সিবিএমসিবি: গুটিকয়েক ব্যক্তির সিন্ডিকেটে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এক চিকিৎসা সেবা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান
শেখ মেহেদী হাসান নাদিম

ময়মনসিংহের চিকিৎসাসেবা ও শিক্ষার আলোকবর্তিকা ‘কমিউনিটি বেজড মেডিকেল কলেজ বাংলাদেশ’ (সিবিএমসিবি) আজ এক ভয়াবহ মাফিয়া সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি। যে প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য ছিল জীবন বাঁচানো এবং মানবতার কারিগর নির্মাণ, সেই প্রতিষ্ঠানটি এখন পরিণত হয়েছে সুস্থ মানুষের অঙ্গ চুরি, ভুয়া রিপোর্ট জালিয়াতি আর প্রশাসনিক দুর্নীতির আখড়ায়।
দীর্ঘ অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, সভাপতি আব্দুল মান্নান, প্রিন্সিপাল ড. মাহফুজ এবং পরিচালক করিম খানের মতো গুটিকয়েক ব্যক্তির লালসা কীভাবে একটি জাতীয় সম্পদকে ধ্বংসের শেষ সীমায় নিয়ে ঠেকিয়েছে। নিম্নে প্রতিটি অভিযোগের আইনি বিশ্লেষণ ও দালিলিক প্রমাণ তুলে ধরা হলো:
আর্টিস্ট আনোয়ারের চোখের জল: ১৫ বছরের সেবার প্রতিদান কি অমানবিক জুলুম?
অভিযোগের মূলবিন্দু: দীর্ঘ ১৫ বছর ‘আর্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট’ হিসেবে কর্মরত স্ট্রোক-পরবর্তী অসুস্থ আনোয়ার হোসেনকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিদর্শক দলের আগমনের প্রাক্কালে মাত্র সাত দিনে কয়েকশ বেড নম্বর হাতে লেখার অসম্ভব কর্মভার দেওয়া হয়। অসুস্থতার কারণে সামান্য ত্রুটি হওয়ায় তৎকালীন সভাপতি আব্দুল মান্নান এবং প্রিন্সিপাল ড. মাহফুজুর রহমান তাকে ‘মেডিকেল বোর্ড’ বসিয়ে ‘আনফিট’ ঘোষণার ভয় দেখিয়ে বলপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করেন এবং ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে তাদের নির্মিত নিয়মে কিছু টাকা দিয়ে বিদায় করেন।
লঙ্ঘিত আইন ও বিধিমালা:
- বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬: এই ঘটনা শ্রম আইনের ধারা ১৯৫ (অসৎ শ্রম আচরণ) এবং ধারা ২৬ (চাকরিচ্যুতি ও ক্ষতিপূরণ)-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। একজন অসুস্থ কর্মীকে ভয়ভীতি দেখিয়ে পদত্যাগে বাধ্য করা এবং তার আইনানুগ আর্থিক সুবিধা (গ্র্যাচুইটি ও অন্যান্য বেনিফিট) আত্মসাৎ করা সরাসরি ফৌজদারি ও দেওয়ানি অপরাধ।
- মানবাধিকার লঙ্ঘন: জোরপূর্বক শ্রম আদায় এবং মানসিক নির্যাতন সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৪ (জবরদস্তিমূলক শ্রম নিষিদ্ধকরণ)-এর পরিপন্থী।
৩৮ সেন্টিমিটার সুস্থ কোলন ‘চুরি’: ১৫ হাজারের অপারেশন কেন ১১ লাখে?

অভিযোগের মূলবিন্দু: সামান্য অ্যাপেন্ডিক্সের প্রদাহ জনিত ব্যথা নিয়ে আসা রমজান মোল্লাকে ‘মির্জা প্যাথলজি’র একটি ভুয়া ক্যান্সার রিপোর্টের (suggestive well differentiate adino carcinoma) ওপর ভিত্তি করে অপারেশন করা হয়। তার শরীর থেকে ৩৮ সেন্টিমিটার সম্পূর্ণ সুস্থ কোলন কেটে নেয়া হয়। যেখানে ১৫-২০ হাজার টাকার চিকিৎসায় সুস্থ হওয়ার কথা সেখানে তাকে সিবিএমসিবি এবং পরবর্তীতে ঢাকায় গিয়ে স্কয়ার হাসপাতালে দুই দফায় মোট ১১ লক্ষ টাকা খরচ করে ৬২ বছর বয়সে ৩৫ কেজি কম ওজন নিয়ে বাড়ি ফিরতে হয়।
লঙ্ঘিত আইন ও বিধিমালা:
- দণ্ডবিধি, ১৮৬০ (Penal Code, 1860): সুস্থ অঙ্গ কেটে নেওয়া দণ্ডবিধির ৩২০ ও ৩২৬ ধারায় (স্বেচ্ছাকৃতভাবে মারাত্মক অস্ত্র বা উপায়ে গুরুতর আঘাত প্রদান) জামিন অযোগ্য অপরাধ। ভুয়া রিপোর্টের মাধ্যমে প্রতারণা ধারা ৪২০-এর আওতাভুক্ত।
- বিএমএন্ডডিসি (BM&DC) আইন, ২০১০: মিথ্যা রিপোর্টের ভিত্তিতে অপ্রয়োজনীয় সার্জারি এবং রোগীর জীবন বিপন্ন করা পেশাদারি অসদাচরণ (Professional Misconduct), যার শাস্তিস্বরূপ চিকিৎসকের নিবন্ধন বাতিলযোগ্য।
- ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯: সেবামূল্যে চরম জালিয়াতি এবং লক্ষ লক্ষ টাকা বিল আদায় ধারা ৫২ (সেবা প্রদানে অবহেলা)-এর অধীনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
অ্যাকাডেমিক জালিয়াতি ও প্রিন্সিপালের ‘ব্যবসায়িক’ মনোভাব

অভিযোগের মূলবিন্দু: প্যাথলজি বিভাগের প্রধান ডা. শামীমা পলাশ (ডা. নাজমা পারভীন আনসারী) তার ব্যক্তিগত থাইল্যান্ড ভ্রমণের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ধারিত প্রফেশনাল পরীক্ষার রুটিন ডিজিটাল কারচুপির মাধ্যমে পরিবর্তন করেন। বিষয়টি প্রিন্সিপাল ড. মাহফুজুর রহমান চৌধুরীকে জানানো হলে তিনি আইনি ব্যবস্থা না নিয়ে বরং সাংবাদিককে বলেন, “আপনারাও ময়মনসিংহের, আমরাও ময়মনসিংহের—এগুলো করে কী লাভ হবে?”
লঙ্ঘিত আইন ও বিধিমালা:
- দণ্ডবিধি, ১৮৬০ (Penal Code, 1860) – ধারা ৪০৯: একজন দায়িত্বশীল পাবলিক সার্ভেন্ট বা প্রতিষ্ঠান প্রধান হিসেবে প্রিন্সিপালের এই ‘লাভ-লোকসানে’র ব্যবসায়িক মানসিকতা এবং অপরাধ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা সরাসরি “অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ” (Criminal Breach of Trust)-এর শামিল।
- পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) আইন, ১৯৮০ ও বিশ্ববিদ্যালয় বিধি: পরীক্ষার রুটিন জালিয়াতি এবং ডিজিটাল মাধ্যমে কারচুপি করা পরীক্ষা আইনের অধীনে গুরুতর অপরাধ, যা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আওতাতেও বিচারযোগ্য।
তথ্য গোপন, পরিচালকের অনমনীয়তা ও জ্যেষ্ঠ চিকিৎসককে হয়রানি
অভিযোগের মূলবিন্দু: হাসপাতালের পরিচালক করিম খানের রোগীর তথ্যের গোপনীয়তা এবং সভাপতি আব্দুল মান্নানের ৭৫ বছরের পাকা চুলের দোহাই দিয়ে সব অনিয়ম ধামাচাপা দিচ্ছেন এবং সাংবাদিকদের সাথে দাম্ভিক আচরণ করছেন। অন্যদিকে, জ্যেষ্ঠ প্যাথলজিস্ট প্রফেসর ড. শাহনাজ জাহান একটি প্রকৃত রিপোর্ট প্রদান করায় তাকে কোণঠাসা করা হয়েছে।
লঙ্ঘিত আইন ও বিধিমালা:
- তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯: জনগণের বৃহত্তর স্বার্থে এবং জনস্বাস্থ্যের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে তথ্য প্রদানে অস্বীকৃতি জানানো এই আইনের ধারা ৪ (তথ্য প্রাপ্তির অধিকার) এবং ধারা ৭-এর সরাসরি লঙ্ঘন।
- দণ্ডবিধি, ১৮৬০ (Penal Code, 1860): সত্য প্রকাশকারী চিকিৎসককে পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি করা ধারা ৫০৬ (ফৌজদারি ভীতি প্রদর্শন) এবং ধারা ৩৫৩-এর অধীনে অপরাধ।
সিবিএমসিবি কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। ৩৮ সেন্টিমিটার কোলন হারানো রমজান মোল্লার আর্তনাদ, জালিয়াতির শিকার শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ আর আর্টিস্ট আনোয়ার দীর্ঘশ্বাস আজ ময়মনসিংহের বিবেককে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। উপরোল্লিখিত ঘটনাগুলো কিছু উদাহরণ মাত্র! এধরনের ডজন ডজন ঘটনার প্রসূতি ওই সিন্ডিকেট আজ অনিয়মে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে! দেশের প্রচলিত আইন ও স্বাস্থ্য বিধিমালার এতগুলো ধারার সুস্পষ্ট লঙ্ঘনের পরও এই ‘মেডিকেল মাফিয়া সিন্ডিকেট’ কীভাবে বহাল তবিয়তে আছে, তা এক বিরাট প্রশ্ন।
আইনগত কাঠামোর প্রতিটি স্তরে অপরাধ সংঘটিত করার পর দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা না হলে, অচিরেই এই জাতীয় প্রতিষ্ঠানটি কেবল ইতিহাসের পাতায় মৃত এক সম্পদ হিসেবে টিকে থাকবে। গুটিকয়েক অপরাধীর হাত থেকে সিবিএমসিবি-কে রক্ষা করাই এখন সময়ের দাবি।
