তারেক রহমান: নির্বাসনের আগুন থেকে পোড়া খাঁটি সোনা
সূচনালগ্নে নামা যোদ্ধারা যদি আজ ফুলেল শুভেচ্ছার বন্যায় নিজেদের শেকড় ভুলে যায়, তবে আমাদের মহানায়ক, আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সেই পুরোনো ছক ভেঙে তছনছ করে দেবেন। তিনি তো কোনো কাগুজে বাঘ নন! তিনি সেই মৃত্যুঞ্জয়ী সত্তা, যিনি নিজের ধ্বংসস্তূপ আর দীর্ঘ নির্বাসনের আগুন থেকে পুড়ে খাঁটি সোনা হয়ে ফিরে এসেছেন।
বয়সের খতিয়ানে আমি হয়তো তাঁর চেয়ে কয়েক সপ্তাহের বড় হবো। কিন্তু জীবনের যে নিষ্ঠুর দাবদাহ তাঁকে সইতে হয়েছে, যে পরিমাণ বিষ পান করে তিনি আজ নীলকণ্ঠ—তাতে তিনি আজ বয়সের সীমানা পেরোনো এক মহীরুহ। সৃষ্টিকর্তা যেন নিজের হাতে তাঁকে একখণ্ড সাধারণ লোহা থেকে পুড়িয়ে, পিটিয়ে, গলিয়ে ইস্পাতের তরবারিতে পরিণত করেছেন। তাঁর সেই প্রজ্ঞাবান চোখের দিকে তাকালে স্পষ্ট দেখা যায়—সেখানে কোনো রাজমুকুটের লোভ নেই, কোনো মসনদের মোহ নেই। সেখানে আছে কেবল ৫৬ হাজার বর্গমাইলের এক মানচিত্র, আর এদেশের মানুষের মুক্তির এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা।
ত্যাগের জয় ও মহাকালের নিখুঁত বিচার
তাই আমার আর কোনো সংশয় নেই। আলমের মতো হাজারো মুক্তিকামী সূর্যসন্তান, যাঁরা আজও নীরবে নিজেদের ক্ষরণ মুছছেন আর অভিমান বুকে চেপে দূরে দাঁড়িয়ে আছেন—তারেক ভাই তাঁদের ঠিকই যোগ্য মর্যাদায় বুকে টেনে নেবেন। কারণ যে নেতা নিজে রক্তক্ষরণের মর্ম বোঝেন, তিনি কখনো সহযোদ্ধার রক্তের ঋণ ভুলতে পারেন না।
অপেক্ষা করুন কেবল আর কিছুটা প্রহর। এই অভিমানের ঘন মেঘ কেটে যে রৌদ্রোজ্জ্বল দিন আসবে, সেখানে এই জীবন বাজি রাখা অপরিসীম ত্যাগেরই জয় হবে। কারণ, সাময়িক ইতিহাস হয়তো কখনো কখনো অন্ধ হয়, কিন্তু মহাকালের বিচার বড়ই নিখুঁত!
