সেনবাগের মানবিক এক আলেমের করুণ বিদায়: অসুস্থ সন্তানকে বাঁচাতে গিয়ে হারালেন জীবন
মোহাম্মাদ উল্যা, নোয়াখালী জেলা প্রতিনিধি

নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার কাবিলপুর ইউনিয়নের ফতেহপুর ইসলামিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানার মুহতামিম, বরেণ্য আলেম হযরত মাওলানা বেলাল হোসাইন ফতেহপুরী (৫৫) এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। অসুস্থ মেয়েকে চিকিৎসকের কাছে দেখিয়ে হাসপাতাল থেকে বের হয়ে রাস্তা পার হওয়ার সময় দ্রুতগতির একটি বেপরোয়া ট্রাকের চাপায় তিনি ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। এ ঘটনায় তাঁর পাঁচ বছর বয়সী ফুটফুটে কন্যাসন্তান তালবিয়া মুসতারি গুরুতর আহত হয়েছে।
সোমবার (১৮ মে ২০২৬) দুপুরে নোয়াখালী-ফেনী ফোরলেন মহাসড়কের বেগমগঞ্জ উপজেলার চৌমুহনী এলাকার ‘হলি কেয়ার হাসপাতাল’-এর সামনে এই হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা ঘটে।
যেভাবে ঘটল এই অলৌকিক ট্র্যাজেডি
পারিবারিক সূত্র, হাইওয়ে পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য অনুযায়ী জানা যায়, সোমবার সকালে সেনবাগ উপজেলার ফতেহপুর গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে স্ত্রী ও দুই কন্যাকে নিয়ে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে চৌমুহনীর একটি হাসপাতালে যান মাওলানা বেলাল হোসাইন ফতেহপুরী। চিকিৎসা শেষে দুপুরের দিকে হাসপাতাল থেকে বের হয়ে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সাবধানে সড়ক পার হচ্ছিলেন তিনি।
এ সময় ছোট মেয়ে ৫ বছরের তালবিয়া মুসতারিকে কোলে নিয়ে রাস্তা পার হচ্ছিলেন তিনি। তাঁর ঠিক পেছনেই আসছিলেন স্ত্রী তামান্না রহমান (৪০) ও অপর কন্যা তাসপিয়া সুলতানা (১২)। ঠিক সেই মুহূর্তে ফেনী থেকে চৌমুহনীমুখী একটি দ্রুতগতির ও অনিয়ন্ত্রিত মালবাহী ট্রাক আকস্মিক বাবা-মেয়েকে সজোরে চাপা দেয়।
দুর্ঘটনার প্রচণ্ড আঘাতে মাওলানা বেলাল হোসাইন ফতেহপুরী ঘটনাস্থলেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এ সময় গুরুতর ও আশঙ্কাজনক অবস্থায় শিশু তালবিয়াকে উদ্ধার করে জেলা শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। পেছনের লাইনে থাকায় অন্য দুই সদস্য অলৌকিকভাবে অক্ষত থাকলেও চোখের সামনে প্রিয় মানুষের এমন মৃত্যুতে পরিবারের ওপর নেমে এসেছে শোকের গভীর অন্ধকার।
ঘাতক ট্রাক জব্দ
দুর্ঘটনার পরপরই ঘাতক ট্রাকের চালক ও সহকারী সুকৌশলে পালিয়ে গেলেও স্থানীয় ক্ষুব্ধ জনতা ধাওয়া করে ট্রাকটি ধর্তব্য স্থানে আটকে সক্ষম হয়। পরে খবর পেয়ে চন্দ্রগঞ্জ হাইওয়ে থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে দুর্ঘটনাকবলিত ট্রাকটি জব্দ করে ফাঁড়িতে নিয়ে যায়।
আলেম সমাজে গভীর শোক
মাওলানা বেলাল হোসাইন ফতেহপুরী দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় ফতেহপুর ইসলামিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানার অত্যন্ত নিষ্ঠাবান মুহতামিম (অধ্যক্ষ) হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। তাঁর এই আকস্মিক ও মর্মান্তিক মৃত্যুতে মাদ্রাসা পরিবার, আলেম সমাজ, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং পুরো এলাকাবাসীর মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। অনেকেই তাঁকে একজন সজ্জন, অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ ও পরম মানবিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে স্মরণ করে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
পুলিশের বক্তব্য
চন্দ্রগঞ্জ হাইওয়ে থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. সবুজ মিয়া ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, “চিকিৎসা শেষে সড়ক পার হওয়ার সময় একটি দ্রুতগতির ট্রাক বাবা ও মেয়েকে চাপা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই বেলাল হোসাইন মারা যান এবং তাঁর ছোট মেয়েটি গুরুতর আহত হয়। দুর্ঘটনাকবলিত ঘাতক ট্রাকটি আমাদের হেফাজতে রয়েছে। মরহুমের পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ বা এজাহার পাওয়া গেলে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
এদিকে, এই মর্মান্তিক ঘটনাটি আবারও মহাসড়কে বেপরোয়া যান চলাচল, পথচারীদের চরম নিরাপত্তা ঝুঁকি ও বিশেষ করে হাসপাতাল-স্কুলসংলগ্ন সংবেদনশীল এলাকায় গতিনিয়ন্ত্রণের কঠোর প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনে দিয়েছে। নোয়াখালীর সচেতন মহল এই ধরনের দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় অবিলম্বে স্পিডব্রেকার, জেব্রা ক্রসিং, ফুটওভার ব্রিজ স্থাপন ও কঠোর ট্রাফিক তদারকির জোর দাবি জানিয়েছেন।
