অবৈধ বালু উত্তোলনে ঝুঁকিতে ছোট ধলী ব্রিজ: দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বিচ্ছিন্ন হতে পারে যোগাযোগ ব্যবস্থা

মোহাম্মদ উল্যা, নোয়াখালী জেলা প্রতিনিধি

নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ ও ফেনীর সোনাগাজী সীমান্তবর্তী ছোট ফেনী নদীর ওপর নির্মিত ‘ছোট ধলী ব্রিজ’ বর্তমানে চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। স্থানীয় এক শ্রেণির বালু খেকো চক্রের দীর্ঘদিন ধরে চালানো অবৈধ বালু উত্তোলনের ফলে সেতুর নিচের অংশে মারাত্মক ভাঙন ও মাটির ক্ষয় সৃষ্টি হয়েছে। এতে যেকোনো মুহূর্তে সেতুটি ধসে পড়ে দুই অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

জানা যায়, মুসাপুর বাংলাবাজার সংলগ্ন ছোট ফেনী নদীর ওপর ২০১৭ সালে নোয়াখালী সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের তত্ত্বাবধানে প্রায় ৩ কোটি ১৭ লাখ টাকা ব্যয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ সেতুটি নির্মাণ করা হয়। ‘রানা কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড বিল্ডার্স লিমিটেড’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এর নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে। উদ্বোধনের পর থেকেই স্থানীয় জনগণের যাতায়াত, উৎপাদিত কৃষিপণ্য পরিবহন ও আঞ্চলিক যোগাযোগ সহজ করতে সেতুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

পিলারের আশপাশ থেকেও তোলা হচ্ছে বালু

স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সেতু নির্মাণের পর থেকেই একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে নদীর বিভিন্ন স্থান থেকে ড্রেজার বসিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন শুরু করে। এমনকি সেতুর মেইন পিলারের একদম আশপাশ থেকেও আইন অমান্য করে বালু উত্তোলন করা হয়েছে। যার ফলে পিলারের মূল ভিত্তির (ফাউন্ডেশন) নিচের মাটি সরে গিয়ে পুরো কাঠামোটিই এখন নড়বড়ে হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে।

সোমবার (১৮ মে ২০২৬) সরেজমিনে এলাকায় খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, ড্রেজার দিয়ে বালু তোলার কারণে নদীর তলদেশে বিভিন্ন স্থানে বিশালাকার গভীর গর্ত ও মাটির ভয়ংকর ক্ষয়ের চিহ্ন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। স্থানীয়দের মতে, বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই যদি দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয়, তবে পাহাড়ি ঢল ও নদীর তীব্র স্রোতে সেতুর স্থায়িত্ব মারাত্মকভাবে ধসে পড়বে।

বাড়ছে ‘স্কাওরিং’ বা তলদেশ ক্ষয়ের ঝুঁকি

নদী ও প্রকৌশল বিশেষজ্ঞদের মতে, নদী তীরবর্তী এলাকায় নির্মিত সেতুর স্থায়িত্ব অনেকাংশে নির্ভর করে নদীর তলদেশের স্বাভাবিক ভারসাম্যের ওপর। যখন সেতুর পিলারের আশপাশ থেকে নির্বিচারে বালু উত্তোলন করা হয়, তখন টেকনিক্যাল ভাষায় যাকে “স্কাওরিং” (Scouring) বা তলদেশ ক্ষয় বলা হয়, তার ঝুঁকি জ্যামিতিক হারে বাড়ে। এটি সেতুর ভিত্তিকে ভেতর থেকে ফাপা ও দুর্বল করে দেয়, যা দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের অবকাঠামোগত বিপর্যয় ও জানমালের ক্ষতি ডেকে আনতে পারে।

এই বিপর্যয় রুখতে জরুরি ভিত্তিতে সেতুর পিলারের চারপাশে বালিভর্তি জিওব্যাগ, বালু-সিমেন্ট মিশ্রিত বিশেষ ব্লক ফেলা, নদী তীর সংরক্ষণ এবং স্থায়ী ভাঙনরোধী ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত প্রয়োজন।

হুমকিতে স্থানীয় কৃষি ও অর্থনীতি

স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ছোট ধলী ব্রিজটি দুই পারের মানুষের কাছে শুধু একটি যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি এই অঞ্চলের কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার প্রধান লাইফলাইন। সেতুটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে এলাকার উৎপাদিত ফসল পরিবহন, গবাদিপশু আনা-নেওয়া, হাটবাজার ব্যবস্থা এবং সাধারণ মানুষের চলাচলে মারাত্মক অচলাবস্থা সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি নদীভাঙন তীব্র হলে নদীর পাড়ের ঘরবাড়ি ও শত শত একর কৃষিজমিও নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে।

এলাকাবাসী ও দুই পারের সচেতন সাধারণ মানুষ অবিলম্বে প্রশাসনের মাধ্যমে দ্রুত প্রকৌশলগত কারিগরি জরিপ, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে নিয়মিত টাস্কফোর্স বা ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান এবং সেতুটি রক্ষায় স্থায়ী সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণের জোরালো দাবি জানিয়েছেন।

কোম্পানীগঞ্জের এই অর্থনৈতিক লাইফলাইন ‘ছোট ধলী ব্রিজ’ রক্ষায় এখনই কার্যকর ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ সময়ের দাবি, অন্যথায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে পুরো গ্রামীণ অর্থনীতিতে।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *