ইলিশ রপ্তানিতে রহস্যময় দাম: হুন্ডির মাধ্যমে টাকা লেনদেনের অভিযোগ
এম জসীম উদ্দিন
বরিশাল
প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১৩: ৪০

ইলিশের ভরা মৌসুম এখন। তবুও পাইকারি বাজারে সরববরাহ কম। ফলে দামও আকাশচুম্বী। শুক্রবার ভোরে বরিশালের পোর্টরোডের মৎস্য অবতরণকেন্দ্রের পাইকারি বাজারে ছবি :
ইলিশের রপ্তানি মূল্যের চেয়ে দেশের বাজারে দাম বেশি। ফলে রপ্তানির অনুমতি পাওয়া ব্যবসায়ীরা কীভাবে বেশি দামে ইলিশ কিনে কম দামে ভারতে পাঠাচ্ছেন, তা নিয়ে বরিশালে সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা আলোচনা চলছে। কম মূল্যে ইলিশ রপ্তানির পেছনে হুন্ডির খেলা চলছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবার প্রতি কেজি ইলিশের ন্যূনতম রপ্তানি মূল্য নির্ধারণ করেছে ১২ দশমিক ৫০ মার্কিন ডলার বা ১ হাজার ৫২৫ টাকা। তবে দেশের বাজারে এই আকারের ইলিশের পাইকারি দাম কেজিপ্রতি প্রায় ১ হাজার ৭৮৮ টাকা। অর্থাৎ, রপ্তানি করা হচ্ছে কেজিপ্রতি ২৬০ টাকারও কমে।
হুন্ডির মাধ্যমে লেনদেন
বরিশালের পোর্ট রোড ও বরগুনার পাথরঘাটা মোকামের একাধিক ব্যবসায়ী বলছেন, কাগজপত্রে ঠিকই মন্ত্রণালয়ের দরে রপ্তানি হচ্ছে। ভারতীয় আমদানিকারকেরা ব্যাংকের মাধ্যমে এই টাকা বাংলাদেশে পাঠাচ্ছেন। কিন্তু ভারতের ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি হচ্ছে ওই দেশের বাজার দর অনুযায়ী। এই বাড়তি টাকা ভারতীয় ব্যবসায়ীরা নগদ বা হুন্ডি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের ফেরত পাঠাচ্ছেন। ফলে কাগজে লোকসানের মতো দেখা গেলেও বাস্তবে রপ্তানিকারকেরা অবৈধ পথে বাড়তি অর্থ পাচ্ছেন।
이번 বছর অনুমোদিত ১ হাজার ২০০ মেট্রিক টন ইলিশ রপ্তানির আড়ালে শুধু বাড়তি মূল্য (প্রতি কেজিতে ২৬৩ টাকা) হিসাব ধরলেও প্রায় ৩১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা হুন্ডির মাধ্যমে লেনদেন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সিন্ডিকেট ও ব্যবসায়ীদের বক্তব্য
চলতি বছর রপ্তানির অনুমতি পাওয়া দেশের ৩৭টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বরিশালের ৪টি প্রতিষ্ঠানই নীরব হোসেন ওরফে টুটুলের মালিকানাধীন। তিনি আওয়ামী লীগের বরিশাল মহানগর শাখার শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। গত বছর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি কলকাতায় চলে যান, তবে সেখান থেকেই তার ঘনিষ্ঠদের মাধ্যমে রপ্তানি ব্যবসা ও কলকাতার আমদানি ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ করছেন।
বরিশাল ইলিশ মোকামের ব্যবসায়ী জহির সিকদার বলেন, “দেশের বাজারে যেখানে ৯০০ গ্রাম ওজনের প্রতি কেজি ইলিশ ১ হাজার ৭৮৮ টাকায় পাইকারি বিক্রি হচ্ছে, সেখানে ভারতে রপ্তানি করা হচ্ছে ১ হাজার ৫২৫ টাকায়। এটা অবিশ্বাস্য।”
বরগুনা জেলা ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, “আমার মাথায় কিছুতেই বিষয়টির হিসাব মিলছে না। দেশে বাড়তি দামে ইলিশ কিনে কীভাবে কম দামে ইলিশ রপ্তানি করা হচ্ছে। সবই রহস্যজনক লাগছে।”

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
ইলিশ রপ্তানি শুরু হয় ২০১৯ সাল থেকে। এর পর থেকে প্রতিবছর দুর্গাপূজা উপলক্ষে ভারতে ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। গত পাঁচ বছরের তথ্যে দেখা যায়, বাংলাদেশ থেকে যে পরিমাণ ইলিশ রপ্তানি হয়েছে, তা মোট উৎপাদনের মাত্র শূন্য দশমিক ২৯ শতাংশ। এছাড়াও, সরকার যে পরিমাণ রপ্তানির অনুমোদন দেয়, তার কম ইলিশই যায় ভারতে।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ইলিশ আহরণ কমেছে ৪২ হাজার টন। এই অবস্থায় রপ্তানির সিদ্ধান্ত দেশের বাজারে ইলিশের দাম আরও বাড়িয়ে দেবে বলে মনে করছেন সাধারণ ক্রেতারা।
