অধিকার ও ক্ষমতায়ন প্রতিষ্ঠায় নারীর ভোটাধিকার প্রয়োগ

মোহাম্মদ ওমর ফারুক দেওয়ান

নারী কেন ভোট দেবে?

নারীকে ভোট দিতে হবে নিজের জন্যই—অধিকার প্রতিষ্ঠা, মর্যাদা রক্ষা এবং সর্বোপরি ক্ষমতায়নের জন্য। নারীর শিক্ষার পথ সুগম করতে, বাক-স্বাধীনতার অধিকার নিশ্চিত করতে এবং উন্নয়নে নিজের অংশীদারিত্ব প্রমাণ করতে ভোটকেন্দ্রে যাওয়া অপরিহার্য। রাজনৈতিক দলগুলোর সনাতনী ধ্যানধারণা পাল্টে দিতে এবং দেশের নীতিনির্ধারণে নিজের ভাগ বুঝে নিতে নারীকে কষ্ট করে হলেও লাইনে দাঁড়াতে হবে। ভোট সংক্রান্ত পারিবারিক শৃঙ্খল ভেঙে, কারোর ওপর নির্ভর না করে প্রয়োজনে একাই ভোটকেন্দ্রে যেতে হবে।

ভোটার সংখ্যা ও পরিসংখ্যান ২০২৬

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠেয় গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশন (ইসি) বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেছে। ইসির তথ্যমতে:

  • মোট ভোটার: ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৫ জন।
  • পুরুষ ভোটার: ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ১৫১ জন।
  • নারী ভোটার: ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ৫২৪ জন।
  • হিজড়া ভোটার: ১ হাজার ১২০ জন।
  • সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন: ভোটার সংখ্যায় সর্বনিম্ন ঝালকাঠি-১ আসন (২,২৮,৪৩১ জন) এবং সর্বোচ্চ গাজীপুর-২ আসন (৮,০৪,৩৩৩ জন)।

বিশ্ব প্রেক্ষাপট ও ভোটাধিকারের ইতিহাস

নারীর ভোটাধিকার দীর্ঘ সংগ্রামের ফসল। উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে ইউরোপ-আমেরিকায় এই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। ১৮৯৩ সালে নিউজিল্যান্ড প্রথম নারীদের ভোটাধিকার প্রদান করে। ১৯০২ সালে অস্ট্রেলিয়া এবং ১৯০৬ সালে ফিনল্যান্ড এই অধিকার নিশ্চিত করে। পরবর্তীতে দুই বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতায় পশ্চিমা দেশগুলোতে জনসমর্থন তৈরি হয় এবং ১৯২০ সালে আমেরিকা ও ১৯২৮ সালে যুক্তরাজ্য সকল নারীর সমান ভোটাধিকার স্বীকৃতি দেয়। সুইজারল্যান্ডে এই অধিকার আসতে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত সময় লেগেছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ও চ্যালেঞ্জ

১৯৭১ সালের বিজয়ের পর ১৯৭২ সাল থেকেই বাংলাদেশে সর্বজনীন ভোটাধিকার চালু হয়। তবে আজও অনেক ক্ষেত্রে নারী কাকে ভোট দেবে—সেই সিদ্ধান্ত নেয় পরিবারের পুরুষ সদস্যরা। এই পিতৃতান্ত্রিক ধারা থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। আপনার একটি ভোটই বদলে দিতে পারে সমাজের চিত্র। পরিবারভিত্তিক রাজনৈতিক মনোভাব থেকে বের হয়ে এসে নিজের বিচার-বুদ্ধি দিয়ে যোগ্য প্রার্থীকে বেছে নিতে হবে।

উন্নয়নে নারীর ভূমিকা ও শ্রমের স্বীকৃতি

উন্নয়ন অভিধানে ‘উন্নয়নে নারী’ একটি আধুনিক সংযোজন। বাংলাদেশের নারীরা গ্রামীণ পর্যায়ে ৮৪ ভাগ এবং শহরে ৫৯ ভাগ অবৈতনিক ‘গৃহপরিচারিকা’ হিসেবে কাজ করে। পুরুষের তুলনায় নারীরা সপ্তাহে গড়ে ২১ ঘণ্টা বেশি কাজ করলেও জাতীয় আয়ে (GDP) এর অর্থমূল্য হিসাব করা হয় না। তবে গত কয়েক দশকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে।

সচেতন ভোটারের দায়বদ্ধতা

৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ৫২৪ জন নারী ভোটারের মধ্যে আপনি একজন। আপনার সচেতন একটি ভোট অনেক কিছু পাল্টে দিতে পারে। ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকবেন না। কোনো প্রলোভন, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি বা ভয়ে প্রভাবিত না হয়ে একজন স্বাধীন ও আত্মবিশ্বাসী নাগরিক হিসেবে ভোটকেন্দ্রে যান। আসন্ন নির্বাচনে আপনার রায় হোক গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের পক্ষে।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *