হাতিয়ায় শতকোটি টাকার শুঁটকি শিল্প: সংকট শুধু সংরক্ষণ ও পরিবহনের

মোহাম্মদ উল্যা, নোয়াখালী জেলা প্রতিনিধি

নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার বিস্তীর্ণ উপকূলে এখন চেউয়া শুঁটকি তৈরির ধুম পড়েছে। এ বছর শতকোটি টাকার বাজারমূল্য ছাড়ানোর সম্ভাবনা থাকলেও আধুনিক সংরক্ষণাগার ও উন্নত পরিবহন ব্যবস্থার অভাবে ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন হাজার হাজার প্রান্তিক জেলে। সম্ভাবনাময় এই খাতটি এখন অনেকটা অবহেলা আর সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে।

২০ হাজার জেলের কর্মসংস্থান ও বিশাল কর্মযজ্ঞ

হাতিয়ার বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলের প্রায় ১০ হাজার একর জমিতে গড়ে উঠেছে শুঁটকি মহাল। ইলিশের মৌসুম শেষে অগ্রহায়ণ থেকে চৈত্র পর্যন্ত চলে এই চেউয়া মাছের কর্মযজ্ঞ। প্রায় ২০ হাজার জেলে ও শ্রমিক এই শিল্পের সাথে সরাসরি জড়িত। নদী থেকে মাছ তোলার পর রোদে শুকিয়ে শুঁটকি তৈরি করতে ৩-৪ দিন সময় লাগে। স্থানীয় জেলে শরীফ হোসেন জানান, এই মাছ বিক্রির টাকা দিয়েই তিনি ঘর তোলা আর সন্তানদের পড়াশোনার স্বপ্ন দেখছেন।

পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহার ও ন্যায্য মূল্যের অভাব

হাতিয়ার চেউয়া শুঁটকি ঢাকা, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়। তবে আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধা না থাকায় অধিকাংশ শুঁটকি শেষ পর্যন্ত মৎস্য ও পশুখাদ্য (ফিড) হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এতে জেলেরা মানুষের খাদ্য হিসেবে বিক্রির যে উচ্চমূল্য পাওয়ার কথা ছিল, তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় পাইকাররা সিন্ডিকেট করে দাম কমিয়ে দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

পুষ্টি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সাইন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, উপকূলীয় মানুষের খাদ্য তালিকায় ৩০-৪০ শতাংশ প্রোটিন আসে এই চেউয়া মাছ থেকে। এটি অত্যন্ত সস্তা হওয়ায় দরিদ্র মানুষের পুষ্টি চাহিদা পূরণে বড় ভূমিকা রাখে। নিঝুম দ্বীপের ইউপি সদস্য মো. কেফায়েত হোসেন বলেন, এ বছর শুরু থেকেই ভালো মাছ পাওয়া যাচ্ছে, যা গত বছরের ইলিশের অভাব ঘুচিয়ে দেওয়ার আশা দেখাচ্ছে।

সরকারি উদ্যোগের দাবি

নোয়াখালী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা হারুন অর রশিদ জানান, চেউয়া মাছ অত্যন্ত নরম প্রকৃতির হওয়ায় এটি বেশিক্ষণ সংরক্ষণ করা যায় না। হাতিয়া দুর্গম এলাকা হওয়ায় পরিবহন সুবিধা নিশ্চিত করাটা বড় চ্যালেঞ্জ। যদি সঠিক প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং দ্রুত পরিবহনের ব্যবস্থা করা যায়, তবে পশুখাদ্যের উপাদান আমদানিতে যে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়, তা সাশ্রয় করা সম্ভব হবে।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *