পর্ব – ১
আশরাফুল ইসলাম (সাবেক এডিশনাল আইজিপি)

ঝুম বৃষ্টির এক রাতে আপনার যুবতী মেয়েটি টিউশনি থেকে ফিরতে দেরি করছে। রাস্তার মোড়ে পুলিশের গাড়ি দেখে আপনার বুকটা আতঙ্ক ভয়ে হিম হয়ে গেল না; বরং আপনি দৌড়ে গিয়ে বললেন, ‘ভাই, আমার মেয়েটা এখনো ফেরেনি।’ আর সেই পুলিশ সদস্যটি নিজের ছোট বোনের মতো আপনার সন্তানকে নিরাপদে ঘরে পৌঁছে দিয়ে গেলেন! ভাবুন তো, একজন ধর্মভীরু রিকশাচালক বা অসহায় কৃষক কোনো তদবির বা ঘুষের ভয় ছাড়াই থানায় ঢুকে ওসির সামনে বসে নিজের কষ্টের কথা বলছেন, আর ওসি পরম মমতায় তাঁর চোখের জল মুছে দিচ্ছেন!
ইতিহাসের ধূলিসধূসরিত পাতা
ইতিহাসের ধূলিসধূসরিত পাতায় চোখ পাতলে আজও মেলে মধ্যযুগের সুবাহ বাংলার নিস্তব্ধ রাতের এক স্নিগ্ধ পদধ্বনি। তখন সম্রাট আকবরের শাসনকাল। আবুল ফজলের ‘আইন-ই-আকবরী’ গ্রন্থে যে ‘কোতোয়াল’ বা নগররক্ষীর বিবরণ মেলে, তিনি কেবল রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী ছিলেন না; তিনি ছিলেন নগরবাসীর নিদ্রাহীন অভিভাবক, সমাজের হৃদস্পন্দন। কোন গৃহস্থের ঘরে সন্ধ্যায় চুলা জ্বলেনি, কোন ক্লান্ত মুসাফির পথ হারিয়ে গাছতলায় বসে আছে, কিংবা কার আঙিনায় অন্ধকারের পা পড়েছে—তার পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব রাখা এবং প্রতিকার করাই ছিল কোতোয়ালের ইবাদততুল্য ধর্ম। কারও ঘরে চুরি হলে এবং সেই সম্পদ উদ্ধার করতে ব্যর্থ হলে কোতোয়ালকে নিজের কোষাগার থেকে তার ক্ষতিপূরণ দিতে হতো। মানুষ তখন রক্ষীকে দেখে ভয়ে কুঁকড়ে যেত না; বরং গভীর রাতে কোতোয়ালের হাতে থাকা প্রদীপের আলো দেখে পরম নির্ভরতায় মা তার শিশুকে বুকে জড়িয়ে ঘুমাতে যেতেন। শাসক ও শাসিতের মাঝখানে কোতোয়াল ছিলেন মমতার এক অবিচ্ছেদ্য সেতু।
ব্রিটিশ রাজত্ব ও কর্নওয়ালিস কোড
কিন্তু বাংলার সেই চিরায়ত, মাটির গন্ধমাখা নিরাপত্তা ব্যবস্থায় প্রথম বিষাক্ত ঘবসটি আসে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে। পলাশীর ট্রাজেডির পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অবাধ লুণ্ঠনে বাংলায় নেমে আসে ধিয়াতরের মন্বন্তর। ক্ষুধার মানুষ ও বিখ্যাত পাইক-বরকন্দাজরা যখন ‘ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ’ গড়ে তুলে ইংরেজ কুঠির ভিত কাঁপিয়ে তুলল, তখন শক্তি লর্ড কর্নওয়ালিস ১৭৯৩ সালে প্রবর্তন করলেন দুই মারনাস্ত্র—‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ বা জমিদারি প্রথা এবং কুখ্যাত ‘কর্নওয়ালিস কোড’। একদিকে তৈরি হলো নিপীড়ক জমিদার শ্রেণি, অন্যদিকে প্রজাদের ঘাম ও রক্ত দিয়ে রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করতে চিরতরে গলা টিপে হত্যা করা হলো আকবরী আমলের সেই জনবান্ধব কোতোয়ালি ব্যবস্থাকে। কোতোয়ালের হাত থেকে কেড়ে নেওয়া হলো সেবার প্রদীপ, আর নতুন সৃষ্টি হওয়া ‘দারোগার’ হাতে তুলে দেওয়া হলো প্রজা দমনের চাবুক।
১৮৬১ সালের পুলিশ আইন
কফিনে শেষ পেরেকটি টোকা হয় ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ বা সিপাহী বিপ্লবের পর। এ দেশের মানুষ যেদিন আজাদির নেশায় গর্জে উঠল, ব্রিটিশ রাজসিংহাসন সেদিন আতঙ্কে কেঁপে উঠেছিল। বিদ্রোহের আগুন নিভতেই ব্রিটিশরা বুঝে গেল, এ দেশের মানুষকে চিরকাল পদানত রাখতে হলে এমন এক পুলিশ বাহিনী চাই, যা হবে জনগণ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন, নির্মম ও আধা-সামরিক। সেই কুৎসিত দর্শন থেকেই জন্ম নিল ১৮৬১ সালের পুলিশ আইন। আয়ারল্যান্ডের বিদ্রোহ দমনের নিষ্ঠুর মডেল অনুকরণে তৈরি এই আইনের মূল মন্ত্র ছিল—পুলিশ জনগণের বন্ধু হবে না, পুলিশ হবে শাসকের অন্ধ আজ্ঞাবাহ লাঠিয়াল, যারা প্রভুর নির্দেশে নিজের ভাইয়ের বুকে গুলি চালাতেও দ্বিধা করবে না।
মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার পরের বাস্তবতা
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর ব্রিটিশরা চলে গেল, কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী সযত্নে রেখে দিল ১৮৬১ সালের সেই ঔপনিবেশিক শেকল। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে অধিকারের প্রতিটি সংগ্রামে বাঙালির বুকে নেমে এল সেই পুরোনো নিপীড়ন। অথচ কী আশ্চর্য বৈপরীত্য! ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের কালরাতে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের বাঙালি পুলিশ সদস্যরাই তাঁদের সাধারণ থ্রি-নোট-থ্রি রাইফেল নিয়ে আধুনিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধের আগুন জ্বাললেন। নিজেদের বুকের তাজা রক্ত ঢেলে তাঁরা ধুয়ে মুছে সাফ করে দিলেন দুই বছরের ঔপনিবেশিক কলঙ্ক। দেশের মানুষ বুঝতে পারল, ঔপনিবেশিক ‘ফোর্স’ নয়, এবার গড়ে তুলতে হবে স্বাধীন দেশের ‘জনগণের পুলিশ’।
ক্ষমতার মসনদে যারাই বসলেন, তাঁরা আবিষ্কার করলেন—জনবান্ধব পুলিশের চেয়ে ১৮৬১ সালের সেই প্রযুক্ত, শৃঙ্খলিত পুলিশেই ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ হাতিয়ার। দশকের পর দশক ধরে পুলিশকে ব্যবহার করা হলো রাজনৈতিক দাবার ঘুঁটি হিসেবে।
দলীয় রাজনীতির বিষবাষ্প ও চেইন অব কমান্ডের পতন
কিন্তু সবচেয়ে ভয়াবহ আঘাতটি এল তখন, যখন সংকীর্ণ দলীয় রাজনীতির বিষবাষ্প ঢেলে দেওয়া হলো খোদ বাহিনীর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলার পবিত্র গর্ভগৃহতে। পুলিশ তো কেবল একটি চাকরি নয়, পুলিশ এক দুর্তেদ্য চেইন অব কমান্ড—যেখানে জ্যেষ্ঠের প্রতি কনিষ্ঠের সামরিক আদব-কায়দা, সম্মান এবং পেশাগত মেরুদণ্ড ছিল বাহিনীর আত্মমর্যাদা। অথচ দলীয় আনুগত্য নিশ্চিত করতে গিয়ে একদা নির্দ্বিধায় জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের টপকে, নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে তৈরি করা হলো তথাকথিত ‘৭১ সুর্যসন্তান’-এর মতো চরম বিতর্কিত অধ্যায়। মেধা, ত্যাগ আর যোগ্যতার মুখে চুনকালি মেখে যখন কনিষ্ঠদের বসিয়ে দেওয়া হলো জ্যেষ্ঠদের মাথার ওপর, ঠিক তখনই ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল পুলিশের শতবর্ষের চেইন অব কমান্ড ও অভ্যন্তরীণ আদব-কায়দার সংস্কৃতি। একজন অভিজ্ঞ ও যোগ্য সিনিয়র কর্মকর্তা যখন নিজের জুনিয়রের কাছে দলীয় প্রভাবের কারণে মাথা নত করতে বাধ্য হলেন, সেদিন শুধু একজন ব্যক্তির অপমান হয়নি—সেদিন পুলিশের প্রাতিষ্ঠানিক আত্মসম্মান ও শৃঙ্খলার অপমৃত্যু ঘটেছিল। বাহিনীর ভেতরে তৈরি হলো চাটুকারিতার এক বিষবৃক্ষ; মেধা ও সততা সেখানে নির্বাসনে গেল, আর পুরষ্কৃত হতে লাগল অন্ধ দলীয় দাসত্ব।
এলিট ফোর্স ‘র্যাব’ ও ক্রসহফায়ারের সংস্কৃতি
এরই ধারাবাহিকতায় অপরাধ দমনের নামে একসময় জন্ম হলো এলিট ফোর্স ‘র্যাব’-এর। শুরুর দিকে তাৎক্ষণিক সাফল্যের মোহে মানুষ হাততালি দিল, ধীরে ধীরে এই ব্যবস্থা গোটা পুলিশ সংস্কৃতিকেই এক ভয়ঙ্কর খাদের কিনারے দাঁড় করিয়ে দিল। চেইন অব কমান্ড ক্ষতবিক্ষত হওয়ার পর যে পুলিশিং মানসিকতা তৈরি হয়েছিল, সেখানে ধৈর্য ধরে তদন্ত, আইনের শাসন ও অপরাধীকে সংশোধনের চিরাচরিত দর্শনের জায়গা দখল করে নিল শর্টকাট ‘ক্রসফায়ার’ আর ভয়ের সংস্কৃতি। মানুষ পুলিশকে শ্রদ্ধা করার বদলে ভয় পেতে শুরু করল, আর পুলিশও জনগণের কোল থেকে ছিটকে গিয়ে আশ্রয় নিল অস্ত্রের শীতল ছায়ায়।
২০০৭ সালের পুলিশ অধ্যাদেশের ব্যর্থতা
অথচ এই অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসার এক সুবর্ণ সুযোগ এসেছিল ২০০৭ সালে। দীর্ঘ আত্মালোচনা ও মেধা খাটিয়ে প্রীতীয় হয়েছিল ‘পুলিশ অধ্যাদেশ ২০০৭’-এর খসড়া। কথা ছিল ১৮৬১ সালের সেই আইনকে জাদুঘরে পাঠিয়ে একটি স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন করা হবে, চেইন অব কমান্ডকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করে মেধার ভিত্তিতে সাজানো হবে এবং পুলিশ চলবে কেবল আইনের শাসনে, কোনো রক্তচক্ষুর ইশারা নয়। কিন্তু অদৃশ্য আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আর ক্ষমতার লোভের কাছে পরাজিত হয়ে সেই ঐতিহাসিক উদ্যোগটি সচিবালয়ের অন্ধকার ফাইলবন্দী হয়ে নীরবে নিঃশ্বাস ত্যাগ করল।
আমাদের হাহাকার ও ফিনিক্স পাখির মতো জাগরণ
আজ যখন নিভুতে নিজের এই পোশাকটির দিকে তাকাই, বুকটা এক অব্যক্ত হাহাকারে দুমড়ে-মুচড়ে ওঠে। আমরা কী হারিয়েছি, তা কি কখনো ভেবে দেখেছি? যদি ১৯১৭ কিংবা ১৮৬ই (১৮৬১) আমাদের শেকড় ছিঁড়ে না ফেলত, যদি দলীয় স্বার্থে সিনিয়র-জুনিয়রের সেই পবিত্র শৃঙ্খলাকে ক্ষতবিক্ষত না করা হতো, আর ২০০৭-এর সংস্কার যদি আলোর মুখ দেখত—তবে আজ আমাদের এই প্রিয় স্বদেশ কেমন হতো?
বিশ্বাস করুন, খাকি পোশাকের ভেতরে থাকা মানুষটিও এই দেশের কোল-দুঃখী কৃষকের সন্তান, কোনো সাধারণ মধ্যবিত্ত বাবার আদরের ধন। সে-ও চায় মানুষ তাকে দেখে ঘৃণা বা ভয়ে মুখ ফিরিয়ে না নিয়ে ভালোবেসে বুকে জড়িয়ে ধরুক। একটি পচে যাওয়া শতবর্ষী ব্যবস্থা আর অপরাধনীতির বলি হয়ে আজ পুলিশ ও জনগণ উভয়েরই রক্তাক্ত, উভয়েই নিঃস্ব। আমরা আমাদের সেই চিরচেলো কোতোয়ালকে হারিয়েছি, হারিয়েছি আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক সৌন্দর্য ও আল্লার আত্মীয়কে। কিন্তু এই শোকগাথাই আমাদের শেষ গন্তব্য হতে পারে না। এই ধ্বংসস্তূপ থেকেই ফিনিক্স পাখির মতো আমাদের আবারও জেগে উঠতে হবে।