৩৮ সেন্টিমিটার কোলন চুরি: ভূয়া ক্যান্সারের ময়নাতদন্ত (২য় পর্ব): CBMCH ফাঁদে রমজান মোল্লা

শেখ মেহেদী হাসান নাদিম

ময়মনসিংহের তপ্ত দুপুরে ৬০ বছর বয়সী রমজান মোল্লা যখন কমিউনিটি বেজড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (CBMCH) ওপিডি-র বেঞ্চে বসেছিলেন, তিনি জানতেন না তার জীবনের আয়ু মাপার ফিতাটি তখন একদল ‘সাদা পোশাকধারী’র হাতে। পেটের ডানপাশে সামান্য ব্যথা আর একটি ছোট্ট ফোলা অংশ (Lump)—এই তো ছিল অভিযোগ। কিন্তু এই সামান্য অভিযোগকেই মূলধন করে বোনা হলো এক ভয়ংকর জালিয়াতির জাল।

গাইডলাইন যখন ডাস্টবিনে

চিকিৎসা বিজ্ঞানের আন্তর্জাতিক নিয়ম (NICE/ACR) বলে, ৫০ বছরের বেশি কোনো রোগীর পেটে এমন ‘লাম্প‘ থাকলে প্রথম কাজই হলো একটি Contrast-Enhanced CT (CECT) করা। এটি ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রধান হাতিয়ার। কিন্তু CBMCB-এর সার্জারি প্রধান অধ্যাপক ডা. তৌফিকুল হক যেন কোনো এক অদৃশ্য কারণে সেই ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ পরীক্ষাকে পাশ কাটিয়ে গেলেন। তিনি বেছে নিলেন USG আর কলোনোস্কোপি—যা অনেক সময়ই ভুল সংকেত দেয়। কেন এই অবহেলা? কেন গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড সিটিকে দূরে রাখা হলো? উত্তরটা লুকিয়ে ছিল পরবর্তী নাটকীয়তায়।

৫ জুলাই: একটি সাজানো মৃত্যুপরোয়ানা

২৩ জুন অধ্যাপক ডা. চিত্ত রঞ্জন দেবনাথের কলোনোস্কোপিতে ধরা পড়ল ‘Proliferative Growth‘। এরপর রমজান মোল্লাকে পাঠানো হলো ‘মির্জা প্যাথলজি’-তে। ৫ জুলাই সেই ল্যাব থেকে যে রিপোর্ট এল, তা ছিল রমজান মোল্লার জন্য একটি জীবন্ত মৃত্যুপরোয়ানা। রিপোর্টে লেখা: “Well-differentiated adenocarcinoma”। সহজ বাংলায়—রমজান মোল্লা ক্যান্সারে আক্রান্ত। কিন্তু এই রিপোর্ট কি আসলেও রমজান মোল্লার টিস্যুর ছিল? নাকি এটি ছিল সেই জালিয়াতি সিন্ডিকেটের কোনো ‘টেমপ্লেট‘ রিপোর্ট?

৩৮ সেন্টিমিটারের ‘চুরি’

২৩ জুলাই অপারেশন থিয়েটারে চলল ধারালো ছুরির পোঁচ। অধ্যাপক তৌফিকুল হক রমজান মোল্লার শরীর থেকে কেটে আলাদা করে দিলেন ৩৮ সেন্টিমিটার সুস্থ অন্ত্র (Caecum, Ascending Colon, Terminal Ileum)। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা স্বজনরা চোখের জল মুছলেন এই ভেবে যে, অন্তত ক্যান্সার থেকে মুক্তি পেলেন তাদের প্রিয়জন।

কিন্তু ট্র্যাজেডির চূড়ান্ত অঙ্ক তখনও বাকি ছিল। ১০ আগস্ট চূড়ান্ত প্যাথলজি রিপোর্ট যখন এল, পুরো মেডিকেল টিম স্তব্ধ হয়ে গেল। রিপোর্টে লেখা: “No malignancy is seen”। কোনো ক্যান্সার ছিল না! কোনো টিউমার ছিল না! এমনকি টিবি-র চিহ্নও ছিল না। ছিল শুধু সাধারণ এক প্রদাহ (Appendicitis)

প্রশ্ন যখন সিন্ডিকেটের দিকে

একজন মানুষের সুস্থ শরীরের ৩৮ সেন্টিমিটার অংশ কি তবে ‘চুরি‘ করা হলো? মির্জা প্যাথলজির যে রিপোর্টে ক্যান্সার ছিল, অস্ত্রোপচারের পর সেই ক্যান্সার উধাও হয়ে গেল কোথায়? তদন্ত বলছে, এই ‘মির্জা‘ নামটির সাথে জড়িয়ে আছে আরও অনেক জালিয়াতির ইতিহাস। যারা রাষ্ট্রীয় পরীক্ষার রুটিন জাল করতে পারে, যারা প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে চেইন অব কমান্ড ভেঙে দেয়, তাদের কাছে একজন সাধারণ রমজান মোল্লার অন্ত্র কেটে ফেলা হয়তো শুধুই একটি ‘কেস স্টাডি’।

★ এই তদন্তে প্রাপ্ত প্রতিটি বিষয়ে ২ বা ততোধিক অকাট্য প্রমাণ হাতে নিয়ে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে প্রদানপূর্বক তৈরি করা এই রিপোর্টে সাধারণ মানুষের বোধগম্যতার জন্য প্রতীকী ছবি ব্যবহার করা হলো।

পরবর্তী পর্বে দেখুন: স্কয়ার হাসপাতালের সেই চূড়ান্ত রিপোর্ট এবং রমজান মোল্লার বর্তমান নরকযন্ত্রণা। আর জানুন—কে এই ‘মির্জা‘, যার ইশারায় জিম্মি হয়ে পড়েছে ময়মনসিংহের চিকিৎসাসেবা?

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *