যাকাত: ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি

মো: মাসুদ মিয়া

ইসলামের সামাজিক-অর্থনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে ন্যায়, সহমর্মিতা ও সম্পদের সুষম বণ্টন। এই দর্শনের বাস্তব প্রয়োগের অন্যতম প্রধান উপায় হলো যাকাত—যা কেবল ব্যক্তিগত ইবাদত নয়, বরং একটি সুসংগঠিত সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। কুরআন-এ সালাতের পাশাপাশি যাকাতের নির্দেশ বহুবার এসেছে; যেমন সূরা আল-বাকারা (২:১১০) ও সূরা আন-নূর (২৪:৫৬)। হাদিসে হযরত মুহাম্মদ (সা.) স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন, ইসলাম পাঁচ ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত—তার একটি হলো যাকাত। এ থেকেই বোঝা যায়, যাকাত কোনো ঐচ্ছিক দান নয়; এটি আল্লাহপ্রদত্ত ফরজ বিধান, যা ব্যক্তি ও সমাজ—উভয়কে পরিশুদ্ধ ও সুসংহত করে।

যাকাতের আত্মিক ও নৈতিক প্রভাব

‘যাকাত’ শব্দের অর্থ পবিত্রতা, প্রবৃদ্ধি ও পরিশুদ্ধতা। এই ইবাদতের মাধ্যমে সম্পদের ভেতরে জমে থাকা কৃপণতা ও অহমিকা দূর হয়; ধনীর হৃদয়ে জন্ম নেয় সহমর্মিতা, আর গরিবের জীবনে আসে মর্যাদাপূর্ণ স্বস্তি। যাকাত শুধু সম্পদকে পবিত্র করে না; এটি আত্মাকেও পরিশুদ্ধ করে। দানশীলতার চর্চা মানুষকে আল্লাহর নৈকট্য লাভে সহায়তা করে এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ জাগ্রত করে। তাই যাকাত একদিকে ইবাদত, অন্যদিকে নৈতিক শিক্ষারও বাস্তব অনুশীলন।

নিসাব ও হিসাবের শুদ্ধতা

যাকাত আদায়ের জন্য ‘নিসাব’ বা ন্যূনতম সম্পদের সীমা নির্ধারিত। নিত্যপ্রয়োজনীয় চাহিদা বাদ দিয়ে কারও কাছে যদি সাড়ে ৭ তোলা (প্রায় ৮৭.৪৮ গ্রাম) স্বর্ণ, অথবা সাড়ে ৫২ তোলা (প্রায় ৬১২.৩৬ গ্রাম) রূপা, কিংবা এর সমমূল্যের নগদ অর্থ/ব্যবসায়িক সম্পদ থাকে এবং তার উপর এক চন্দ্রবছর অতিক্রান্ত হয়, তবে তাকে মোট যাকাতযোগ্য সম্পদের ২.৫ শতাংশ (৪০ ভাগের ১ ভাগ) যাকাত দিতে হবে। কারো যদি পাঁচ তোলা স্বর্ণ এবং আড়াই তোলা পরিমাণ স্বর্ণের সমপরিমাণ অর্থ বা অন্য সম্পদ থাকে, সামষ্টিকভাবে তার উপরও যাকাত ফরজ হবে, এমনকি সে উপার্জনহীন ও মহিলাদের ক্ষেত্রে স্বামীর উপর নির্ভরশীল হলেও। সমকালীন বাস্তবতায় অনেক আলেম দরিদ্রবান্ধব বিবেচনায় রূপার নিসাবকে মানদণ্ড ধরতে পরামর্শ দেন—তবে নিজ নিজ মাজহাব ও বিশ্বস্ত আলেমের দিকনির্দেশনা অনুসরণ করাই উত্তম।

যাকাতের ক্ষেত্রে হিসাবের স্বচ্ছতা অপরিহার্য। বছরের একটি নির্দিষ্ট তারিখ ঠিক করে প্রতি বছর সেই দিনে নিট যাকাতযোগ্য সম্পদের হিসাব করা উচিত। পরিশোধযোগ্য ঋণ সমন্বয় করে সঠিক ভিত্তির উপর ২.৫ শতাংশ নির্ধারণ করতে হবে। ‘থোক বরাদ্দ’ বা অনুমানভিত্তিক দান প্রায়ই সঠিক হিসাবকে ব্যাহত করে; তাই শুদ্ধ হিসাবই ইবাদতের পূর্ণতা নিশ্চিত করে।

যাকাতযোগ্য সম্পদের পরিধি

যাকাত প্রযোজ্য হয় সোনা-রূপা, নগদ অর্থ, ব্যাংক ব্যালেন্স, এফডিআর, বন্ড, শেয়ার, ব্যবসার পণ্য ও স্টক, বিক্রয়যোগ্য জমি/প্লট, এবং ভাড়ার উদ্দেশ্যে ক্রয়কৃত সম্পদের ভাড়া থেকে সঞ্চিত অর্থে। গবাদিপশুতেও নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে যাকাত প্রযোজ্য। এ তালিকা প্রমাণ করে, যাকাত আধুনিক অর্থনীতির নানা সম্পদশ্রেণিকেও অন্তর্ভুক্ত করে—ফলে এটি সময়োপযোগী ও গতিশীল একটি বিধান।

বণ্টনের আট খাত: সামাজিক নিরাপত্তা

পবিত্র কুরআন-এর সূরা আত-তাওবা (৬০)-এ যাকাত বণ্টনের আটটি খাত নির্ধারিত হয়েছে: (১) ফকীর, (২) মিসকীন, (৩) যাকাত ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত কর্মী, (৪) অন্তর আকৃষ্টকরণ/নবমুসলিম, (৫) দাসমুক্তি, (৬) ঋণগ্রস্ত, (৭) আল্লাহর পথে, (৮) মুসাফির। এই নির্দিষ্টতা যাকাতকে লক্ষ্যভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থায় পরিণত করেছে। অর্থাৎ যাকাত কেবল আবেশনির্ভর দান নয়; বরং সুনির্দিষ্ট নীতিমালায় পরিচালিত এক প্রাতিষ্ঠানিক তহবিল।

অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাসে যাকাত

আধুনিক বিশ্বে আয়বৈষম্য ও সম্পদের কেন্দ্রীকরণ বড় সমস্যা। যাকাত এ বৈষম্য কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। ধনীর সম্পদের একটি অংশ নিয়মিতভাবে দরিদ্রের কাছে পৌঁছালে অর্থের সঞ্চালন বাড়ে, ভোগ ও বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সৃষ্টি হয়। বিশেষত যদি যাকাত এমনভাবে দেওয়া হয় যাতে গ্রহীতা স্বাবলম্বী হতে পারে—যেমন ক্ষুদ্র ব্যবসার পুঁজি, প্রশিক্ষণ, যন্ত্রপাতি—তবে এটি দীর্ঘমেয়াদি দারিদ্র্য বিমোচনের হাতিয়ার হয়ে ওঠে। ফলে যাকাত সাময়িক সহায়তার পাশাপাশি টেকসই উন্নয়নের পথও খুলে দেয়।

আন্তরিকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা

যাকাত প্রদানে আন্তরিকতা অপরিহার্য। লোকদেখানো প্রচারণা বা প্রতিদানের প্রত্যাশা ইবাদতের মূল চেতনাকে ক্ষুণ্ণ করে। সম্ভব হলে গোপনে দেওয়া উত্তম। তবে প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতার জন্য সংগৃহীত ও ব্যয়কৃত অর্থের হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশ করা জরুরি—যাতে জনগণের আস্থা বৃদ্ধি পায়। ব্যক্তি পর্যায়ে বিনয় ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে স্বচ্ছতা—এই দুইয়ের সমন্বয়ই যাকাত ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে।

রমজান আত্মশুদ্ধি ও সওয়াবের মাস। এ সময় যাকাত আদায় করলে অধিক সওয়াবের আশা করা যায়। তবে যে সময় নিসাব পূর্ণ হয়, তখনই যাকাত আদায় করা ফরজ; শুধু রমজানের অপেক্ষায় বিলম্ব করা ঠিক নয়। অনেকে রমজানে হিসাব মেলাতে সুবিধা পান—সেক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট তারিখ স্থির করে নিয়মিততা বজায় রাখা শ্রেয়।

বাংলাদেশে যাকাত ব্যবস্থাপনার প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশে সরকারি যাকাত তহবিল পরিচালিত হয় ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ-এর অধীনে গঠিত যাকাত বোর্ডের মাধ্যমে। যাকাত ফান্ড অর্ডিন্যান্স, ১৯৮২ অনুযায়ী সংগৃহীত অর্থ জেলা-উপজেলায় বণ্টন, চিকিৎসা-শিক্ষা সহায়তা, প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমে ব্যয় করা হয়। সরকারি তহবিলে প্রদত্ত যাকাতের অর্থ আয়করমুক্ত—যা প্রাতিষ্ঠানিক অংশগ্রহণে উৎসাহ জোগায়। তবে এ ব্যবস্থাকে আরও ফলপ্রসূ করতে প্রয়োজন ব্যাপক প্রচারণা, শতভাগ স্বচ্ছতা, ডিজিটাল মনিটরিং এবং দীর্ঘমেয়াদি দারিদ্র্য বিমোচন পরিকল্পনা।

ভবিষ্যৎ করণীয় ও সুপারিশ

১. সরকারি ও বেসরকারি উভয় পর্যায়ে যাকাত ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। ২. যাকাতগ্রহীতাকে স্বাবলম্বী করতে দক্ষতা উন্নয়ন ও ক্ষুদ্রঋণ/পুঁজি সহায়তার মডেল গ্রহণ। ৩. ডিজিটাল ডাটাবেসের মাধ্যমে প্রকৃত উপযুক্তদের তালিকা প্রস্তুত। ৪. সেরা যাকাতদাতাদের সামাজিক স্বীকৃতি প্রদান করে ইতিবাচক সংস্কৃতি গড়ে তোলা। ৫. বেসরকারি সংগ্রহকারীদের কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় তদারকি।

যাকাত ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। যাকাত কেবল ধর্মীয় বিধান নয়; এটি মানবকল্যাণের এক সুসংহত অর্থনৈতিক কাঠামো। প্রত্যেক ব্যক্তি তার প্রদানকৃত যাকাতের একটা নির্দিষ্ট অংশ সরকারি যাকাত ফান্ডে দিতে পারেন। যাকাত দিলে সম্পদ পবিত্র হয়। সঠিক হিসাব, আন্তরিক নিয়ত ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতার মাধ্যমে যাকাত হতে পারে দারিদ্র্য বিমোচনের শক্তিশালী হাতিয়ার। ব্যক্তি যখন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সম্পদের নির্দিষ্ট অংশ ব্যয় করেন, তখন সেই দান সমাজে ন্যায় ও সাম্যের বীজ বপন করে। তাই যাকাতকে কেবল রমজানকেন্দ্রিক আনুষ্ঠানিকতা নয়—বরং সারা বছরের পরিকল্পিত সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করা জরুরি। তাহলেই গড়ে উঠবে ন্যায়ভিত্তিক, সহমর্মী ও সমৃদ্ধ সমাজ।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *