হাই অ্যালার্ট: শেখ হাসিনার রায় ঘিরে সারা দেশে অঘোষিত নিরাপত্তা, নির্দেশ নাশকাকারীদের দেখামাত্র গুলির
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী ও গণহত্যা মামলার রায় ঘিরে সারা দেশে অঘোষিত হাই অ্যালার্ট জারি করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। নেওয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। নাশকাকারীদের দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দেওয়ার কথা জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার। অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে ঢাকাসহ সারা দেশে। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্ট, ট্রাইব্যুনালে কয়েক স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা হয়েছে।
পুলিশ, র্যাব, গোয়েন্দা, বিজিবি’র পাশাপাশি সেনাবাহিনীর সদস্যরাও নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবেন। ঢাকাসহ আশপাশের বেশ কয়েকটি জেলায় বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।
কঠোর অ্যাকশনের নির্দেশ
ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী কর্তব্যরত অবস্থায় পুলিশকে বা জনগণকে লক্ষ্য করে ককটেল নিক্ষেপ কিংবা আগুন দিলে হামলাকারীকে গুলি করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “বাসে আগুন দিলে, পুলিশ জনগণের গায়ে আগুন দিলে গুলি করে দিতে বলেছি।”
গোয়েন্দা সূত্র বলছে, আজ রায়ের দিন ব্যাপক নাশকতা চালাতে পারে আওয়ামী লীগ। বিশেষ করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার, ঝটিকা মিছিল এবং তারা যাতে কোনোভাবে ককটেল বিস্ফোরণ, বাসে-স্থাপনায় আগুন দিয়ে নাশকতা করতে না পারে সেদিকে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
ট্রাইব্যুনালে সেনা মোতায়েন
হাসিনাসহ তিন আসামির মামলার রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে ট্রাইব্যুনালের নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য সেনাবাহিনী মোতায়েন চেয়ে সেনাসদরে চিঠি দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। রোববার সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন সেনাসদরে চিঠি পাঠানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
ঢাকাসহ ৪ জেলায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে দায়িত্ব পালন করছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। বিজিবি সদর দপ্তরের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলাম বলেছেন, ঢাকা, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর ও মাদারীপুর জেলার সার্বিক নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিজিবি দায়িত্ব পালন করছে।
আওয়ামী লীগের তৎপরতা ও নাশকতার চিত্র
রায় ঘিরে পুলিশের প্রত্যেকটি অপারেশনাল ও গোয়েন্দা ইউনিটকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, প্রধান উপদেষ্টাসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বাসস্থান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা এবং গোয়েন্দা নজরদারি নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
- আওয়ামী লীগের কর্মসূচি: রায় প্রতিহত করার জন্য কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ রোববার ও সোমবার ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি পালনের দাবি করছে। গতকাল বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত রাজধানীর কয়েকটি স্থানে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। শেখ হাসিনার রায় ঘিরে টানা এক সপ্তাহ ধরে দেশজুড়ে নাশকতার চেষ্টা করে আসছে দলটির নেতাকর্মীরা।
- বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগ: গতকাল সন্ধ্যায় ঢাকার একাধিক স্থানে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। জুরাইন বিক্রমপুর প্লাজার সামনে তিনটি, কাওরান বাজার মোড়ে ককটেল বিস্ফোরণ হয়। রোববার সকালে রাজধানীর নিউ ইস্কাটনে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় আব্দুল বাসির নামে এক পথচারী আহত হন। এছাড়া ঢাকার বাইরে গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীতে ও মাদারীপুরে গভীর রাতে গাছ কেটে মহাসড়ক অবরোধের চেষ্টা করেছে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা।
- অন্যান্য স্থানে অগ্নিসংযোগ: শনিবার রাত থেকে রোববার ভোর পর্যন্ত সাভারের ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দু’টি বাসে আগুন, বগুড়ার শেরপুর উপজেলায় গ্রামীণ ব্যাংকের শাখায় আগুন দেওয়ার চেষ্টা, কুষ্টিয়া সদরে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে একটি ট্রাকে আগুন, গাজীপুরের শ্রীপুরের বারতোপা বাজারে গ্রামীণ ব্যাংকের শাখায় পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ, ফেনী শহরের মুক্ত বাজারে জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে আগুন এবং ময়মনসিংহ নগরীতে পার্কিং করে রাখা কাভার্ডভ্যানে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও গ্রেপ্তার অভিযান
- বিএনপি ও জামায়াত: ওদিকে বিএনপি, জামায়াতসহ অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে মাঠে থাকার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, “ফ্যাসিস্ট হাসিনার গণহত্যার বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে যে ট্রায়াল হয়েছে তার রায় বের হবে, এটা নিয়ে সারা দেশে এক ধরনের চরম অনিশ্চয়তা, এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে।”
- নাগরিক প্রতিবাদ: আওয়ামী লীগের অগ্নিসন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। আজ সারা দেশে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে আওয়ামী লীগের অগ্নিসন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অবস্থান কর্মসূচি পালিত হবে। শাহবাগে “জনতার আদালতে” শেখ হাসিনার প্রতীকী ফাঁসি ও সহযোগীদের প্রতীকী পাথর নিক্ষেপ কর্মসূচি পালিত হবে।
গ্রেপ্তার অভিযান: কুমিল্লায় শেখ হাসিনার রায়কে কেন্দ্র করে নাশকতার চেষ্টায় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ৪৪ নেতাকর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। এ ছাড়া রাজধানীতে ঝটিকা মিছিলের ঘটনায় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের ১০ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
ডিএমপি কমিশনার, র্যাব সদর দপ্তরের লিগ্যাল ও মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম, ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক এবং পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি এনামুল হক সাগর—সকলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোর অবস্থানে থাকার কথা জানিয়েছেন।
