প্রবাসফেরত মানুষের কাছে আশার আলো ‘রেইজ’ প্রকল্প

মো: মাসুদ মিয়া

করোনা মহামারির ধাক্কায় ২০২০ সালে যখন বিশ্বের শ্রমবাজার বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন হাজারো বাংলাদেশি প্রবাসী কর্মী নিঃস্ব অবস্থায় দেশের মাটিতে ফিরে আসেন। হঠাৎ আয়ের উৎস হারিয়ে পরিবারের মুখে খাবার তুলে দেওয়াই কঠিন হয়ে পড়ে অনেকের। এমনই পরিস্থিতিতে দেশে ফেরেন রুবেল মিয়া (ছদ্মনাম)। বিদেশে সব হারিয়ে বেকারত্ব ও হতাশার মাঝে দিন কাটছিল তার। ঠিক তখনই তিনি জানতে পারেন সরকারের প্রবাসী কল্যাণ সেন্টারের ‘রেইজ’ প্রকল্পের কথা। নিয়মিত রেজিস্ট্রেশন শেষে এক মাসের ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে তিনি নতুন করে কর্মজীবনে ফিরতে সক্ষম হন। রুবেলের মতে, “রেইজ প্রকল্পের সহায়তা না পেলে হয়তো আজ আমি পথে বসতাম।” তার মতো আরও হাজারো প্রবাসফেরত মানুষের কাছে এই প্রকল্প এখন আশার আলো হয়ে উঠেছে।

রেইজ প্রকল্পের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

‘রিকভারি অ্যান্ড অ্যাডভান্সমেন্ট অব ইনফরমাল সেক্টর এমপ্লয়মেন্ট (রেইজ)- রিইন্টিগ্রেশন অব রিটার্নিং মাইগ্রেন্টস’ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হলো বিদেশফেরত অভিবাসীদের যথাযথ সহায়তা দিয়ে পুনর্বাসন ও আত্মনির্ভরশীল করে তোলা। এই প্রকল্পের আওতায় বিমানবন্দরে প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক সহযোগিতা, ওয়েজ আর্নার্স সেন্টারে আবাসন, আইনি সহায়তা, বীমা সুবিধা, শিক্ষা ভাতা, চিকিৎসা সহযোগিতা এবং মৃত কর্মীর পরিবারকে আর্থিক সহায়তাসহ মোট আটটি গুরুত্বপূর্ণ সেবা প্রদান করা হয়।

রেমিট্যান্সের উচ্চলম্ফন ও অন্তরালের বাস্তবতা

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অভিবাসী কর্মীদের অবদান অনস্বীকার্য। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসেই (জুলাই-নভেম্বর) প্রবাসীরা ১৩.৪ বিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছেন, যা গত বছরের তুলনায় ১৭ শতাংশ বেশি। রেমিট্যান্স আহরণে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম দেশ। তবে এই সাফল্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক কঠিন বাস্তবতা। আমাদের দেশের অধিকাংশ কর্মী অদক্ষ বা স্বল্পদক্ষ অবস্থায় বিদেশে যান। ফলে তাঁরা কায়িক পরিশ্রমের কাজে যুক্ত থাকেন এবং পাকিস্তানের মতো দক্ষ কর্মী পাঠানো দেশের তুলনায় কম রেমিট্যান্স আয় করেন। এছাড়া অবৈধ পথে সমুদ্র পাড়ি দেওয়া বা বিএমইটি কার্ড ছাড়া বিদেশে যাওয়ার ফলে অনেকেই পুলিশের হাতে আটক হয়ে নিঃস্ব হয়ে দেশে ফেরেন।

প্রত্যাগতদের পাশে রাষ্ট্র: রেইজ-এর ভূমিকা

‘প্রত্যাগত অভিবাসী, ফিরে এলেও পাশে আছি’—এই চেতনা নিয়ে রেইজ প্রকল্প প্রবাসফেরত কর্মীদের সম্মানজনক কর্মসংস্থানে ভূমিকা রাখছে। বিএমইটি কার্ডধারী মৃত কর্মীর পরিবার পাচ্ছে ৩ লাখ টাকা এককালীন অনুদান। শিশুদের শিক্ষাবৃত্তি, ফ্রি অ্যাম্বুলেন্স ও আইনি সহায়তার পাশাপাশি নারী কর্মীদের জন্য বিউটি পার্লার ও সেলাইয়ের মতো উদ্যোক্তা তৈরির প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। ২০২৫ সালের ১৪ আগস্ট অনুমোদিত “প্রত্যাগত অভিবাসীকর্মী পুনঃএকত্রীকরণ নীতি ২০২৫”-এর মাধ্যমে এই উদ্যোগকে আরও টেকসই করা হয়েছে।

ময়মনসিংহ ও দেশের অগ্রযাত্রা

রেইজ প্রকল্পের আওতায় দেশের ৩৫টি জেলায় ওয়েলফেয়ার সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে ময়মনসিংহ প্রবাসী কল্যাণ সেন্টার ইতোমধ্যে ৭ হাজার ২২৯ জন অভিবাসীর রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করেছে, যার মধ্যে ১,৯৯৩ জনকে কাউন্সেলিং দিয়ে কর্মসংস্থানে রেফার করা হয়েছে। সারাদেশে ২ লাখ ২৫ হাজার ২৯৩ জন কর্মী ইতোমধ্যে এই প্রকল্পের সুবিধা গ্রহণ করেছেন এবং প্রত্যেকে পাচ্ছেন ১৩,৫০০ টাকা করে আর্থিক প্রণোদনা।

উপসংহার

রেইজ প্রকল্প শুধু একটি সাহায্য কর্মসূচি নয়; এটি প্রবাসীদের আত্মসম্মান ফিরে পাওয়ার একটি রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি। বিদেশে থেকে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখা এই যোদ্ধারা দেশে ফিরে যেন অসহায় বোধ না করেন—এটাই প্রকল্পের মূল বার্তা। রাষ্ট্র ও জনগণের যৌথ প্রচেষ্টায় রেইজ প্রকল্প হতে পারে হাজারো অভিবাসীর নতুন জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়ের প্রবেশদ্বার।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *