শেখ মেহেদী হাসান নাদিম

উন্নত বিশ্বে যখন কেউ বিপদে পড়ে, তখন চিৎকার করে বলে, “I am going to call the police”। এই একটি বাক্যের মধ্যে থাকে পরম নির্ভরতা। মনে হয়, এই বুঝি ত্রাতা এসে গেল। আর আমাদের দেশে? এখানে পুলিশ ডাকার নাম শুনলে সাধারণ মানুষের বুকে ধক করে ওঠে। সাহায্য তো দূরের কথা, উল্টো জীবন বিপন্ন হওয়ার ভয় আর হয়রানির আতঙ্ক গ্রাস করে। ৫৪ বছরের স্বাধীনতায় আমরা এই ভয়টুকুও তাড়াতে পারিনি।
আমরা কি সবসময় এমনই ছিলাম? ইতিহাস কিন্তু তা বলে না। আমাদেরও ছিল এক গৌরবোজ্জ্বল অতীত।
সম্রাট আকবরের কোতোয়াল: যখন পুলিশ ছিল ‘আপনজন’
মুঘল সম্রাট আকবর যখন এই জনপদ শাসন করতেন, তখন তিনি চালু করেছিলেন ঐতিহাসিক ‘কোতোয়াল’ ব্যবস্থা। সেই কোতোয়ালরা কোনো বিদেশি প্রভুর লাঠিয়াল ছিল না, তারা ছিল সমাজেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলাদেশের বুকে আজও যে ১২টি ‘কোতোয়ালি থানা’ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, তারা সেই জনবান্ধব পুলিশিং ব্যবস্থার নীরব সাক্ষী। তখন পুলিশ আর জনগণের মাঝখানের দেয়ালটা এত উঁচু ছিল না।
খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, আমাদের প্রবীণরা মনে করতে পারবেন—পুলিশ একসময় গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে যেত। কেবল চোর ধরতে নয়, তারা:
- পরিবারের সুখ-দুঃখের খোঁজ নিত।
- পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমে অংশ নিত।
- সামাজিক বিবাদ মেটাতে মুরুব্বির ভূমিকা পালন করত।
তাদের কাঁধে ছিল সামাজিক দায়বদ্ধতা। কিন্তু হায়! সেই পরম আত্মীয় পুলিশকে আমরা কোথায় হারালাম?

১৭৯৩ সালের কর্নওয়ালিস কোড: দাসত্বের আইনি শিকল
আমরা আমাদের পুলিশকে হারিয়েছি ১৭৯৩ সালে, লর্ড কর্নওয়ালিসের ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ ও পুলিশি কোডে। ব্রিটিশ বণিকরা আমাদের ‘মানুষ’ ভাবেনি, ভেবেছে ‘প্রজা’। রাজস্ব আদায় আর বিদ্রোহ দমনের জন্য তারা পুলিশের হাতে লাঠি তুলে দিল। আর আজ? ২০২৫ সালে এসেও সেই ঔপনিবেশিক ভূত আমাদের ঘাড়ে চেপে বসে আছে।
সবচেয়ে বেদনার জায়গাটি হলো—একটি সুশৃঙ্খল ও পবিত্র বাহিনীকে কীভাবে ধাপে ধাপে নৈতিকভাবে পঙ্গু করা হয়েছে। যেই হাত মানুষের নিরাপত্তা দেওয়ার কথা, সেই হাতকে শেখানো হয়েছে ডাকাতির মালের ভাগ নিতে। ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত অলিখিত নির্দেশে সততাকে নির্বাসনে পাঠিয়ে দুর্নীতিকে করা হয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক। বছরের পর বছর ধরে এই ‘ভাগ বাটোয়ারা’র সংস্কৃতি পুলিশকে এমন এক জায়গায় নিয়ে গেছে যে, এখন আর তারা জনগণের বন্ধু হতে পারে না, বড়জোর ভয়ের কারণ হতে পারে।

পদোন্নতি নাকি সংস্কার: কোনটি সময়ের দাবি?
আজ যখন দেখি জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা তাদের ‘ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি’ নিয়ে মরিয়া হয়ে ছোটেন, তখন করুণা হয়। আপনারা কোন সিস্টেমে পদোন্নতি চাইছেন? যে সিস্টেম পচে গলে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে? একটি নষ্ট ইমারতের ওপর নতুন তলা চাপালে তা কি ধসে পড়বে না?
পুলিশ সংস্কারের এই দাবি আজ আর কোনো রাজনৈতিক দাবি নয়, এটি বিবেকের দাবি। আমাদের বুঝতে হবে, আমরা কী বিশাল সম্পদ হারিয়েছি। একটি বাহিনী, যারা হতে পারত আমাদের ভাই, আমাদের সন্তান, আমাদের রক্ষক—তাদের আমরা বানিয়েছি ভাড়াটে বাহিনী। আমাদের এই ক্ষতি, এই ‘Loss’ কোনো জিডিপি বা অর্থ দিয়ে মাপা যাবে না।
উপসংহার: সংস্কার এখন ‘ফরজ’
তাই আজ চিৎকার করে বলতে হবে—কর্নওয়ালিসের এই পচা খোলস ছুড়ে ফেলুন। আমাদের সেই মুঘল কোতোয়ালদের জনসম্পৃক্ততা ফিরিয়ে দিন। আমাদের সেই পুলিশ দিন, যাদের দেখলে ভয়ে নয়, বরং ভরসায় বুক ভরে উঠবে।
পুলিশের পদোন্নতির ফাইলের পেছনে দৌড়ানোর বিলাসিতা এখন মানায় না। এখন সময় প্রায়শ্চিত্তের। এই পুরো ঘুনে ধরা ব্যবস্থা ভেঙে নতুন করে গড়ে তোলাই এখন একমাত্র ‘ফরজ’ কাজ। নতুবা ইতিহাসের কাঠগড়ায় আপনারা কেবল ‘লাঠিয়াল’ হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবেন, ‘সূর্যসন্তান’ হিসেবে নয়।
