এসডিজি অর্জনে শক্তিশালী সিআরভিএস অপরিহার্য: বিভাগীয় সেমিনারে ময়মনসিংহ বিভাগীয় কমিশনারের সভাপতিত্বে ৯ দফা সুপারিশ

স্টাফ রিপোর্টার , ময়মনসিংহ

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে ‘কাউকে পেছনে ফেলে নয়’ নীতি বাস্তবায়নের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে শক্তিশালী ‘সিভিল রেজিস্ট্রেশন অ্যান্ড ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস’ (সিআরভিএস) বা নাগরিক নিবন্ধন ও গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান ব্যবস্থা নিশ্চিত করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার (০৫ নভেম্বর ২০২৬) সকালে ময়মনসিংহে আয়োজিত এক বিভাগীয় সেমিনারে বক্তারা এ অভিমত ব্যক্ত করেন।

​মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের “Technical Support for CRVS System Improvement in Bangladesh (Phase-V)” প্রকল্পের আয়োজনে এবং বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়, ময়মনসিংহের ব্যবস্থাপনায় জেলা পরিষদের সম্মেলন কক্ষে ‘জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কার্যক্রম ত্বরান্বিত করার জন্য CRVS বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত বিভাগীয় সেমিনার’ অনুষ্ঠিত হয়।

​অতিথিদের উপস্থিতি ও আলোচনা

​অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ময়মনসিংহের বিভাগীয় কমিশনার জনাব এস এম হুমায়ুন কবির সরকার। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সমন্বয় ও সংস্কার সচিব মিজ্ ফারাহ শাম্মী, এনডিসি।

​বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সমন্বয় অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব জনাব মোহাম্মদ খালেদ হাসান। এছাড়াও অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ সাইফুর রহমান এবং ময়মনসিংহের সিভিল সার্জন ডাঃ মোহাম্মদ ফখরুল হাসান চৌধুরী।

​সেমিনারে ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনের অঞ্চল-১, ২ ও ৩-এর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাবৃন্দ এবং ময়মনসিংহ বিভাগের বিভিন্ন উপজেলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাগণ (ইউএনও) উপস্থিত ছিলেন।

​সিআরভিএসের গুরুত্ব ও বর্তমান চ্যালেঞ্জ

​সেমিনারে বক্তারা উল্লেখ করেন, জাতিসংঘের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশনের (ESCAP) তথ্য অনুযায়ী, এসডিজি কাঠামোর ৬৭টি সূচক কোনো না কোনোভাবে সিআরভিএস-উপাত্তের ওপর সরাসরি নির্ভরশীল। বিশেষ করে এসডিজি ১৬.৯ (আইনি পরিচয় নিশ্চিতকরণ) এবং এসডিজি ৩ (সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ)-এর লক্ষ্য বাস্তবায়নে সিআরভিএসের তথ্যভাণ্ডার মৌলিক অবকাঠামো হিসেবে কাজ করে।

​তবে সাম্প্রতিক সময়ে মাঠপর্যায়ে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের হারের নিম্নগতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। উপাত্ত তুলে ধরে জানানো হয়, জন্ম ও মৃত্যুর এক বছরের মধ্যে নিবন্ধনের ক্ষেত্রে ২০২৪ সালে অগ্রগতি ছিল যথাক্রমে ৫০% ও ৪৭%। ২০২৫ সালে তা বেড়ে যথাক্রমে ৬৩% ও ৫৯%-এ পৌঁছালেও ২০২৬ সালের প্রথম ৯ মাসে তা নেমে এসেছে যথাক্রমে ৪৭% ও ৫৮%-এ। বিলম্বিত নিবন্ধনের প্রবণতা, বিডিআরআইএস (BDRIS) প্ল্যাটফর্মের সার্ভার ত্রুটি, ধীরগতির ইন্টারনেট এবং মাঠপর্যায়ে প্রযুক্তিগত ও জনবল সংকট এ অচলাবস্থার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়।

​উত্তরণে ৯ দফা সুপারিশ

​এই পরিস্থিতি উত্তরণে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে শতভাগ নিবন্ধনের লক্ষ্য অর্জনে সেমিনার থেকে ৯ দফা সুনির্দিষ্ট সুপারিশ তুলে ধরা হয়:

​১. হাসপাতালভিত্তিক সক্রিয় নিবন্ধন: স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে সংঘটিত প্রতিটি জন্ম ও মৃত্যুর তথ্য সংশ্লিষ্ট হাসপাতালেই তাৎক্ষণিকভাবে নিবন্ধনের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

২. কমিউনিটি পর্যায়ে সমন্বিত নেটওয়ার্ক: বাড়িতে সংঘটিত জন্ম ও মৃত্যুর ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকর্মী, পরিবার কল্যাণ কর্মী, গ্রাম পুলিশ ও স্থানীয় সরকারের সমন্বয়ে তৃণমূল পর্যায়ে সহজ নিবন্ধন প্রক্রিয়া চালু করা।

৩. টিকা কার্যক্রমের সাথে সংযোগ: শিশুর জন্ম নিবন্ধনকে নিয়মিত ইপিআই টিকাদান কর্মসূচির সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত করা।

৪. বিডিআরআইএস আধুনিকায়ন: কারিগরি জটিলতা নিরসনে ‘বার্থ অ্যান্ড ডেথ রেজিস্ট্রেশন ইনফরমেশন সিস্টেম’-এর সার্ভার সক্ষমতা বাড়ানো ও আধুনিকায়ন।

৫. ড্যাশবোর্ড ও প্রাতিষ্ঠানিক মনিটরিং: পারফরম্যান্স নিয়মিত পর্যালোচনার জন্য কেন্দ্রীয় ড্যাশবোর্ড প্রবর্তন এবং জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন টাস্কফোর্সকে কার্যকর করা।

৬. কর্মপরিকল্পনা অনুসরণ: মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রণীত অনুসরণিকা ও কর্মপরিকল্পনার শতভাগ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।

৭. সরকারি পরিদর্শক মনোনয়ন: ‘জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন বিধিমালা ২০১৮’-এর বিধি ২(১৯) অনুযায়ী সকল নিবন্ধন অফিসের জন্য অবিলম্বে সরকারি পরিদর্শক মনোনয়ন নিশ্চিত করা।

৮. মাঠ প্রশাসনের নিয়মিত পরিদর্শন: বিধিমালার ১৮ বিধি অনুযায়ী জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে নিবন্ধন অফিসসমূহ নিয়মিতভাবে নিবিড় তত্ত্বাবধান ও পরিদর্শন করা।

৯. টাস্কফোর্সের নিয়মিত সভা: সকল প্রশাসনিক স্তরে নির্ধারিত সময় পরপর জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন টাস্কফোর্সের নিয়মিত ও ফলপ্রসূ সভা আয়োজন করা।

​সভাপতির বক্তব্য

​সভাপতির বক্তব্যে ময়মনসিংহের বিভাগীয় কমিশনার জনাব এস এম হুমায়ুন কবির সরকার বলেন, একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, জবাবদিহিমূলক ও উপাত্তনির্ভর রাষ্ট্র বিনির্মাণে প্রতিটি জীবনকে রাষ্ট্রীয় হিসাবের আওতায় আনা অপরিহার্য। যথাযথ প্রশাসনিক তদারকি, প্রযুক্তির আধুনিকায়ন এবং স্বাস্থ্য বিভাগের সাথে কার্যকর সমন্বয়ের মাধ্যমেই সময়মতো সার্বজনীন নিবন্ধন নিশ্চিত করে ২০৩০ সালের এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে।