‘ভুয়া’ জেনারেল: রক্ষীবাহিনীর ক্যাডার থেকে মেজর জিয়াউর রহমানের অনুগ্রহে সেনাবাহিনীতে মাসুদ
শেখ মেহেদী হাসান নাদিম

মিলিটারী একটি সুশৃঙ্খল এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বাহিনীর প্রতিটি পদক ও র্যাঙ্ক অর্জিত হয় কঠোর প্রশিক্ষণ ও মেধার ভিত্তিতে। কিন্তু বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাসে লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এক ঘৃণ্য ব্যতিক্রম। তিনি কোনো যোগ্যতায় নয়, বরং আওয়ামী লীগের আনুগত্য এবং শেখ মুজিব পরবর্তী সময়ে সেনাপ্রধান মেজর জিয়াউর রহমানের অনুগ্রহে সেনাবাহিনীতে যোগ্যতার মানদণ্ডের বাহিরে ঢুকে ছিলেন।
যোগ্যতাহীন ‘ক্যাডার’ থেকে জেনারেল
মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী সরাসরি কোনো সামরিক একাডেমি বা বিএমএ (BMA) থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নিয়মিত কর্মকর্তা ছিলেন না। তাঁর সামরিক জীবনের শুরু ছিল মূলত আওয়ামী লীগের অনুগত রাজনৈতিক ক্যাডারভিত্তিক ‘জাতীয় রক্ষীবাহিনী’র (জেআরবি) মাধ্যমে। তৎকালীন শেখ মুজিবুর রহমান সরকার এই বাহিনী গঠন করলেও, অযোগ্যতার কারণে মাসুদের মতো সদস্যদের তিনি সেনাবাহিনীতে স্থান দেননি। মূলত ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর রক্ষীবাহিনী বিলুপ্ত করা হয়। পরবর্তীতে ‘জাতীয় রক্ষীবাহিনী অবসারণ আইন, ১৯৭৫’-এর মাধ্যমে এই বাহিনীর সদস্যদের সেনাবাহিনীতে একীভূত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। সেই ক্রান্তিকালে তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের বিশেষ ‘দয়া’ বা বিবেচনার সুযোগ নিয়েই মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী সেনাবাহিনীতে আত্মীকৃত হওয়ার সুযোগ পান।

পারিবারিক ও রাজনৈতিক প্রভাবে উত্থান
সেনাবাহিনীতে প্রবেশের পর তাঁর মেধার চেয়ে পারিবারিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কই তাঁর পদোন্নতির পথ সুগম করেছে বলে দলিলে উল্লেখ রয়েছে। তিনি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ভাই সাইদ ইস্কান্দারের ভায়রা ভাই হওয়ার সুবাদে দ্রুত পদোন্নতি পান। ২০০৩ সালে বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালীন তাঁকে ডিজিএফআই-এর গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। ২০০৭ সালের জরুরি অবস্থার সময় তিনি সাভারের ৯ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি হিসেবে আবির্ভূত হন।
১/১১-এর তাণ্ডব ও নির্যাতনের নীল নকশা
১/১১-এর সময় মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী যে ক্ষমতার দাপট দেখিয়েছিলেন, তা ছিল মূলত প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ।
- তারেক রহমানের ওপর নির্যাতন: প্রসিকিউটরদের দাবি অনুযায়ী, তারেক রহমানকে হত্যার উদ্দেশ্যে রিমান্ডে নিয়ে তাঁর মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার পেছনে মাসুদের সরাসরি ‘নীল নকশা’ ছিল।
- মাইনাস-টু ফর্মুলা: তিনি দুই নেত্রীকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করার পরিকল্পনায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন।
বর্তমান পরিণতি: আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত ‘জেনারেল’

বর্তমানে বারিধারা থেকে গ্রেপ্তার হওয়া এই সাবেক কর্মকর্তা ঢাকা ও ফেনীর অন্তত ১১টি মামলার আসামী। তাঁর বিরুদ্ধে মানব পাচার, অর্থ পাচার এবং খুনের চেষ্টার মতো জঘন্য অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। রিমান্ডে থাকা এই তথাকথিত জেনারেলের বিচার এখন সময়ের দাবি। বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড উপেক্ষা করে রাজনৈতিক বিবেচনায় জেনারেল পদবী পাওয়া এই কর্মকর্তাদের কারণেই সামরিক বাহিনীর চেইন অফ কমান্ড ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। আজকের এই বিচার প্রক্রিয়া সেই ঐতিহাসিক ভুল শোধরানোরই একটি অংশ।
